ক্লাসে বসে খাতা খুলে ছাত্র-ছাত্রীর নাম ডাকার দরকার পড়ে না শিক্ষকের। কারণ, পড়ুয়া এক জনই। আর সেই এক জনকেই পড়াতে রোজ সকালে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যান সরকারি স্কুলের শিক্ষক জীবন মিঠারি। জেদের বশে।
স্কুলটি জেলা পরিষদের। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মহরাষ্ট্রের কোলাপুরের গগনবাওয়াড়া তালুকের সিন্ধুদুর্গ সীমানার কাছে কাওয়ালটেক ধাঙ্গরওয়াড়া গ্রামের এক প্রান্তে তার ঠিকানা। যাতায়াতের সমস্যা তো রয়েছেই। জঙ্গলের রাস্তাও সহজ নয় মোটেই। সে পথে গাড়ি চলে না। বন্যপ্রাণী বেরিয়ে পড়ে মাঝেমধ্যে। গ্রামে চিতাবাঘের হামলার খবরও আসে প্রায়ই। তবু এমন স্কুল থেকে বদলি চেয়ে কখনও আবেদন করেননি জীবন। বন্ধ করেননি স্কুলে যাওয়াও।
২০১৩ সালের ২৬ জুলাই খানিক জেদ করেই ওই স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন জীবন। তার আগে তিনি ছিলেন কোলাপুর জেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান। তখনও শিক্ষকতা করতেন, তবে মফসসলের স্কুলে। সেখানেই বদলি বিষয়ে সহশিক্ষকদের কিছু টিপ্পনী কানে আসে তাঁর।
জীবনের সহকর্মীরা বলছিলেন, উপর মহলে প্রভাব আছে যাঁদের, তাঁরা এমন জায়গার স্কুলে পোস্টিং পান, যেখানে সব সুযোগসুবিধা আছে। বাকিদের কপালে জোটে প্রত্যন্ত এলাকার স্কুল। সে কথা শুনেই জীবন ঘোষণা করেন, তিনি ব্যতিক্রমী হবেন। তিনি যাবেন প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলে পড়াতে। জেদের বশেই জেলা পরিষদের স্কুলটি খুঁজে সেখানে পোস্টিং নেন। তার পর থেকে ১৩ বছর ধরে নিজের প্রতিশ্রুতিই পূরণ করে চলেছেন তিনি।
শুরুর দিকে তবু স্কুলে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী আসত। তবে ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। এখন এসে ঠেকেছে এক জনে। এখন গোটা স্কুলে পড়ুয়া বলতে তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী। নাম স্বরা বোড়াকে। অবশ্য তার সঙ্গে তার বোনও এসে বসে ক্লাসে। সাড়ে চার বছরের শিশুর স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স হয়নি এখনও। তবে তাকে অন্যত্র রাখার মতো অঙ্গনওয়াড়িও নেই গ্রামটিতে। আগামী বছর দিদি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে উঠবে, তখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হবে সে। জীবন স্যরের ক্লাসে ছাত্রী সংখ্যা বাড়বে। তবে তিনিও এখন ৫৫। ২০২৯ সালে অবসর নেবেন। তত দিনে তাঁর কনিষ্ঠ ছাত্রী তৃতীয় শ্রেণিতে উঠবে হয়তো। কিন্তু তার পড়াশোনা শেষ করানোর জন্য আর স্কুল চালানোর জন্য জেদ করে আরও এক জন জীবন স্যর আসবেন কি?