আর কবে?
উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন। ২০১৭ সালে শেষ বারের মতো ছাত্রভোট দেখেছিল রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য শেষ ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়েছে করোনা অতিমারির আগে, ২০২০ সালে। চলতি বছর রাজ্যে ঘটে গিয়েছে ক্ষমতার পালাবদল। গত তিন মাসে রাজ্য রাজনীতির অনেক চমক দেখেছেন রাজ্যবাসী। এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রভোট হবে কবে?
শনিবার এই প্রশ্ন তুললেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ঘটনাচক্রে সে দিনই এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়। স্পষ্ট উত্তর এড়িয়ে তিনি বলেন, “কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সংখ্যায় ছাত্রছাত্রীরা ফিরলে তার পর এ বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।” পাশাপাশি তিনি ফের বার্তা দিয়েছেন, কলেজে অশান্তি এড়াতে এবং পড়াশোনার সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারের ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।
রাজ্যে পালাবদলের পরেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে আশা জেগেছিল পড়ুয়াদের মধ্যে। কারণ ২০১৭ সালের পর থেকে রাজ্যের অধিকাংশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়নি। ২০১৭ সালেই উচ্চশিক্ষা দফতর বিশেষ বিধি জারি করেছিল। সেই বছরই কলকাতা, বর্ধমান, বিদ্যাসাগর, উত্তরবঙ্গ এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনুমোদিত কলেজগুলিতে শেষ বারের মতো ছাত্রভোট হয়েছিল। তার পর আর হয়নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষবারের মতো ভোট হয়েছিল ২০২০ সালে কোভিড অতিমারির ঠিক আগে।
তৎকালীন শাসকদলের ছাত্র সংগঠন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিরুদ্ধে ‘দাদাগিরি’-র অভিযোগ তুলত বিরোধীরা। একই সুর শোনা যেত অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের মুখেও। কিন্তু মে মাসে পালা বদলের পরেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে আশা জাগে শিক্ষামহলে। যদিও পালাবদলের পর তিন মাস হতে চললেও এখনও দফতর থেকে এ বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। এ দিকে সারা দেশে একের পর এক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো পোস্ট করে বার্তা দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে। এই আবহে রাজ্যের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে নতুন করে উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন।
এ দিনই বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় নিজের ঘরে বলেন, ‘‘অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করানো উচিত। আমি মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে চিঠি লিখব কালবিলম্ব না করে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করানোর জন্য।’’
রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে ছাত্রনেতা ছিলেন একসময়। এ রাজ্যের তাবড় রাজনৈতিক নেতার জীবন ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে নানা ছাত্র আন্দোলন। অথচ, গত প্রায় ১০ বছর কোনও নির্বাচন হয়নি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের মতো শুভেন্দু অধিকারী সরকারও কি ছাত্র রাজনীতির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে চাইছে?
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পড়ুয়ারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সংখ্যায় ফিরলে তবে ভোট নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হবে। পড়ুয়া এবং শিক্ষকদের একাংশের দাবি, ন্যূনতম ছাত্র সংখ্যায়ও সংসদের প্রয়োজন, আর প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচনের।
শুধু তা-ই নয়, চলতি শিক্ষাবর্ষে রাজ্য সরকারের তরফেই দাবি করা হয়েছে গত বছরের তুলনায় এ বার স্নাতকে ভর্তির হার অনেকটাই বেশি। এমনকি ছাত্রীদের ভর্তির হার বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই শিক্ষামহলের প্রশ্ন, ভোট নিয়ে গড়িমসি কেন?
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের এক ছাত্র বলেন, “রাজনীতির বোধ আর পাঠ শুরু হয় কলেজ জীবনেই। আমরা কলেজ পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসেছি। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতি কী বুঝিনি? অথচ, তাতে কি আদৌ রাজনীতি এড়ানো গিয়েছে? রাজনীতি এড়িয়ে কি বাঁচা যায়? আমাদের পরের বছরের পড়ুয়ারা অন্তত সুস্থ সংসদীয় গণতন্ত্রে বাঁচুক, এটাই চাই।” যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমেস্টারের এক পড়ুয়ার দাবি, “ছাত্রসংসদ নির্বাচন নানা প্রশাসনিক কারণেও প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ এটা বুঝতেই চাইছেন না। কেন চাইছেন না সেটা অবশ্য আমরা বুঝতে পারছি না। হয়তো সরকার ছাত্রশক্তিকে ভয় পাচ্ছে।”
আরও পড়ুন:
এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘‘আমরা আগের সরকারকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, এই সরকারকেও চ্যালেঞ্জ করছি। সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফেরাতে গেলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতেই হবে। বামপন্থী, ডানপন্থী সব ছাত্র সংগঠনেরা নির্বাচনে লড়াই করুক। ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের নিজের পছন্দের সংগঠনকে বেছে নেবেন, সেই সুযোগ সরকার দিক।’’
অলইন্ডিয়া ডিএসও-র রাজ্য সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘‘ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছাত্র সংসদ নির্বাচন। বিগত তৃণমূল সরকার অগণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচন বন্ধ রেখে তার দলের ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে দখলদারির রাজনীতি চালিয়েছে। ভোটের আগে বিজেপি ঘোষণা করেছিল, ক্ষমতায় এলেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাবে। কিন্তু আজ উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, তৃণমূল সরকারের মতো তারাও আসলে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার পরিকল্পনা করছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’’
সরকার বদলের পরেই মে মাসে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ লিংডো কমিশনের সুপারিশ মেনে যত দ্রুত সম্ভব ও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন করানোর দাবি তুলছিল। দাবি করেছিল, তৃণমূল আমলে বহু পড়ুয়ার ক্ষতি হয়েছে বলে। এ দিন এবিভিপি-র কলকাতা মহানগরের সম্পাদক স্বাধীন হালদার বলেন, ‘‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি আমরা বহু আগে থেকেই করে আসছি। কলেজগুলির পরিচালন সমিতি গঠন হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করছি। তার পরেই সরকারের কাছে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানানো হবে।’’