ইঙ্গিত ছিলই, মঙ্গলবার রাতে নির্দেশিকা জারি করল স্কুল সার্ভিস কমিশন। স্থগিত হল একাদশ-দ্বাদশ স্তরের শিক্ষক পদপ্রার্থীদের কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া।
১৪ অগস্ট থেকে শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা আগেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল স্কুল সার্ভিস কমিশন। সেই প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত করার নয়া বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে মঙ্গলবার। শুধু তা-ই নয়, যাঁরা সুপারিশপত্র পেয়েছিলেন তাঁদের পুলিশি যাচাইকরণের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল বুধবার, ১২ অগস্ট থেকে। সেই প্রক্রিয়াও মধ্যশিক্ষা পর্ষদ স্থগিত করে দিয়েছে। অর্থাৎ, থমকে গিয়েছে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই। কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ চাকরিপ্রার্থীদের। যদিও কমিশনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সূত্রের খবর, ওবিসি সংরক্ষণ বিষয়ে আইনি পরামর্শ নিতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ। তাঁদের দাবি, এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও জটিলতা হতে পারে। তাই আগেভাগেই আইনি পরামর্শ মেনে এগোতে চাইছেন তাঁরা। এ দিকে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, আদালতের নির্দেশে যেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে সেখানে আদালতের অনুমতি না নিয়ে তা স্থগিত করা আদালত আবমাননার শামিল।
২০১৬ থেকে ২০২৬— শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৫-এর এপ্রিলে এসএসসি ২০১৬-র গোটা প্যানেলই বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট। চাকরি যায় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর। শীর্ষ আদালতই প্রাথমিক ভাবে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং পরে ৩১ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত যোগ্য শিক্ষকদের সবেতন কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এই সময়সীমার মধ্যে রাজ্যকে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশও দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
স্কুল সার্ভিস কমিশন ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার আয়োজন করে। সে বছরই ফলপ্রকাশ হয়। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গতি আসেনি। এখনও পর্যন্ত নবম-দশমের জন্য শিক্ষক পদপ্রার্থীদের শুধুমাত্র নথি যাচাইয়ের কাজ হয়েছে। অধিকাংশ বিষয়ের ইন্টারভিউ-ও হয়নি। একাদশ-দ্বাদশের সেই প্রক্রিয়া খানিকটা এগোলেও নিয়োগপত্র নিয়ে কাজে যোগ দিতে পারেননি কোনও শিক্ষক।
হিসাব বলছে, একাদশ দ্বাদশ স্তরের ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শেষ হয়েছে। অর্থাৎ প্রার্থীরা সুপারিশপত্র পেয়েছেন। কারও কারও পুলিশি যাচাইকরণ শেষ হলেও নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। ৩৬৫ জনের নথি যাচাইয়ের কথা ছিল বুধবার। তা স্থগিত হয়েছে। অন্য দিকে ১২টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৪ অগস্ট। তা-ও স্থগিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান দুষ্মন্ত নারিওয়ালা জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের তরফে যাচাই নির্দেশিকা পাওয়ার পরেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসএসসি নিয়োগের ক্ষেত্রে ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ হবে না কি ৭ শতাংশ— তা নিয়েই জটিলতা।
কিন্তু ঘটনা হল, আগামী ৩১ অগস্টের পরে একের পর এক স্কুলে তৈরি হবে বিপুল শিক্ষকসঙ্কট। যাঁরা ২০২৫-এর নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি তাঁদের চাকরি তো থাকছেই না, পাশাপশি যাঁরা পাশ করেছেন তাঁরাও নতুন করে কাজে যোগ দিতে পারছেন না। যদিও স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং কমিশনের চেয়ারম্যান দুষ্মন্ত নারিওয়ালা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ফের আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আরও সময় চেয়ে নেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে বিভ্রান্তি কাটাতে ওয়েবসাইটে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কাউন্সেলিং স্থগিতের নির্দেশ আসতেই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের অনেকেই ১০ বছর পর নতুন করে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আশায় ছিলেন, নতুন নিয়োগপত্র নিয়ে শিক্ষকতার কাজে ফের যোগ দেবেন। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের তরফে মেহবুব মণ্ডল বলেন, “ভোটের আগে বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শুধু সেটুকু পূরণ করলেই সমস্যার সমাধান করা যায়। ২০১৬ সালের প্যানেলে থাকা যোগ্য শিক্ষকেরা, যাঁরা কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্তই নয়, তাঁরা শাস্তির মুখে পড়ছেন।”
বুধবার শিক্ষক পদপ্রার্থীদের মিছিল।
আরও পড়ুন:
এসএসসি-র কাউন্সেলিং স্থগিতের সিদ্ধান্তে শিক্ষামহলের একাংশ দেখছেন সিঁদুরে মেঘ। তাঁরা মনে করছেন, ওবিসি সংরক্ষণ জটে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন করে বাধা আসতে পারে। কারণ, যদি ৭ শতাংশ সংরক্ষণের হিসাব মেনে নতুন প্যানেল থেকে নাম বাদ পড়ে, তা হলে নতুন করে মামলা হতে পারে আদালতে। সে ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও অনেক বেশি সময় লাগবে।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘ক্ষমতায় আসার আগে যে প্রতিশ্রুতি শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছিল, তা সরকার পূরণ করছে না। বরং বিপরীত অবস্থান নিচ্ছে। সরকারকে স্পষ্ট ভাবে তাঁদের অবস্থান জানাতে হবে।’’
মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, ‘‘যা পরিস্থিতি, তাতে সরকারকে আদালতের কাছে ফের সময় চাইতে হবে। তবে এটা কোনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। শুধু যোগ্য শিক্ষকেরা নন, নতুন পরীক্ষার্থীরাও বঞ্চিত হতে চলেছেন। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান।”
বুধবার বেলা ১২টার পরে করুণাময়ী থেকে বিকাশ ভবন পর্যন্ত মিছিল করেন শিক্ষক পদপ্রার্থীদের একাংশ। তাঁদের অনেকের হাতে সুপারিশপত্রও ছিল। এ দিন পুলিশি যাচাই হওয়ার কথা থাকলেও তা আগেই পর্যদ তা স্থগিত করে দেয়। এই প্রতিবাদ মিছিলে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশই নতুন পরীক্ষার্থী, ২০২৫-এই প্রথম এসএসসি-র পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ ধরেই ৩১ অগস্টের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। বিকাশ ভবনে গিয়ে স্মারকলিপিও দেন তাঁরা।