Advertisement
E-Paper

শিক্ষকের আকাল, স্কুলছুট-সমস্যা, প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো! কেমন ভাবে পালিত হচ্ছে এ বারের শিক্ষক দিবস?

সময়ের নিয়মে ব্ল্যাকবোর্ড থেকে চকের গুঁড়ো পেরিয়ে শিক্ষা এখন অনেকটাই অ্যালগরিদম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে দাঁড়িয়েছে। তথ্য পাওয়ার এই সহজলভ্যতার যুগে তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিক্ষকের প্রয়োজন কি আগের মতোই রয়েছে?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৮
শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হলেও হারিয়েছে পুরনো জৌলুস।

শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হলেও হারিয়েছে পুরনো জৌলুস। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সেপ্টেম্বর মানেই একসময় স্কুলের অলিন্দে অলিন্দে চলত উৎসবের আয়োজন। হাতে লেখা কার্ড, রঙিন কাগজ দিয়ে ক্লাস সাজানো, শিক্ষকদের হাতে রঙিন ফুল আর খুদে হাতে লেখা উপহার তুলে দেওয়ার সেই আবেগঘন ছবি। কিন্তু সময়ের নিয়মে ব্ল্যাকবোর্ড থেকে চকের গুঁড়ো পেরিয়ে শিক্ষা এখন অনেকটাই অ্যালগরিদম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে দাঁড়িয়েছে। তথ্য পাওয়ার এই সহজলভ্যতার যুগে তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিক্ষকের প্রয়োজন কি আগের মতোই রয়েছে?

শিক্ষক দিবসে শহরের বিভিন্ন স্কুলের প্রধানশিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রয়োজন রয়েছে শুধু নয়, বদলে যাওয়া সময়ে শিক্ষকের ভূমিকা বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তথ্য দেওয়া আর শিক্ষা দেওয়া এক জিনিস নয়। এআই উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সেই উত্তর ঠিক কি না, কেন ঠিক বা ভুল, কোনও বিষয় নিয়ে কী ভাবে ভাবতে হবে—সেই বোধ তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষকেরই।

যোধপুর পার্ক বয়েজ় স্কুলের প্রধানশিক্ষক অমিত সেন মজুমদারের কথাতেও সেই জায়গাটিই উঠে এসেছে। তাঁর মতে, যতই এআই আসুক, কোনও বিষয়কে পড়ুয়ার কাছে সহজ ভাষায় এবং তার প্রয়োজন অনুযায়ী বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের বিকল্প তৈরি হয়নি। বরং প্রযুক্তিকে শিক্ষক ও পড়ুয়া, দু’পক্ষেরই কাজে লাগানো উচিত।

কিন্তু এই নতুন ভূমিকায় পৌঁছোনোর পথটা যে সহজ নয়, তারও ইঙ্গিত মিলছে স্কুলগুলির অভিজ্ঞতায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কম, কোথাও আবার পড়ুয়ার সংখ্যাও কমছে। কেন্দ্রের ইউডাইস প্লাস ২০২৫-২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ৪,১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়া নথিভুক্ত নেই বলে দেখা গিয়েছে। আবার ৬,৭৬৯টি স্কুলে মাত্র এক জন করে শিক্ষক রয়েছেন। অর্থাৎ শিক্ষকতার বাস্তব ছবিটা একরকম নয়—কোথাও শিক্ষক-ঘাটতি, কোথাও পড়ুয়ার অভাবে স্কুলের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন।

তবে শিক্ষক দিবসের আলোচনায় শুধু সংখ্যার হিসাবই শেষ কথা নয়। কারণ শিক্ষক কম থাকলে তার প্রভাব পড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও। একজন শিক্ষককে যখন একইসঙ্গে একাধিক শ্রেণি, একাধিক বিষয় কিংবা বিপুলসংখ্যক পড়ুয়া সামলাতে হয়, তখন প্রত্যেক পড়ুয়ার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলা, তার সমস্যা বোঝা বা দুর্বলতা চিহ্নিত করার সময়ও কমে আসে।

তার উপর রয়েছে শ্রেণিকক্ষের বাইরের দায়িত্ব। বিএলও-র কাজ থেকে শুরু করে জনগণনার মতো সরকারি দায়িত্বেও শিক্ষকদের যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে পড়ানোর জন্য শিক্ষককে যে সময়টা দেওয়ার কথা, তার একটা অংশ চলে যাচ্ছে অন্য কাজে। অমিত সেন মজুমদার বলেন, ‘‘আগে বিএলও-র দায়িত্বের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে জনগণনার কাজেও বহু শিক্ষক ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত পঠনপাঠনে তার প্রভাব পড়ছে। যার ফলে শিক্ষক দিবসের জৌলুসেও কোথাও একটা ঘাটতি দেখা গিয়েছে।’’

বেলেঘাটা দেশবন্ধু গার্লস হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক নন্দা ভবানীর স্কুলেও ১৪ জন শিক্ষক জনগণনার কাজে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আগে পঠনপাঠন যাতে ব্যাহত না হয়, সে দিকটিও ভাবা দরকার। তাঁর মতে, স্কুলের প্রয়োজন এবং সরকারি কাজ—দু’দিকের ভারসাম্য রেখে দায়িত্ব বণ্টন করা গেলে শিক্ষক ও পড়ুয়া, উভয়েরই সুবিধা হত।’’

শিক্ষক দিবসের ছবিটা শুধু ক্লাসরুমের ভিতরেই বদলায়নি, বদলেছে উদ্‌যাপনের ধরনও। একটা সময় এই দিন মানেই ছিল হাতে লেখা কার্ড, ফুল, কলম, নিজের হাতে তৈরি উপহার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই আবেগের জায়গায় এখন এসেছে ডিজিটাল শুভেচ্ছা, প্রযুক্তিনির্ভর অনুষ্ঠান, আরও বেশি আয়োজন।

কিন্তু সম্পর্কের জায়গাটা কি কমেছে?

যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধানশিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য মনে করেন, উদ্‌যাপনের ধরন বদলালেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভালবাসার সম্পর্ক এখনও রয়েছে। আগের মতো হাতে লেখা কার্ড বা ছোট উপহারের আবেগ হয়তো কমেছে, কিন্তু শিক্ষক দিবস এখনও স্কুলে আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করে।

আবার পার্ক ইনস্টিটিউশনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক বাসবকুমার মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতায় শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে পড়ুয়াদের উপস্থিতির ছবিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাঁর কথায়, ‘‘সাধারণত উচ্চ শ্রেণির পড়ুয়ারাই অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কিন্তু শিক্ষকরা বিভিন্ন সরকারি কাজে যুক্ত থাকলে এবং পড়ুয়াদের স্কুলে উপস্থিতি কম হলে সেই উদ্‌যাপনের জৌলুসে প্রভাব পড়ে। করোনা-পরবর্তী সময়ে পড়ুয়াদের স্কুলে আসার প্রবণতা এবং মোবাইলনির্ভরতার পরিবর্তনও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের পুরনো ছবিকে বদলে দিয়েছে অনেকটাই।’’

প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষক দিবসের আয়োজনে বাহ্যিক আড়ম্বর বাড়লেও, সেখানে ‘অনুকরণ’ সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। নন্দা ভবানী যেমনটা বলছিলেন, ‘‘আগে অনুষ্ঠানগুলিতে যে আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকত, এখন সেখানে বাহ্যিক জাঁকজমক অনেক বেশি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী ভাবে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতে হয়, সেই ধারণা তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজস্বতা বা স্বকীয়তার চেয়ে অনুকরণ বেশি এসে পড়েছে।’’

সব মিলিয়ে, ব্ল্যাকবোর্ড ও চক-ডাস্টারের প্রথাগত জগত থেকে বেরিয়ে এসে আজকের শিক্ষকসমাজ একদিকে যেমন এআই ও ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে শিক্ষকসঙ্কট, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক দূরত্বের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছে। শিক্ষক দিবসের জৌলুস হয়তো কিছুটা সাময়িক আড়ালে গিয়েছে, তবুও স্কুলে স্কুলে এই দিনটায় পড়ুয়াদের সমাবেশ, অনুষ্ঠান, সম্মান আজও একই ভাবে বহাল রয়েছে বলেই মনে করছেন শিক্ষকমহলের একাংশ।

Teachers Day school Teacher

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy