স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির জন্য সুপারিশপত্র হাতে পেয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। একধাক্কায় তা বাতিল হয়ে গেল। ২০১৬ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে এসেও বারে বারে চাকরির চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তাঁরা। শিক্ষকদের একাংশ ফের হুঁশিয়ারি দিলেন রাস্তায় নেমে এবং আইনি পথে আবার লড়াই শুরু করবেন তাঁরা।
সোমবার ওবিসি সংরক্ষণের নতুন আইন মেনে একাদশ-দ্বাদশ স্তরে ফের নতুন করে তালিকা প্রকাশ করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। যার ফলে ২১টি বিষয়ের হাজার হাজার শিক্ষক পদপ্রার্থী যাঁরা ইতিমধ্যেই সুপারিশপত্র পেয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লেন। সুপারিশপত্র না পেলেও যাঁদের নাম প্যানেলে ছিল, তাঁরাও অথৈ জলে পড়লেন বলে অভিযোগ তাঁদের। এই অবস্থায় কেউ আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, কেউ আবার চাকরির এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির দাবিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করছেন।
২০১৬ থেকে ২০২৬— শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৫-এর এপ্রিলে এসএসসি ২০১৬-র গোটা প্যানেলই বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট। চাকরি যায় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর। প্রাথমিক ভাবে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং পরে ৩১ অগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত যোগ্য শিক্ষকদের সবেতন কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্কুল সার্ভিস কমিশন ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার আয়োজন করে। সে বছরই ফলপ্রকাশ হয়। কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গতি আসেনি। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগেই নবম-দশমের জন্য শিক্ষক পদপ্রার্থীদের শুধুমাত্র নথি যাচাইয়ের কাজ হয়েছে। অধিকাংশ বিষয়ের ইন্টারভিউও হয়নি। একাদশ-দ্বাদশের সেই প্রক্রিয়া বেশ খানিকটা এগিয়ে যায়।
একাদশ-দ্বাদশ স্তরের ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শেষ হয়েছে। অর্থাৎ, প্রার্থীরা সুপারিশপত্র পেয়েছেন। কারও কারও পুলিশি যাচাইকরণ শেষ হলেও নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। আর তার মধ্যেই ফের নতুন করে চলে আসে সংরক্ষণ প্রসঙ্গ। গত অগস্টে ১২টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংরক্ষণের নতুন আইন বলবৎ হওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ৩১ অগস্টের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি সরকার। তার পরে ফের শীর্ষ আদালতে আবেদন করা হলে শেষ বারের মতো শীর্ষ আদালত ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত নিয়োগপ্রক্রিয়ার সময় বৃদ্ধি করেছে। তার পরে সোমবার ওই তালিকা প্রকাশ করল কমিশন। কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়েছে, মোট শূন্যপদের কোনও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ ১২৪৪৫টি শূন্যপদই রয়েছে। কিন্তু ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ থেকে ৭ শতাংশে আসায় ক্যাটেগরিভিত্তিক শূন্যপদের সংখ্যায় পার্থক্য হয়েছে।
কিন্তু এর পরেই যে ‘যোগ্য’ শিক্ষকেরা ইতিমধ্যে স্কুলে কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। তাঁরাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। কারণ, লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ যোগ করে মেধাতালিকা প্রকাশ করা হয়। তার পরে হয় কাউন্সেলিং। কিন্তু নতুন আইন প্রয়োগের ফলে ওই মেধাতালিকাই বাতিল হল। কারণ ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশের পরিবর্তে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের পরে মেধাতালিকাও ওই ৭ শতাংশের উপরে ভিত্তি করেই তৈরি হবে।
খড়গপুর শ্রীকৃষ্ণপুর হাইস্কুলের কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের শিক্ষিকা সঙ্গীতা সাহা চন্দ্রকোনার ডিগ্রি সোনাটোরিয়াম হাইস্কুলে নিয়োগের জন্য গত মার্চে এসএসসি-র থেকে সুপারিশপত্র পেয়েছিলেন। ২০১৬ সালে যে ওবিসিরা ন্যায্য ভাবে চাকরি পেয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই বাদ পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা তাঁর। আদৌ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ হবে কি না, তা নিয়ে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান।
তিনি এ দিন বলেন, ‘‘ না পূর্বতন সরকার, না বর্তমান সরকার কেউ আমাদের পাশে নেই। দোষ না করেও আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেকে এই উৎকণ্ঠায় মারা গিয়েছেন। আমরা আমাদের বহু সহকর্মীকে হারিয়েছি। এই অবস্থার অবসান প্রয়োজন।’’
সঙ্গীতা সাহা। ছবি: সংগৃহীত।
প্যানেলে নাম ছিল আসানসোলের গৌরাঙ্গডি আর কে এস ইনস্টিটিউশনের সংস্কৃত বিষয়ের শিক্ষিকা রূপা কর্মকারেরও। শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কাজে দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁরও।
তিনি বলেন, ‘‘ যে চলমান নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রায় শেষ দিকে ছিল, সেখানে নতুন আইন প্রয়োগ করে পুরো প্রক্রিয়াটিকেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। আমরা এই অন্যায় মেনে নেব না। আইনি পথে এবং রাস্তায় নেমে ফের আমরা আন্দোলন শুরু করব। শিক্ষকদের গিনিপিগ বানিয়ে শুধু পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে।’’
রূপা কর্মকার। ছবি: সংগৃহীত।
পশ্চিম মেদিনীপুরের দেউলি কলসবাড় রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের (উচ্চ মাধ্যমিক) রসায়নের শিক্ষক কৃষ্ণগোপাল চক্রবর্তীর নাম প্যানেলে থাকলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে কী হতে চলেছে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় তিনি।
তাঁর কথায়, ‘‘যোগ্যতার নিরিখে চাকরি পেয়েও যে ভাবে উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাতে হচ্ছে, তার থেকে সরকার আমাদের স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিক। সুপ্রিম কোর্ট শেষ বারের মতো সুযোগ দেওয়ার পরেও যে ভাবে গোটা প্রক্রিয়া জট পাকিয়ে গেল, সেখানে আদৌ এই নিয়োগ হবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়ে গেল।’’
কৃষ্ণগোপাল চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তো যোগ্যদের চাকরি বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি তো উনি রাখলেন না।’’
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের (বিদ্যালয়) প্রদেশ সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক বলেন, ‘‘ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আদালতের রায়ের উপরে ভিত্তি করেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। নিয়োগের পরে যেন কোনও আইনি জটিলতা না থাকে সে কারণে আগে থেকেই সরকার এই পথ বেছে নিয়েছে। তার জন্য প্যানেল সংশোধন করা হচ্ছে। কারও হতাশ হওয়ার কিছু দেখছি না।’’
মঙ্গলবার কমিশনের তরফ থেকে চার জন প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়। কমিশন সূত্রের খবর, নতুন ওবিসি সংরক্ষণ আইন প্রয়োগের পরে সোমবার যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সেখানে প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা ইন্টারভিউয়ে ডাক পাবেন। কিন্তু নম্বরের ভিত্তিতে আরও চারজনের নাম ওই তালিকায় থাকার কথা, কিন্তু নেই। তার কারণ হিসেবে কমিশনের ব্যাখ্যা ওই চারজনের নাম রয়েছে ‘অযোগ্য’-দের তালিকায়। সেটাই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে কমিশন।