কেন্দ্রীয় বোর্ডের স্কুলগুলিতে দু’টি দেশজ ভাষা-সহ মোট তিনটি ভাষা শেখানোর যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এ বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন করেছেন কেন্দ্রীয় সরকারকে। তাঁর দাবি, স্কুলে তিনটি ভাষা শেখানো যেতেই পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সরকারি পরিকল্পনা কি যথাযথ এবং যথেষ্ট?
বৃহস্পতিবারই এ সংক্রান্ত মামলাটি উঠেছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে। প্রধান বিচারপতি ছাড়া ওই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারকে তাদের ত্রিভাষা শিক্ষানীতি বিষয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন করেছেন। সেই সঙ্গে ওই নীতি রূপায়নে জড়িত সংশ্লিষ্ট দফতর এবং সংস্থাগুলিকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে একেবারে গোড়ায় ফিরে যেতে। নতুন করে তিনটি ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করে তার পরে সুপ্রিম কোর্টে আসতে।
সিবিএসই বোর্ডের স্কুলগুলিতে ষষ্ঠশ্রেণি থেকে তিনটি ভাষা শেখানোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক চলছে। বিতর্কের কারণ তিনটি ভাষা শেখা নিয়ে সিবিএসই-র নতুন নিয়মকানুন। সিবিএসই বলেছিল, তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দু’টি দেশজ ভাষা হতে হবে। এর বাইরে একটি বিদেশি ভাষা শিখতে পারবে ছাত্রছাত্রীরা। যার মধ্যে ইংরেজি থাকবে। ইংরেজির বদলে ফরাসি বা অন্য বিদেশি ভাষাও শেখা যেতে পারে। আর তা নিয়েই প্রাথমিক বিতর্কের শুরু। কারণ, অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভাষা হিসাবে ইংরেজি এবং ফরাসি শিখছিলেন, তাদের কি তবে যে কোনও একটি বাদ দিতে হবে? বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট ও প্রশ্ন তুলেছে, ‘‘ইংরজিকে কী ভাবে বিদেশি ভাষা বলছে সিবিএসই? এ দেশের বহু রাজ্যের সরকারি ভাষা ইংরেজি। শুধু তা-ই নয় এ দেশে ইংরেজি ভাষায় কথোপকথন হচ্ছে বহু বছর ধরে।’’ ইংরেজিকে ‘নন নেটিভ’ ভাষা হিসাবে চিহ্নিত করেছিল সিবিএসই। বিচারপতি জয়মাল্য আপত্তি তুলেছেন ‘নেটিভ’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও। তাঁর বক্তব্য, ওই শব্দ ব্যবহার করে আদতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রসঙ্গ অযথা টেনে আনা হয়েছে। যা কাম্য নয়।
সিবিএসই-র তিন ভাষা নীতি নিয়ে আরও একটি সমস্যা তৈরি হয়েছিল চলতি শিক্ষাবর্ষেই ষষ্ঠশ্রেণি থেকে ওই ভাষা শিক্ষা চালু করা নিয়ে। অনেকেই ওই সিদ্ধান্তকে এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আর্জি জানিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা ওই ভাষা শেখার জন্য এবং বেছে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট মানসিক প্রস্তুতির সময় পাবে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চও সিবিএসই-র তরফে হাজির অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটিকে বলেছে, ষষ্ঠশ্রেণিকে এ বছরের জন্য তিন ভাষা শিক্ষানীতি থেকে ছাড় দেওয়া যায় কি না তা যেন আরও এক বার ভেবে দেখে সিবিএসই।
এই প্রসঙ্গেই কেন্দ্রীয় বোর্ডের কাছে আরও একটি বিষয়ে সরাসরি জবাব চেয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য। তিনি প্রশ্ন করেছেন, সিবিএসই যে ২৩টি দেশজ ভাষা এ বছর থেকেই চালু করার কথা বলছে, তার জন্য যে শিক্ষক দরকার, তা কি সিবিএসই স্কুলগুলিতে রয়েছে? বেঞ্চ বলেছে, শুধু ছাত্রছাত্রীদের হাতে তিনটি ভাষা শেখার তালিকা ধরিয়ে দিলেই তো চলবে না। তাদের ওই ভাষা শেখানোর জন্য উপযুক্ত শিক্ষকেরও প্রয়োজন। যাতে তারা সত্যিই সেই ভাষা ভাল ভাবে শিখতে পারে। প্রয়োজন যথাযথ বই এবং বিজ্ঞানসম্মত পাঠ্যক্রমের।
সিবিএসইকে বলা হয়েছে, আগে ওই ২৩টি ভাষার জন্য উপযুক্ত পাঠ্যক্রম, বই এবং শিক্ষকের বন্দোবস্ত করতে। সব মিলিয়ে সিবিএসই ত্রিভাষা শিক্ষানীতি নিয়ে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, এখানে মাতৃভাষা বনাম বিদেশি ভাষার লড়াইটা মুখ্য নয়, মুখ্য হল পরিকল্পনা। যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হলে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করতে করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকার সে বিষয়ে সাহায্য করবে। কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়া এমন একটি নীতি প্রণয়ন করা কঠিন। তাই কেন্দ্র, এনসিইআরটি এবং সিবিএসই-কে দেশের শীর্ষ আদালত বলেছে, তিন ভাষা নীতি বলবৎ করার যে প্রক্রিয়া, তা নতুন করে ভাবতে এবং তার পরে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির জন্য আসতে।