স্কুলপাঠ্য বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করল মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের তিন কিশোর। ধ্রুব চৌধরী, মিত্রান লাধানিয়া এবং মৃদুল জৈন তৈরি করেছে ‘থার্মোভল্ট’ নামে একটি বিশেষ রেফ্রিজারেটর, যা চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলেও যাতে ওষুধ এবং প্রতিষেধক নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহণ করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই যন্ত্র তৈরি করেছে তারা। অভিনব এই উদ্ভাবনের জন্য ‘আর্থ প্রাইজ ২০২৫’-এর এশিয়া বিভাগে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছে তিন পড়ুয়া। পুরস্কার হিসেবে তারা পেয়েছে ১২,৫০০ মার্কিন ডলার।
করোনা অতিমারির সময় প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ ছাড়াই কী ভাবে প্রতিষেধক সংরক্ষণ ও পরিবহণ করা যায়, সেই সমস্যা নজরে আসে তিন কিশোরের। চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্যার কথা শুনেই বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করে তারা। এর পর বিভিন্ন নুনের রাসায়নিক ধর্ম নিয়ে পরীক্ষা শুরু করে তিন জন। প্রায় ১৫০ ধরনের নুন নিয়ে গবেষণা করে তারা। কিছু নুন জলে মেশালে চারপাশ থেকে তাপ টেনে নেয়, ফলে শৈত্য তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় এন্ডোথার্মিক বিক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ ছাড়া ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করে তারা।
প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর শিক্ষকের পরামর্শে নবম শ্রেণির রসায়নের পাঠ্যবইয়ে থাকা অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড এবং বেরিয়াম হাইড্রক্সাইড অক্টাহাইড্রেট নিয়ে পরীক্ষা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আসে সাফল্য। পরীক্ষার জন্য আইআইটি-র গবেষণাগারেরও সাহায্য নেয় তারা।
আরও পড়ুন:
কী ভাবে কাজ করে থার্মোভল্ট?
থার্মোভল্ট মূলত একটি বিশেষ ধরনের ইনসুলেটেড পাত্র। এর ভিতরের দেওয়ালে তামার আস্তরণ রয়েছে। পাত্রের ভিতরে ওষুধ বা প্রতিষেধক রাখা হয়। অন্য দিকে, পাত্রের ভিতরের ও বাইরের দেওয়ালের মাঝখানে থাকে নুন ও জলের মিশ্রণ। নুন জলে মেশার সময় চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে। সেই শীতলতাকে কাজে লাগিয়েই পাত্রের ভিতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তিন পড়ুয়ার দাবি, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ও জলের মিশ্রণ ব্যবহার করে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব। অধিকাংশ প্রতিষেধক সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে, বেরিয়াম হাইড্রক্সাইড ব্যবহার করলে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নীচেও নামানো যায়। ফলে ভবিষ্যতে অঙ্গ পরিবহণের মতো ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে।
ইন্দোরের ‘ভি ওয়ান’ হাসপাতালে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, থার্মোভল্টে অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা প্রতিষেধক সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। ব্যবহারের পর জল বাষ্পীভূত করে নুন আলাদা করে নেওয়া যায়। পরে নতুন জলে সেই নুন মিশিয়ে ফের ব্যবহার করা সম্ভব বলে দাবি উদ্ভাবকদের।
আর্থ প্রাইজ়ের পুরস্কারমূল্য দিয়ে প্রাথমিক ভাবে ২০০টি থার্মোভল্ট তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে তিন কিশোরের। সেগুলি ১২০টি হাসপাতালে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য পাঠানো হবে। পাশাপাশি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন শংসাপত্র পাওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। আন্তর্জাতিক প্রতিষেধক জোট ‘গাভি-র কাছেও এই প্রযুক্তি তুলে ধরতে চায় তারা।