Advertisement
E-Paper

এসআরএফটিআই-এর পাশে যাদবপুর, আলিয়া ও অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট উপাচার্যের

এসআরএফটিআই–এর বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখা উচিত নয়, দাবি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের একাংশের।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৫৩

ফাইল চিত্র।

সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই)-এর পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের ডাক দিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের একাংশ। আর এর মধ্যেই এসআরএফটিআই-এর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পেশ করলেন এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষ।

রবিবার এক সাংবাদিক বৈঠকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক গবেষক জানান, এসআরএফটিআইয়ের আন্দোলনের প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই) এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা সংহতি জানাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য, এসআরএফটিআই, যাদবপুর, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এবং আইআইটি বম্বে-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের পিছনে শিক্ষার অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষার প্রশ্ন রয়েছে।

তাঁদের দাবি, এসআরএফটিআই –এর বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখা উচিত নয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার, শিক্ষার স্বাধীনতা, ক্যাম্পাসে মুক্তচিন্তার পরিসর এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন চলছে, তারই ধারাবাহিকতা এই প্রতিবাদ। আগামী ২৭ তারিখ থেকে জাতীয় স্তরে ছাত্র আন্দোলনের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাতেও অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাম্পাসের বাইরের আলোচনা, মতবিনিময় এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পড়ুয়ার অভিযোগ, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ করা হয়নি। অথচ হামলার প্রতিবাদে সরব পড়ুয়াদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। তাঁর বক্তব্য, ক্যাম্পাসে হামলা, ভাঙচুর এবং পড়ুয়াদের হুমকি দেওয়ার মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠলেও নির্বাচন না হওয়ায় পড়ুয়াদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিসিটিভি বসানো এবং নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসে ইতিমধ্যেই সিসিটিভি থাকা সত্ত্বেও বহিরাগতদের হামলার অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আরও সিসিটিভি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ফেসিয়াল রেকগনিশন ব্যবস্থা এবং আরএফ আইডি কার্ড চালুর প্রস্তাব পড়ুয়াদের উপর নজরদারি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে। তাঁদের প্রশ্ন, ক্যাম্পাসের ভিতরে পড়ুয়াদের গতিবিধি চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করা হলেও বাইরে থেকে হামলা ঠেকানোর জন্য কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে? তাঁদের বক্তব্য, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নজরদারি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং পড়ুয়াদের স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশ এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ দিনের ওই সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন যাদপুরের পড়ুয়া ইন্দ্রানুজ রায়ও।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা। -- সংগৃহীত।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এসআরএফটিআইয়ের পড়ুয়াদের আন্দোলনকে একা লড়তে দেওয়া হবে না। যাদবপুর, জেএনইউ, জামিয়া, আইআইটি বম্বে, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী ও ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। আগামী দিনে জাতীয় স্তরে সমন্বিত আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার স্বাধীনতা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দাবিতে সরব হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

ইতিমধ্যে অভিনেতা নসীরুদ্দীন শাহ শনিবার এক ভিডিও বার্তায় এই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতকে তাঁরা সম্মান করেন, কিন্তু সব দিক বিচার করার আবেদনও করা হয়েছে।

এর মধ্যেই বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যায় যে কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বর্তমানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট পেশ করেছেন। তবে উপাচার্য সন্তোষ অজমেরা জানান, এটা একেবারেই রুটিন রিপোর্ট। সার্বিক পরিস্থি্তি নিয়ে তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পাঠাতে বাধ্য। তিনি সেটাই জানিয়েছেন মাত্র। তবে এ দিনও তিনি দাবি করেছেন পড়ুয়াদের একটা বড় অংশ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেই। তাঁকে যে ভাবে হেনস্থা করা হয়েছে তার পরেও হেনস্থাকারী পড়ুয়ারা ক্যাম্পাসে রয়ে গিয়েছেন। বহিষ্কার করা হলেও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাননি। যদিও পড়ুয়াদের দাবি, অধিকাংশ পড়ুয়ারাই তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গেই রয়েছেন।

গত ২৭ সেপ্টেম্বরই কলকাতা ক্যাম্পাসে গোলমাল শুরু হয়। ওই দিন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র সংঘর্ষ পরিস্থিতি শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে বহিরাগতেরা পড়ুয়াদের মারধর করেছেন। পাল্টা অভিযোগ তোলে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতও। পরে, ৪ অক্টোবর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও এক দফায় ক্যাম্পাসে হামলা চালান বহিরাগতেরা, অভিযোগ এমনই। তাই গত সপ্তাহে তাঁরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। এরই মধ্যে কড়া হয়েছেন কর্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার, দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় হঠাৎই নির্দেশিকা জারি করে পড়ুয়াদের ক্যাম্পাস খালি করতে বলেন কর্তৃপক্ষ। পুজোর ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। হস্টেল ও মেস বন্ধ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

কিন্তু ক্যাম্পাস ছাড়তে নারাজ পড়ুয়ারা। তাঁরা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন শনিবার পর্যন্ত। যদিও অভিযোগ, ক্যাম্পাসে জলের সংযোগও নেই। এই পরিস্থিতিতে ২৭ অক্টোবর থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন তাঁরা। আগামী ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে দশ দফা দাবি।

এসআরএফটিআই-এ পড়ুয়াদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা অস্থিরতার মধ্যেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করল কর্তৃপক্ষ। রবিবার, ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানের দাবি, কয়েক জন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের নোটিস এবং কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করার সিদ্ধান্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য নয়। বরং উপাচার্যের দফতরে ভাঙচুর, শারীরিক হেনস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম লঙ্ঘনের মতো নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পড়ুয়াদের নিজেদের মতামত প্রকাশ, অভিযোগ জানানো এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার অধিকারকে তাঁরা সম্মান করেন। শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কখনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কারণ হতে পারে না। তবে প্রতিবাদের অধিকারের অর্থ ভাঙচুর, শারীরিক হেনস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভাঙার দায় থেকে অব্যাহতি নয় বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, উপাচার্যের দফতর দখল করে রাখা এবং সেখানে ভাঙচুর চালানোর ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। জানলার কাচ ভাঙা, আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং জলের পাইপ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংযোগ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও তোলা হয়েছে। পাশাপাশি, একটি ঘটনায় এক পড়ুয়া উপাচার্যকে শারীরিক ভাবে হেনস্থা করেন এবং অন্যেরা তাঁকে লক্ষ্য করে চিৎকার, গালিগালাজ ও ভয় দেখান বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

এই ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখতে গঠিত তথ্য অনুসন্ধান কমিটির পাশাপাশি ডিন কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ডিন কাউন্সিলে বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, ডিন, রেজিস্ট্রার এবং তথ্য অনুসন্ধান কমিটির সদস্যেরা রয়েছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ফিল্ম এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের পঠনপাঠন আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের হস্টেল-সহ প্রতিষ্ঠানের চত্বর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম সুষ্ঠু ভাবে চালানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত। নির্দেশ সত্ত্বেও কয়েক জন পড়ুয়া প্রতিষ্ঠানের চত্বরে রয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, এই আন্দোলনে পড়ুয়া-সমাজের একটি অংশ যুক্ত। তাঁদের অবস্থানকে গোটা পড়ুয়া-সমাজের মতামত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কয়েক জনের কাজের জন্য অধিকাংশ পড়ুয়ার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয় বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ।

পড়ুয়া, অভিভাবক, শিক্ষক এবং কর্মীদের কাছে যাচাই না করা বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছোনোর আবেদন জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে এসআরএফটিআই।

Jadavpur University

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy