জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে আর দূরের কোনও আশঙ্কা নয়, তার প্রমাণ মিলছে একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে। অগস্টের শেষ সপ্তাহে নেপাল-চিন সীমান্তে হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপর্যয়ের পর ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিমবাহ গলে যাওয়া, অতিরিক্ত উষ্ণতা, চরম আবহাওয়া এবং পাহাড়ি এলাকার বিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেবল সাধারণ পরিবেশ বিজ্ঞান নয়, জলবায়ু পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশেষায়িত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ স্টাডিজ়’ পড়ার গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে আরও।
ক্লাইমেট চেঞ্জে কী কী কোর্স করা যায়?
পড়ুয়াদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সময়সীমা এবং নিজস্ব পছন্দের (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সোশ্যাল সায়েন্স কিংবা ম্যানেজমেন্ট) উপর ভিত্তি করে এই বিভাগে বেশ কয়েকটি ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্স রয়েছে।
১। এমএসসি অ্যান্ড বিএসসি ইন ক্লাইমেট সায়েন্স বা ক্লাইমেট চেঞ্জ : এই বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর, উভয় স্তরের ডিগ্রি কোর্সই রয়েছে। এতে ক্লাইমেট মডেলিং, বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান, বিশ্ব উষ্ণায়ন, গ্লেসিয়োলজি বা হিমবাহ বিজ্ঞান এবং আবহাওয়ার বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নিয়ে পড়ানো হয়।
২। এমএসসি ইন মেটিয়োরোলজি, ওশেনোগ্রাফি অ্যান্ড গ্লেসিয়োলজি: আবহাওয়া পূর্বাভাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ও উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পার্বত্য এলাকার হিমবাহ ও তুষারধস নিয়ে গবেষণাধর্মী স্পেশ্যালাইজ়েশন বিজ্ঞানভিত্তিক কোর্স এটি।
৩। এমটেক অ্যান্ড বিটেক ইন ক্লাইমেট টেকনোলজি বা এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং: ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিজ্ঞান স্নাতকদের জন্য এই কোর্সে জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তি পাঠের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
৪। মাস্টার্স বা পিজি ডিপ্লোমা ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট: এটি একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি কোর্স। এখানে জলবায়ু বিজ্ঞানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি, কার্বন ক্রেডিট এবং পরিবেশগত অভিযোজন পড়ানো হয়।
৫। এমবিএ ইন সাসটেনেবিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ বা কার্বন ট্রেডিং: কর্পোরেট সংস্থায় পরিবেশবান্ধব ব্যবসা পরিচালনা, ইএসজি কমপ্লায়েন্স এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর কৌশলভিত্তিক ডিগ্রি কোর্স এটি।
৬। এলএলএম ইন এনভায়রনমেন্টাল ল’ অ্যান্ড ক্লাইমেট জাস্টিস: আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন, জলবায়ু চুক্তি এবং ক্লাইমেট জাস্টিস নিয়ে স্নাতকোত্তর আইনের কোর্স এটি।
৭। এমএ ইন ক্লাইমেট ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজ়িলিয়েন্স: প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল উদ্ধার-পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গঠনের উপর বিশেষ ডিগ্রি কোর্স এটি।
কোন কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ?
আইআইটি বম্বে: এখানে আলাদা ভাবে রয়েছে ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট স্টাডিজ’। এখান থেকে সরাসরি জলবায়ু বিজ্ঞানে এমটেক এবং পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে।
আইআইএসসি বেঙ্গালুরু: এই কেন্দ্রীয় সরকারি বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ‘ডাইভেচা সেন্টার’-এর অধীনে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা এবং গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
গুজরাত বিশ্ববিদ্যালয়: এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবে চালু রয়েছে এমএসসি ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইমপ্যাক্টস ম্যানেজমেন্ট কোর্স।
আরও পড়ুন:
টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস, মুম্বই (টিআইএসএস): টিআইএসএস-এর ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেনেবিলিটি স্টাডিজ’-এর অধীনে এমএ বা এমএসসি ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেনেবিলিটি স্টাডিজ় পড়ানো হয়।
আইআইটি দিল্লি ও আইআইটি খড়গপুর: ‘সেন্টার ফর অ্যাটমস্ফেরিক সায়েন্সেস’-এর অধীনে বায়ুমণ্ডল, সমুদ্রবিজ্ঞান এবং ক্লাইমেট মডেলিং নিয়ে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি (জেএনইউ): ‘স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস’-এর অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত দিক নিয়ে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ বিহার ও কেরল: পরিবেশ বিজ্ঞান ও আবহ বিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পড়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাসটেনেবিলিটি সায়েন্স, এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ়, জিয়োগ্রাফি, অ্যাটমস্ফেরিক সায়েন্স এবং ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট-এর মতো বিষয়ে পড়াশোনা করে ক্লাইমেট চেঞ্জ-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে স্পেশ্যালাইজ়েশন করার সুযোগ রয়েছে।
কারা ভর্তি হতে পারেন?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক কোর্সে (এমএসসি, এমটেক): বিএসসি বা বিটেক ডিগ্রিধারীরা আবেদন করতে পারেন। গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান বা কৃষি বিজ্ঞানের প্রার্থীরা সাধারণত অগ্রাধিকার পান। সিইউইটি-পিজি, গেট বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে মেধানুসারে ভর্তি নেওয়া হয়।
নীতি, আইন ও ব্যবস্থাপনা ভিত্তিক কোর্সে (এমএ, এমবিএ, এলএলএম): টিআইএসএস কিংবা বিভিন্ন আইন ও ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের স্নাতকোত্তর স্তরের কোর্সে যে কোনও বিষয়ে (কলা, বাণিজ্য বা বিজ্ঞান) স্নাতক প্রার্থীরা আবেদন করার সুযোগ পান।
হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় পর পর বিপর্যয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ক্লাইমেট চেঞ্জ ও ক্লাইমেট পলিসি নিয়ে দক্ষ গবেষক ও পেশাদারদের চাহিদা আগামী দিনে আরও বাড়বে। বিশেষায়িত এই কোর্সগুলি সম্পন্ন করতে পারলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংস্থা, সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশগত ডেটা বিশ্লেষণ এবং ক্লাইমেট অ্যাডভাইসরি ফার্মগুলিতে পেশাগত কাজের বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়াও, ক্লাইমেট চেঞ্জ স্টাডিজ় বা জলবায়ু বিজ্ঞান সংক্রান্ত পাঠক্রম শেষ করার পর দেশের বাইরেও গবেষণা এবং চাকরির সুযোগ রয়েছে।