Advertisement
E-Paper

স্বাধীনতার এত বছর পরেও এখনও মনে হয়, আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত

স্বাধীন দেশ হলে, একটা সঠিক পরিবেশ এবং পরিমণ্ডল তৈরি হবে। মানুষ নির্বিঘ্নে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে, হেসে কথা বলবে সকলের সঙ্গে, যেখান জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা এবং মনুষ্যত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেখানে সবাই একসঙ্গে উৎসবে মাতবে।

পরান বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০৫
পরান বন্দ্যোপাধ্যায়।

পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আমরা কলকাতায় এসেছি ১৯৪৪ সালে। তখন সবে শৈশবে পা রেখেছি। কলকাতার দমদম এলাকায় আমাদের বাস। একটা দিন এল— ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’। সেই সময়ে রীতিমতো দাপাদাপি চলছে। দাদাদের দৌড়ঝাঁপ করতে দেখতাম। ১৯৪৭-এ যখন স্বাধীনতা এল, আমার অত বোঝার বয়সই হয়নি। পরে সবটা জেনেছি, স্বাধীনতা আন্দোলন কী, জীবন উৎসর্গ করা মানে কী ইত্যাদি।

স্বাধীনতা উৎসব পালন করা হত তখন। আমাদের এখানে একটা ক্লাব ছিল, জিমন্যাস্টিক ক্লাব। স্বাধীনতা উৎসবের দিন সাদা পোশাক পরে ক্লাবে যেতাম। ব্যান্ড বাজানো হত, বাঁশিতে বাজত দেশাত্মবোধক গানের সুর — ‘চল-চল-চল! ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণীতল…’। বড়রা ড্রাম বাজাতেন। গান হত। স্বাধীন ভারতের তেরঙা পতাকা তোলা হত। রংবেরঙের কাগজ দিয়ে সাজানো হত জায়গাটা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি খাকত, তাতে মালা দেওয়া হত, শ্রদ্ধা জানাতেন সকলে। লজেন্স, বিস্কুট দেওয়া হত। এ ছাড়া আর কোনও আড়ম্বর ছিল না। এটুকুই আনন্দ ছিল সেই সময়ে। কী যেন একটা হয়েছে দেশে, উৎসবে মেতেছে সবাই। এটাই ছিল শৈশবের অনুভূতি।

স্বাধীনতা বলতে কী বোঝেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়?

স্বাধীনতা বলতে কী বোঝেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়? ছবি: সংগৃহীত

ধীরে ধীরে কৈশোরে পৌঁছোলাম। চেতনা হল। জানলাম কারা কারা স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাণিজ্য করতে এসে কী ভাবে ইংরেজরা শাসকের লাঠি হাতে তুলে নিল, কী ভাবে তারা আধিপত্য বিস্তার করল। কবিগুরুর ভাষায়, ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল, পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডরূপে’। বড় হয়ে সে সব জেনে গায়ে কাঁটা দিত। স্বাধীনতার আরও কাহিনি জানলাম — চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বিপ্লব — সবই জানতে পারলাম, তবে অনেক পরে। তখন বলিদানের কথা পড়ে মুগ্ধতা বেড়েছে। জাতির জনককে চিনলাম, তাঁর অবদান জানলাম, জানলাম তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। যত দিন গিয়েছে, পরিণত হয়েছি, এক-এক রকম উপলব্ধি হয়েছে। কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, তা জানতে মনটা ছটফট করত।

এখন মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? স্বাধীন হলে এগুলো কেন হচ্ছে? এখনও মনে হয়, যা দেখছি শুনছি চারিদিকে, স্বাধীনতার সবটা কি পেয়েছি? বাইরের জগতের ইতিহাস তো কিছুটা জানা যায়। একটা দেশ স্বাধীন হলে তাঁদের কী সুন্দর অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, সাংস্কৃতিক স্বাচ্ছন্দ্য, মেলামেশা, খেলাধুলো — সবকিছু কত সুন্দর থাকার কথা। এত দিন হয়ে গেল স্বাধীনতার পর, কিন্তু এখনও মনে হয়, আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। কৈশোরে এই ভাবনা আমায় পীড়িত করেনি। তখন সবে দানা বাঁধছে ভাবনা। সাম্রাজ্যবাদী পীড়ন, শোষণ, অনেক দেশেই হয়েছে। তার পর অনেকেই বিধ্বস্ত হয়েছে, দেশ ছেড়েছে। আমাদের মনে হয়, নিজের দেশেই আমরা পরাধীন হয়ে আছি। কেমন যেন মনে হয়, পিছিয়ে আছি। শৈশবের শান্তিপূর্ণ স্বাধীনতা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। স্বাধীনতার সুখ যে বয়সে বোঝার কথা, সেই বয়সে এসে মনে হল স্বাধীনতার আসল সুখটা পাইনি।

গণতন্ত্রের কথা বলেছেন অভিনেতা।

গণতন্ত্রের কথা বলেছেন অভিনেতা। ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশে কোনও না কোনও অশান্তি তো চলছেই। মানুষ যা ভালবাসেন না, তা-ও চলছে। এমএলএ, এমপি হয়ে সকলেই ভাবেন, স্বাধীন ভাবে কাজ করবেন। মানুষ ঠিক করে দেন, কারা সমাজটা চালাবেন। কিন্তু যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁরা ভেবেই নেন, সারাজীবন তিনিই রাজা থাকবেন, তাঁর প্রজাদের নিয়ে চলবেন, জীবনযাপন করবেন। চলে লোভ, মিথ্যাচার। একটা সময় সহ্যের সীমা ছাড়ায়, কোথাও কোথাও তো তা-ই হয়। তবু এখনও মনে হয়, একটু অপেক্ষা করি। দেখা যাক কী হয়।

আমাদের গণতন্ত্র রয়েছে, সংবিধান রয়েছে। ক্ষমতায় এসে দেশের দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা যদি ভাবেন, তিনি যা বলবেন তা-ই হবে, নিয়মকানুন মানবেন না, মানুষ তখন সমালোচনা করবেনই। আর তা ছাড়া ইতিহাস পড়লেই তো বোঝা যায়, শেষপর্যন্ত তাঁদের পরিণতি কী হবে। সাধারণ মানুষের অনেকেই আবার সামলে চলেন, সমালোচনা করেন না, ভাবেন যদি সমস্যায় পড়েন। এটাও তো এক ধরনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।

জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ: পরান।

জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ: পরান। ছবি: সংগৃহীত

যাঁরা ক্ষমতায় আসছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, নিয়ম মেনে চলতে হয়। ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মানুষের সেবার জন্য। তবুও ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে। অপছন্দের কাজ হলেও অনেকেই তা সহ্য করছেন। কিছু মানুষ অবশ্য সহ্য করছেন না, প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। এখন স্বাধীনতা পালন সেই ভাবে হয় না। এখন ওই সব অন্য কাজ করলে আখের গোছানো যায়। সব উৎসব সবার জন্য নয়, কিছু মানুষের জন্য — এটা সকলের মাথায় ঢুকে গিয়েছে। এখন সব জায়গাতেই রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। রাজনীতি কখনওই অশ্রদ্ধার নয়। কিন্তু তা অপপ্রয়োগ করলে মুশকিল। সত্যি রাজনীতি, সঠিক রাজনীতি হলে মানুষ হইহই করতেন।

স্বাধীন দেশ হলে একটা সঠিক পরিবেশ এবং পরিমণ্ডল তৈরি হবে। একটা মানুষ নির্বিঘ্নে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে, হেসে কথা বলবে সকলের সঙ্গে, যেখানে জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা এবং মনুষ্যত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেখানে সবাই একসঙ্গে উৎসবে মাতবে। সেই পরিবেশটাই এত সুন্দর হয়ে যাবে যে, আলাদা করে প্রমাণ করতে হবে না, এই মানুষগুলো স্বাধীন দেশের নাগরিক।

Paran Bandopadhyay

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy