আর জি কর-কাণ্ডের বিচার চেয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন এক ব্যক্তি। এর পরেই জানা গেল, সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাওয়া ‘শিল্পীদের তালিকা’ থেকে বাদ পড়েছেন তাঁর গায়িকা স্ত্রী। স্বামী বিজেপির নেতা। তাই তাঁর স্ত্রীকে স্পষ্টই বলা হয়েছিল, সরকারি অনুষ্ঠানে গাইতে হলে স্বামীকে ছাড়তে হবে।
বিগত সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন গ্রেফতার হতেই সরব হয়েছেন অনেকে। প্রায় সকলেরই অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রী হলেও এ রাজ্যে গানবাজনার জগতে গত সাত-আট বছর ধরে শেষ কথা ছিলেন ইন্দ্রনীলই। তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকতে পারলে তবেই পাওয়া যেত সরকারি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ। তাঁর নির্দেশে প্রতিভাবান শিল্পীও ছিটকে গিয়েছেন সরকারি অনুষ্ঠানের শিল্পী-তালিকা থেকে।
লেক টাউনের বাসিন্দা, সঙ্গীতশিল্পী অমৃতা দত্তের অভিযোগ, ‘‘আর জি কর-কাণ্ডের পরে আমার স্বামী মৃতার বিচার চেয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। আমি রাস্তায় গান গেয়েছিলাম। তার পরেই দেখলাম, সরকারি অনুষ্ঠানের শিল্পী-তালিকা থেকে আমি বাদ পড়েছি। তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকেরা আমাকে জানিয়েছিলেন, উপরমহলের নির্দেশেই আমার নাম বাদ গিয়েছে। সেই সময়ে ইন্দ্রনীলদা ছাড়া তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের উপরমহল বলে কেউ ছিলেন না। কারা অনুষ্ঠান পেতেন, সরকারি অনুষ্ঠানের শিল্পী-তালিকা খুললেই দেখা যাবে।’’
পালাবদলের পরেই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে পায়েল মজুমদার নামে এক গায়িকা ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছিলেন, তাঁকে সরকারি অনুষ্ঠান পেতে হলে স্বামীকে ছেড়ে আসতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। ইন্দ্রনীল গ্রেফতার হওয়ার পরে পায়েল বললেন, ‘‘আমার স্বামী বিজেপি করেন, এটাই কি আমার অপরাধ? আমাকে ইন্দ্রনীলদা রবীন্দ্র সদনে সকলের সামনে বলেছিলেন, স্বামী বিজেপি করলে আর সরকারি অনুষ্ঠান কী করে করবি? সরকারি অনুষ্ঠান করতে হলে স্বামীকে ছেড়ে আসতে হবে।’’
বাম আমলের তুলনায় তৃণমূলের জমানায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছিল কয়েক গুণ। যার সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হত তথ্য-সংস্কৃতি দফতর থেকে। এমনকি, বেসরকারি উৎসবেও প্রাধান্য পেতেন সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাওয়া ইন্দ্রনীল-ঘনিষ্ঠ শিল্পীরা। অনেকেরই অভিযোগ, বিগত সাত-আট বছরে গানের জগতে ইন্দ্রনীল-ঘনিষ্ঠ নামী-অনামী মিলিয়ে ২৫-৩০ জন শিল্পীকে নিয়ে একটি অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। যারা সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠানে কার্যত রাজত্ব করেছিল বলে অভিযোগ।
গত মে মাসে সরকার বদলের পরে রবীন্দ্র সদন তল্লাটে এ নিয়ে প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছিলেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় ও দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে দুই গায়িকা। এমনকি, পেশাদার শিল্পীদের সংগঠনের মধ্যেও বিগত কয়েক বছরে এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা নিয়ে তুমুল অশান্তি হয়েছে। সেই সংগঠনেরই একাংশ জানাচ্ছেন, সংগঠনের আজীবন সদস্য হওয়ায় ইন্দ্রনীল তাদের বার্ষিক সভায় হাজির থাকতেন। এক বার এমনই একটি সভায় নতুন শিল্পীদের উদ্দেশে তিনি পরামর্শ দেন, গান গেয়ে রোজগারের কথা ভুলে শিল্পীরা যেন চা কিংবা ডিমের দোকান করেন।
শিল্পী মহলেরই খবর, শুধু সরকারি অনুষ্ঠান পাওয়া নয়, বাংলা সঙ্গীত মেলায় রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ, একতারা মুক্ত মঞ্চের মতো জনপ্রিয় মঞ্চগুলিতে ইন্দ্রনীল-ঘনিষ্ঠদের ভিড় দেখা যেত। তাঁদের কেউ কেউ তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের বিভিন্ন বিভাগ থেকে মাসিক বেতন পেতেন বলেও খবর। সরকার বদলের পরে সেই সব নামের তালিকা দুর্নীতির তদন্তকারী কমিশনের কাছে পাঠিয়েছেন বঞ্চিত শিল্পীদেরই একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, ইন্দ্রনীল-ঘনিষ্ঠ ওই সমস্ত শিল্পী অনেক বেশি সাম্মানিক পেয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। শিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘প্রশাসন তদন্ত করুক ওই সিন্ডিকেট শিল্পীদের বিরুদ্ধে। নতুন সরকারও সতর্ক হোক ওই সব নাম নিয়ে।’’
ইন্দ্রনীলের জমানায় এক বার পেশাদার শিল্পীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব প্রফেশনাল পারফর্মিং সিঙ্গার্স’ (অ্যাপস)-এর বেশ কয়েক জন সদস্যকে বাংলা সঙ্গীত মেলা থেকে কোনও কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়, যার প্রতিবাদ করে গায়ক সৈকত নিজের নাম ওই অনুষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করে নেন। তার পরে তিনিও একাধিক সরকারি অনুষ্ঠান থেকে বাদ পড়েন। বর্তমানে অ্যাপসের সম্পাদক সৈকত বলেন, ‘‘আমি অনেক কিছু নিয়েই প্রতিবাদ করেছি। এক-এক সরকারের এক-এক রকম নীতি থাকে।’’