মীরা নায়ারের ছবি ‘মনসুন ওয়েডিং’ থেকে শুরু করেছিলেন অভিনয়ের সফর। এর পরে ‘কিস্সা: দ্য টেল অফ আ লোনলি গোস্ট’, ‘আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’, ‘স্যার’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন বাঙালি অভিনেত্রী তিলোত্তমা সোম। গত কয়েক বছরেও ওটিটি-তেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ। কখনও তিনি পুলিশ আধিকারিক, কখনও তিনি আবার গোয়েন্দা দফতরের আধিকারিক। সম্প্রতি ‘ইক্কা’-তে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করলেন। তবে একসময় একই ধরনের চরিত্র এসেছে তাঁর কাছে বার বার। সেই বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া আক্ষেপ থেকে ইন্ডাস্ট্রির বৈষম্য, কাজ এবং রাজনীতি— নানা বিষয় উঠে এল তিলোত্তমা সোমের সঙ্গে একান্ত আলাপনে।
প্রশ্ন: ‘মনসুন ওয়েডিং’ থেকে ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’, ‘দিল্লি ক্রাইম’, ‘পাতাল লোক ২’— ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে করতে ব্যক্তি তিলোত্তমা কতটা বদলেছেন?
তিলোত্তমা: প্রত্যেকটি চরিত্রই কোনও না কোনও ভাবে বদল আনে। কিছু চরিত্র বেশি বদল আনে, কিছু চরিত্র কম। যে কোনও একটি চরিত্র বেছে নিতে হলে বলব অনুপ সিংহের ছবি ‘কিস্সা’র কথা। বলতে পারেন, ওটাই ছিল আমার অভিনয়ের ‘স্কুল’। অনুপই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এক জন পরিচালক একই সঙ্গে ভাল পরিচালক ও ভাল মানুষ হতেই পারেন।
প্রশ্ন: কেন? এর নেপথ্যের ভাবনাটা ঠিক কেমন?
তিলোত্তমা: আসলে বহু পরিচালক মনে করেন, অভিনেতাকে নিয়ন্ত্রণ করাই তাঁদের কাজ। সেটা করতে করতে তাঁরা নিজেদের সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু অনুপ অভিনেতাকে নতুন করে আবিষ্কারে বিশ্বাস করতেন। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতেন, যেখানে অভিনেতা নতুন কিছু খুঁজে নিতে পারেন। শুধু ছবির প্রয়োজনটুকু নয়, ছবির বাইরের মানুষটিকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন। খুব কম পরিচালকই এটা করেন। ‘পাতাল লোক’-এর সেটেও আবার সেই অনুভূতি পেয়েছিলাম।
প্রশ্ন: চিত্রনাট্য পড়তে গিয়ে চরিত্রের ঠিক কোন বিষয়টি আপনাকে আকৃষ্ট করে?
তিলোত্তমা: সেটা চিত্রনাট্যের উপরেই নির্ভর করে। কখনও কোনও একটি সংলাপ, কখনও কোনও দৃশ্য, আবার কখনও চরিত্রের বাহ্যিক বিবরণটাই আমাকে উত্তেজিত করে। কী ভাবে চরিত্রটির মধ্যে ঢুকছি, সেটা বড় বিষয় নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল, চরিত্রটিকে যেন জীবন্ত মনে হয়। চরিত্রটি যেন আমার কাছেও সম্পূর্ণ নতুন মনে হয়।
প্রশ্ন: সম্প্রতি ‘ইক্কা’য় অভিনয় করলেন। ইন্ডাস্ট্রিতে ২৫ বছর কাটানোর পরে ‘ইক্কা’-র মতো মূলধারার ছবিতে কাজ করার অনুভূতি কেমন?
তিলোত্তমা: ২৫ বছর আগে ‘মনসুন ওয়েডিং’-এর সেটে প্রথম দিন যে বিস্ময় অনুভব করেছিলাম, ২৫ বছর পরে ‘ইক্কা’-র সেটে ঢোকার সময়ও তেমনই উত্তেজনা অনুভব করেছি। দু’টি সেটের মধ্যে একটা জায়গায় মিল ছিল। দু’টি ছবির ক্ষেত্রেই আমাকে বোঝানো হয়েছিল, ছবিটির সাফল্যের জন্য আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক জন পরিচালক এই অনুভূতিটা অভিনেতাকে দিতে পারলে, অর্ধেক কাজ তো সেখানেই হয়ে যায়। অভিনেতা নিরাপদ বোধ করেন এবং নিজের সেরাটাও দিতে পারেন অনায়াসেই।
প্রশ্ন: বেশ কয়েক বছর আগে শুটিং হওয়া ‘ডিপ৬’ মুক্তি পেল কলকাতায়। সুজিত সরকারের ছবিটি কলকাতার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তৈরি। অভিনেতা হিসাবে কোন বিষয়টি আপনাকে আকৃষ্ট করেছিল?
তিলোত্তমা: ছবিটিতে রাজনীতি খুব গভীর ভাবেই রয়েছে, তবে সরাসরি নয়। এই বিষয়টিই আমার খুব ভাল লেগেছিল। বামপন্থার ব্যর্থতা এবং তার ভিতরে থাকা উগ্র পুরুষতন্ত্রকে পরিচালক মধুজা মুখোপাধ্যায় খুবই তীক্ষ্ণ ভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন: বিনোদনজগতের পুরুষতন্ত্রের কথাও তো প্রায়ই উঠে আসে। ওটিটি আসায় কি অভিনেত্রীদের পরিধি কিছুটা বেড়েছে? নাকি এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
তিলোত্তমা: প্রত্যেক ব্যক্তি এবং বিষয়েরই কিছু ভাল দিক থাকে, আবার সীমাবদ্ধতাও থাকে। এই মৌলিক বিষয়টা মাথায় রেখেই সব কিছু দেখা উচিত। তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত, ওটিটি মঞ্চ আমার কেরিয়ারকে সেই সময়ে শ্বাস নেওয়ার এবং বেড়ে ওঠার জায়গা দিয়েছে, যখন আমার সেটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
প্রশ্ন: যে ধরনের কাজ আপনি করতে চাইতেন, তা কি সেই সময়ে পাচ্ছিলেন না? কাজের ক্ষেত্রের প্রত্যাখ্যানই বা কী ভাবে সামলেছিলেন?
তিলোত্তমা: ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এখন অনেক সহজে এ সব সামলাতে পারি। একটা সময়ে প্রত্যাখ্যানের পরে আমার নিজেকে বেশ ছোট লাগত। ফের ঘুরে দাঁড়াতে কয়েক মাস লেগে যেত, এক বার তো দু’বছরও লেগেছিল।
প্রশ্ন: তার পরে নিজেকে বোঝালেন কী ভাবে?
তিলোত্তমা: আসলে কম বয়সে মনে হয়, নষ্ট করার মতো অনেক সময় থাকে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সময়ের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্কটা বদলে যায়। তখন দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অনেক কাজ করার রয়েছে, অথচ সময় খুব কম।
প্রশ্ন: বিনোদনজগতে কখনও নিজেকে বহিরাগত মনে হয়েছে?
তিলোত্তমা: হ্যাঁ, একসময় এই কারণে নিজেকে খুব ছোট ও ক্ষমতাহীন মনে হত। এই অনুভূতিগুলির মধ্যে অনেকটা সময় নষ্ট করেছি। কোনও লাভ হয়নি। শুধু অন্য কোনও অভিনেতাকে একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে দেখলে তাঁর প্রতি সহানুভূতি তৈরি হত।
প্রশ্ন: এই ভাবনা থেকে কী ভাবে নিজেকে মুক্ত করলেন?
তিলোত্তমা: এই প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম এবং তার দৈনন্দিন অনুশীলন আমাকে নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেছে। অন্যের সম্পদ গুনে কেউ ধনী হয় না। তাই এগিয়ে যেতে হবে, না হলে সেই তিক্ততার মধ্যেই চাপা পড়ে থাকতে হবে।
প্রশ্ন: বিনোদনজগতে মহিলা ও পুরুষ শিল্পীদের পারিশ্রমিকের বৈষম্য নিয়েও কথা হয়। কখনও কোনও পুরুষ সহ-অভিনেতার পারিশ্রমিক জানার পরে অবাক হয়েছেন?
তিলোত্তমা: ও হ্যাঁ! আমরা একটি রেস্তরাঁয় খেতে গিয়েছিলাম। সবার খাবারের বিল আমি দিচ্ছিলাম। খাওয়ার মাঝপথে সেই পুরুষ তারকা জানতে পারেন, আমি কত পারিশ্রমিক পাচ্ছি। তিনি এতটাই অবাক ও দুঃখিত হয়েছিলেন যে বলেছিলেন, শুটিংয়ের বাকি দিনগুলিতে প্রতিদিন আমার খাবারের বিল তিনি দেবেন। আমার বুঝতে বেশি সময় লাগেনি, পারিশ্রমিকের ফারাকটা মোটেই সামান্য নয়।
প্রশ্ন: ‘মনসুন ওয়েডিং’-এর পরে আপনাকে বার বার গৃহপরিচারিকার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হত। সেই নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্র থেকে বেরোনোর পথটা কেমন ছিল?
তিলোত্তমা: এই লড়াই প্রায় ২০ বছরের। হনী ত্রেহান (কাস্টিং পরিচালক) খুব জোর দিয়েছিলেন, আমি যেন ‘হিন্দি মিডিয়াম’-এ অভিনয় করি এবং এই শ্রেণিগত ধারণাটা ভাঙি। এই পরিবর্তনের পথ দেখানোর জন্য এবং তার পর যাঁরা আমাকে বিশ্বাস করেছেন, সেই সব পরিচালকের কাছে আমি ভীষণ ভাবে কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: ৩০ বছর বয়সেই আপনাকে পরোক্ষ ভাবে বলা হয়েছিল, অনেকটা দেরি করে ফেলেছেন। বয়স নিয়ে ঠিক কী বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয়?
তিলোত্তমা: বার্তাটা খুব স্পষ্ট ছিল। তবে এটা নতুন কিছু নয়। চলচ্চিত্রজগতের বাইরেও মহিলাদের প্রতিনিয়ত বয়স নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য এবং ধারণার সঙ্গে লড়তে হয়। সত্যি বলতে, বয়স নিয়ে এই কথাবার্তাকে আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি। জীবনের উদ্দেশ্য যত পরিষ্কার হয়েছে এবং আমার অভিনয়ের দক্ষতা যত বেড়েছে, নিজেকে ততই তরুণ ও প্রাণবন্ত মনে হয়েছে।
প্রশ্ন: বিনোদনজগতে সৌন্দর্যের কিছু নির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। সেগুলো কি কোনও ভাবে আপনাকে ভাবিয়েছে?
তিলোত্তমা: হ্যাঁ, বয়সের চেয়ে আমি বেশি সচেতন ছিলাম, আমাকে দেখতে কতটা ‘সাধারণ’ লাগে, সেটা নিয়ে। এই ধারণাটা বদলাতে অনেক কাজ করতে হয়েছে। সাধারণের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়া এবং তাকে উদ্যাপন করতে শেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রশ্ন: পর্দায় শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করেন। বাস্তবেও নিজের গণ্ডি নিয়ে খুব সতর্ক থাকেন। ইন্ডাস্ট্রিই কি এমন হয়ে উঠতে বাধ্য করেছে?
তিলোত্তমা: আমাদের দেশের বেশির ভাগ মহিলার মধ্যেই এগুলি বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি হিসাবে তৈরি হয়ে যায়। নিজের পরিচয় এবং গণ্ডি সবসময় একই রকম থাকে না। জীবনের কোনও সময়ে আমরা খোলামেলা থাকি, আবার কিছু ঘটনা আমাদের গুটিয়ে যেতে বাধ্য করে। তবে স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে, আমি মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকতেও রাজি। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস না করে বাঁচতে চাই না। তবে ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু বিষয়ে গণ্ডি মেনে চলতেই হয়।
প্রশ্ন: যেমন?
তিলোত্তমা: ইন্ডাস্ট্রিতে এমন সৃজনশীল মানুষদের আমি সম্মান করি না, যাঁরা নিজেদের উদারপন্থী হিসাবে তুলে ধরেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পরিবার এবং স্বচ্ছন্দের কথাই কেবল ভাবেন, আর পুরো টিমকে কম পারিশ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করান। এখন এই ধরনের সেটে কাজ করতে আমার ভাল লাগে না। সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিগত ভাবে কাজটি যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, আমি নিজেকে দূরে রাখি। এই সীমারেখা আমি অভিজ্ঞতা থেকেই শিখেছি।
‘ইক্কা’ ছবির একটি দৃশ্যে তিলোত্তমা। ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটি চিত্রনাট্যে তিলোত্তমা সোমের ঠিক কী প্রয়োজন, যা ২০ বছর আগে প্রয়োজন ছিল না?
তিলোত্তমা: চিত্রনাট্য নিয়ে আমার প্রত্যাশা মূলত একই রয়েছে। তখনও চরিত্রের সূক্ষ্মতা এবং রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখনও তাই। তবে আগের চেয়ে রসবোধ এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেটা বদলেছে, তা হল, এখন এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছেটা বেশি, যাঁরা সৃজনশীল হওয়ার পাশাপাশি ভাল মানুষও।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: দেশে এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছেন অনেকেই। শিল্পী হিসাবে এই মুহূর্তে দেশের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করে?
তিলোত্তমা: শিক্ষা এবং জলবায়ু আমাকে সবচেয়ে ভাবায়। এই দু’টি জায়গা নতুন করে গড়ে তুলতে পারলে সমাজের অনেক বৈষম্য ঘুচিয়ে একটা ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে আমার মনে হয়। আমার দুঃস্বপ্নগুলো সবই পরিবেশ নিয়ে। আর ভয়টা আরও বেশি, কারণ বাস্তব পরিস্থিতি আমার দুঃস্বপ্নের থেকেও খারাপ।