“জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার”। আক্ষরিক অর্থেই জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্ক্তিকে সার্থক করে মঞ্চে ফিরল বাংলা ব্যান্ড ‘পরশপাথর’। ২০ বছর পরে বাংলা সঙ্গীতজগতে ফিরে সদস্যেরা বার্তা দিলেন সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন এ সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে। আবার গানে গানে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার কথাও তুলে ধরল ‘পরশপাথর’।
শনিবার সন্ধ্যায় মধুসূদন মঞ্চে ছিল তাঁদের অনুষ্ঠান। পুরনো গান নিয়ে ফিরল ‘পরশপাথর’। তেমনই পুরনোদের সঙ্গে জুড়ে গেল নতুন মুখ। উঠে এল একসময় ব্যান্ড ভেঙে যাওয়ার গল্প। আবার কী ভাবে নতুন ভাবে গড়া হল সেই ব্যান্ড, সে কথাও জানালেন ব্যান্ডের গায়ক অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় ব্যান্ডের সদস্যেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তবে ২০ বছর পরে আবার তাঁরা একসঙ্গে। ২০২৫-এর ডিসেম্বর থেকে আবার মঞ্চে সফর শুরু করে ‘পরশ পাথর’। তাই তাঁদের জন্য ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র প্রত্যাবর্তন অ্যালবাম ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ নামটিও প্রযোজ্য। শনিবারও ‘পরশপাথর’-এর প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী থাকলেন শ্রোতাদর্শক।
বছর কুড়ি পরে ফের একসঙ্গে ‘পরশপাথর’।
ফেরার পরে ব্যান্ডে যোগ হয়েছেন নতুন কয়েকজন। পুরনোও রয়ে গিয়েছেন কেউ কেউ। অয়ন সেই নতুন ও পুরনোদের এক মঞ্চে নিয়ে এলেন কখনও ‘আর্চিজ় গ্যালারি’, কখনও আবার ‘ইচ্ছেডানা’র মতো অতি-পরিচিত গানের মধ্যে দিয়ে। নিজেদের গান ছাড়াও অঞ্জন দত্ত ও ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গানও শোনালেন তাঁরা। গায়ক অয়ন, কিবোর্ডে রাজা নারায়ণ দেব, গিটারে ঋষি চন্দ ও ড্রামস্-এ কিংশুক চক্রবর্তী আগেও ছিলেন ব্যান্ডে। বেস গিটারে অর্ণব বাচস্পতি চক্রবর্তী এবং কিবোর্ডে সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায় (বুটি) নতুন সদস্য ব্যান্ডের। সেই সঙ্গে ফিরলেন প্রবীণ থেকে নবীন শ্রোতাদর্শক। পুরনো শ্রোতাদের কেউ কেউ নিয়ে এলেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মদের নিয়ে। পরিচয় করালেন ব্যান্ডের সঙ্গে।
শ্রোতারাই বৃহত্তর ‘পরশ পাথর’, মনে করেন ব্যান্ডের সদস্যেরা।
জনপ্রিয়তা থাকলেও, গান গেয়ে উপার্জন তেমন হত না। এমনই নানা কারণে একসময় থমকে গিয়েছিল ব্যান্ডের পথচলা। আনন্দবাজার ডট কমকে জানান অয়ন। কিন্তু তাঁর মতে, মানুষ ‘পরশপাথর’-এর গান শুনত ঠিকই। কিন্তু গান গেয়ে উপার্জন করে সংসার চালানো খুব সহজ ছিল না। যথারীতি যে যাঁর কাজের স্বার্থে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বর্তমানে পরিস্থিতির বেশ কিছুটা বদল হয়েছে বলেই তিনি মনে করেন।
২০ বছর পরে প্রত্যাবর্তন। তবে বন্ধুত্বের কোনও খামতি হয়নি এতগুলো বছরে। বরং তাঁদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে বলে জানান অয়ন। এককথায় তিনি বলেন, “পাক ধরে গেছে চুলে, গালগুলো গেছে ঝুলে। এটুকু ছাড়া কিছু বদলায়নি।” একই সুরে ঋষিও বলেন, “সবটাই আরও গভীর হয়েছে এবং পরিণত হয়েছে।” সেটাই প্রকাশ পেল অনুষ্ঠানের মঞ্চেও। বেসবাদক বাচস্পতি অর্ণবের বিয়ের প্রসঙ্গও উঠে এল।
দর্শকাসনে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। গলা মেলালেন তিনিও।
কিছু দিন আগেই বাচস্পতি অর্ণব অভিযোগ করেছিলেন, দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর বাড়ি ২০১৩ সালে ভাড়া নিয়েছিলেন গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার। কিন্তু সেই বাড়ি তিনি নাকি আর ছাড়েননি। বিষয়টি নিয়ে চলছে আইনি লড়াইও। তবে এই গুরুগম্ভীর বিষয়কেও হাসির মোড়কে তুলে ধরলেন অয়ন। শিলাজিতের উদ্দেশে মঞ্চ থেকেই তাঁর বার্তা, “চলুন, শিলাদাকে সকলে মিলে বাড়ি ছাড়তে বলি। ছেলেটা (বাচস্পতি) বিয়ে করতে পারছে না।”
মঞ্চে ‘পরশপাথর’ যখন ‘আজও আছে’, ‘ভাল লাগে’র মতো গান গাইছেন, তখন তাঁদের সঙ্গে গলা মেলান উপস্থিত শ্রোতারাও। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যান্ডের অনুরাগী। অথচ এত বছরেও নেই কোনও ফ্যানক্লাব? মঞ্চ থেকেই ব্যান্ডের সদস্যদের বার্তা, “‘পরশপাথর’-এর ফ্যান ক্লাব হয় না। ফ্যান মানেই ফ্যানাটিক। আমরা কারা যে, ফ্যান ক্লাব গড়ব! যাঁরা মঞ্চের সামনে বসে আছেন, তাঁরা আসলে বৃহত্তর ‘পরশ পাথর’।” নতুন রূপে ‘পরশ পাথর’-কে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলা সঙ্গীতজগতের অনেকেই। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্ত, রাতুলশঙ্কর, দেবাদিত্য চৌধুরীরা ছিলেন দর্শকাসনে।
গানের মঞ্চে ঘুচল কি রাজনৈতিক দূরত্ব? পাশাপাশি (বাঁ দিকে) রাজ্যের মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও (ডান দিকে) সিপিএমের শতরূপ ঘোষ।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯১ সালে এই ব্যান্ডের পথচলা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অশান্ত। সে কথাও মঞ্চ থেকে তুললেন গায়ক অয়ন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে থাকার বার্তা দিলেন। আবার সেই মঞ্চেই একসঙ্গে ডেকে নিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও সিপিআইএম নেতা শতরূপ ঘোষকে। এ ভাবেই যেন বার্তা দিলেন, গান সব দূরত্ব মিলিয়ে দিতে পারে।