সকাল সকাল এমন একটা খবরের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। নানা পটেকর আর নেই, অত্যন্ত হৃদয়বিদারক সংবাদ। খুব ছোটবেলা থেকে আমি নানাজির অভিনয়ের ভক্ত। ‘প্রহার’ হোক, ‘পরিন্দা’ বা পরবর্তী কালে একের পর এক সিনেমা— যখনই যা দেখেছি, নতুন করে ওঁর ভক্ত হয়েছি। ‘সলাম বম্বে’ যখন দেখেছিলাম, মুগ্ধ হয়েছি ওঁর অভিনয়ে। বার বার ভাবতাম, কী করে চরিত্রগুলিকে বাস্তব করে তোলেন!
পরে যখন সিনেমা বানাতে শুরু করলাম, তখন দু’বার দুটো সিনেমার জন্য ওঁর সঙ্গে কথা হয়। এক বার কথা হয় ‘বেলাশেষে’র জন্য। ভাবা হয়েছিল, মরাঠী ও হিন্দি, দুই ভাষাতেই করা হবে ছবিটি। তখনই নানাজির কথা ওঠে। ওঁকে সিনেমাটা পাঠানো হয়। সিনেমা ভাল লেগেছে বলেও জানান। কিন্তু, বিভিন্ন কারণে সেই কাজটা করা যায়নি। পরবর্তী কালে ‘পোস্ত’ ছবির জন্যও ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেই সিনেমাটাও উনি দেখেছিলেন। কিন্তু, সেই কাজও আর করা হয়নি। তবে আমার প্রাপ্তি একটাই, ওঁর সঙ্গে যখন দূরভাষে কথা হয়, উনি জানিয়েছিলেন সিনেমাগুলি ভীষণ পছন্দ হয়েছে। সৌমিত্রদার (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, আমাদের সিনেমারও খুব প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের যে কোনও ভাষায় ছবিটি করা যেতে পারে, এমনই এর বিষয়। এই দু’টি সিনেমায় অভিনয় করার জন্যই আগ্রহী ছিলেন তিনি। কিন্তু, অপ্রাপ্তি এটাই যে ওঁর সঙ্গে শেষমেশ কাজটা করা হয়ে ওঠেনি। আর সেই আক্ষেপ সারাজীবন থেকে যাবে।
মনে আছে, সৌমিত্রদার অভিনয় দেখে নানাজি বলেছিলেন, ওই কাজ আর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। বলেছিলেন, “ওঁর অভিনয় খুবই অন্তর্মুখী। এই অভিনয় ভারতবর্ষের খুব কম অভিনেতাই করতে পারেন। কিন্তু, আমি আমার মতো করে চেষ্টা করব।” ছবিটি মহারাষ্ট্রের মাটির কাছাকাছি কী ভাবে নিয়ে যাওয়া যায়, কী ভাবে গল্পটাকে আরও মরাঠী দর্শকের মনের কাছের করে তোলা যায়, সেই নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু, করোনা ও ওঁর শারীরিক অসুস্থতার মতো বিভিন্ন কারণে একসঙ্গে কাজ করা হয়ে ওঠেনি।
আরও পড়ুন:
ওঁর সঙ্গে প্রথম কথা বলেই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আপ্লুত হয়ে বলেছিলাম, আমি আজ ধন্য যে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। আমার ছোটবেলা গড়ে উঠেছে আপনার অভিনয় দেখে। বার বার দেখেছি আপনার অভিনয়। প্রেক্ষাগৃহে আপনার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, কেঁদেছি, অবাক হয়েছি। সেই মানুষটার সঙ্গে কথা বলছি, নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। নিশ্চয়ই এ রকম কথা অনেকেই ওঁকে বলেছেন। আমিও তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
ওঁর ব্যক্তিত্বের কাছে, ওই মহীরুহের কাছে আমরা তো কেউ নই। কিন্তু ওঁর মতো বিনয়ী মানুষ আমি কম দেখেছি। আমার কথা যে উনি মন দিয়ে শুনেছিলেন, সবচেয়ে বড় কথা— সময় বার করে যে সিনেমাগুলো দেখেছিলেন সেটাই আমার জন্য অনেক।