Advertisement
E-Paper

উত্তপ্ত যাদবপুর! নিত্য আঁচ বাড়ছে ক্যাম্পাসে, কী প্রতিক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তারকা প্রাক্তনীদের?  

গত বুধবার রাতে এসএফআই এবং অন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপি-র সংঘর্ষ থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সেই রেশ এখনও কাটেনি। কী প্রতিক্রিয়া বাংলা বিনোদনজগতের শিল্পীদের যাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০৮
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী তারকারা কী বলছেন?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী তারকারা কী বলছেন? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

উত্তপ্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। গত বুধবার রাতে এসএফআই এবং অন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপি-র সংঘর্ষ থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সেই রেশ এখনও কাটেনি। কী প্রতিক্রিয়া বাংলা বিনোদনজগতের শিল্পীদের, যাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন?

যাদবপুরের এই পরিস্থিতিতে ঘৃতাহুতি দেয় বৃহস্পতিবার দুপুরের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন একদল বহিরাগত। তাঁদের হাতে ছিল এবিভিপি-র পতাকা। কিন্তু মূল ফটক বন্ধ থাকায় তা টপকানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। অভিযোগ, সে সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীকের উপর পা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন বহিরাগতেরা। ফলে এমব্লেমের ভিতর থেকে ভেঙে পড়ে বৃত্তাকার ধাতব অংশ। এই বহিরাগতেরা গেরুয়া শিবিরের বলে অভিযোগ বাম শিবিরেরে। পরিস্থিতির নিন্দা করেছেন গায়ক তথা গীতিকার অনুপম রায়। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলেন। যা-ই ঘটুক, তিনি পড়ুয়াদের পক্ষে, জানিয়ে দেন অনুপম। তিনি বলেন, “আমি নিজেও তো একসময় ছাত্র ছিলাম। তাই জানি, ছাত্রাবস্থার আবেগ খাঁটি হয়। আমি সব সময়ে ছাত্রদের পক্ষেই।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু সরকারি, তাই পড়ুয়াদের প্রশ্ন তোলা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়, মনে করেন অনুপম। তাঁর কথায়, “সমস্যাটা হল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি। সরকারি বলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তুলনামূলক ভাবে বুদ্ধিমান ও মেধাবী হয়ে থাকেন সাধারণত। তাই তাঁরা সরকারকে প্রশ্ন করতে জানেন। কিন্তু প্রশাসন কখনওই চায় না, কোনও প্রশ্ন করা হোক। তবে বৈধ গণতন্ত্রে, সরকারের দিকে প্রশ্ন তোলাই তো স্বাভাবিক। যাদবপুর বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা তো এটা করেই থাকেন, যা সরকারের পছন্দ নয়।” এই প্রসঙ্গ টেনেই তিনি আরও বলেন, “আসলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলে সরকার ভাবে, ‘আমিই তো এদের পড়াচ্ছি।’ কিন্তু সরকার নয়, সাধারণ মানুষের করের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চলে। এখানে পড়ুয়ারা প্রশ্ন করবেই। খারাপ লাগে, এত বছরের ঐতিহ্যকে মানুষ সম্মান দিতে পারে না।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভাঙচুর নিয়ে পুলিশেও অভিযোগ করা হয়েছে বাম সমর্থমক পড়ুয়াদের তরফ থেকে। বিষয়টি নিয়ে চাপানউতর চলছে। সোমবার ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরাতে আগেই সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের কথা জানিয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ। সোমবার বিকেলে সেই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। তবে সেই বৈঠকে থাকেনি এবিভিপি। এই গোটা পরিস্থিতিতে বিরক্ত গায়ক অনিন্দ্য বসু। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। পড়েছিলেন তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে। তাঁরও বক্তব্য, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তো সারা বিশ্বে মেধার জন্যই পরিচিত। চিরকালই রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসাবে পরিচিতি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত। যাঁরা এ সব করছেন, তাঁরা কী ভাবে লাভবান হচ্ছেন, জানি না। নিজে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী হিসাবে আমি খুবই বিরক্ত।” তবে এসএফআই ও এবিভিপি-র এই তরজায় কে বা কারা ঠিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক খুলে ফেলেছেন, এবং কারা ভাঙচুর চালিয়েছেন, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন অনিন্দ্য। তাঁর কথায়,“আমরা তো সাধারণ মানুষ। কে বা কারা যে করেছে এ সব, তা বোঝা যাচ্ছে না। কোনটাকে ঠিক বলব আর কোনটাকেই বা ভুল বলব! তবে যা-ই হয়েছে, তা অনভিপ্রেত।”

তবে কোনও দ্বিধা, সংশয় নেই নাট্যকার সুমন মুখোপাধ্যায়ের। তিনিও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন এক সময়ে। তিনি আপাতত দেশের বাইরে আছেন। তবে সেখান থেকেই জানান যে, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা মিলে যে প্রতিবাদের নানা আয়োজন করছেন, তাতে তিনি তার সঙ্গে আছেন। সুমন বলেন, “যাদবপুরে যা হচ্ছে, তা অত্যন্ত খারাপ এবং নিন্দনীয়।”

এসএফআই এবং অন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, কী ভাবে ভেঙে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী অভিনেত্রী উষসী চক্রবর্তী জানান, তিনি এই ঘটনায় বিশেষ ভাবে আহত। তাঁর কথায়, “এই প্রতীককে রক্ষা করা সমস্ত পড়ুয়ার কাজ। আমি তো আহত হয়েছিই। রাজনৈতিক দল নির্বিশেষেই, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে যাঁরা ভালবাসেন, তাঁরা কী ভাবে এই প্রতীকটির ক্ষতি করতে পারেন, আমি জানি না।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কোন ছাত্র সংগঠনের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হোক নির্বাচনী পদ্ধতির উপর নির্ভর করে, মত উষসীর। তাঁর কথায়, “নিয়ম মেনে পরীক্ষা বা নির্বাচনের মাধ্যমে হোক সবটা। মারপিটের আবহ মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। এতে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তিও সারা বিশ্বের কাছে খারাপ হচ্ছে। দ্রুত পঠনপাঠনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে আসুক।”

সিসিটিভি প্রসঙ্গেই এই তরজায় বার বার উঠে এসেছে ২০২৩ সালে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের যাদবপুর হস্টেলে মৃত্যুর প্রসঙ্গও। সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এবিভিপি-র সমর্থন ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পক্ষে। সেই প্রসঙ্গ টেনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের আর এক প্রাক্তনী ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “যারা একসময় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর দাবিতে সুর চড়িয়েছিল, আজ তাদেরই কাউকে কাউকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনও পদক্ষেপ করা হল না। যাঁরা সমাজমাধ্যমে বলে দেন, ক্যাম্পাসে কী কথা বলা উচিত, কী ভাবে চলা উচিত, সেই সুশীল সমাজ কিন্তু নীরব।” কিছুটা ব্যঙ্গের সুরেই তিনি বলেন, “এই সুশীল সমাজকে অভিনন্দন, তাঁরা ভয়কে আউট করে ভরসাকে ইন করেছেন। আশা করি, তাঁদের চোখে পড়েছে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার ভরসা আউট হয়ে ভয় ইন হয়েছে।”

একই রকম স্পষ্ট মত শোলাঙ্কি রায়ের। অভিনেত্রী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি পুরো ঘটনাকেই ‘গুন্ডামি’ বলে মনে করছেন। তাঁর কথায়, “যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ভাবনাচিন্তার ক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোকে চেপে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে শাসকের। ভাবতে পারার ক্ষমতাটাই নষ্ট করতে চায় এরা। সরকার শুধু কাঠের পুতুল চায়। কেউ প্রশ্ন করলেই সে খারাপ। ইচ্ছা করেই ভাঙচুর করা হল, যাতে পুলিশ মোতায়েন করা যায়। স্বৈরতন্ত্র এমনই হয়। আমাদের সরকার যে স্বৈরতান্ত্রিক, তা বলতে আমার কোনও দ্বিধা নেই। ২০১১ সাল থেকেই যাদবপুরকে আক্রমণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করে, তাদের যোগ্যতা নেই এখানে পড়াশোনা করার।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন অভিনেত্রী মধুমিতা সরকারও। তিনি দর্শনের ছাত্রী ছিলেন। তবে ছাত্রাবস্থায় চেষ্টা করতেন নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে। বরাবরই রাজনৈতিক চাপানউতর এড়িয়ে চলেছেন তিনি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাবরই রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় বলা হয়। কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাটাই বেশি হওয়া কাম্য। কিন্তু প্রাক্তনী হিসাবে পড়ুয়াদের উপর আক্রমণ আমি কোনওমতেই মেনে নিতে পারছি না।”

এখনও শিরোনামে যাদবপুর। অশান্তির উত্তাপ স্তিমিত হলেও পুরোপুরি শান্ত নয় পরিস্থিতি। কবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশিষ্ট প্রাক্তনীদের সকলেই।

Anupam Roy anindya bose Solanki Roy Suman Mukhopadhyay Ushasie Chakraborty Madhumita Sarcar Rwitobroto Mukherjee

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy