টোটার সঙ্গে পরিচয় বহুদিনের। ১৯৯৩ সাল হবে সেটা, পরিচালক প্রভাত রায় ‘শ্বেত পাথরের থালা’ ছবির পর টোটাকে নিয়ে ‘দুরন্ত প্রেম’ ছবিটি করেছিলেন। ওটাই টোটার প্রথম ছবি। সেই সময়ে ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ। আমার মনে হয়, ওর বয়সটা ওখানেই আটকে গিয়েছে, বাড়েনি একটুও। তখন যে টোটাকে দেখেছিলাম, এখনও আমার চোখে টোটা তেমনই রয়েছে। টেলিফিল্মেও একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা। টোটার পরিবারের সোনার ব্যবসা। কিন্তু সেই দিকে ওর বিন্দুমাত্র ঝোঁক ছিল না। ও সবসময় ক্রিয়েটিভ কাজের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে চেয়েছে।
টোটা নিজের কাজের প্রতি খুব সৎ, স্বচ্ছ মনের মানুষ আর স্পষ্টবাদী। শিল্পী হিসাবেও অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটা কথা বলতেন, ‘শিল্পীর সবসময় প্রস্তুত থাকা উচিত’। টোটা সবসময় তৈরি থাকে যে কোনও ধরনের চরিত্রের জন্য। নিজের ব্যক্তিগত জীবন কখনও সামনে আনা পছন্দ নয় ওর। ওর পরিবারের কাউকে শুটিং ফ্লোরে কখনও দেখিনি।
‘শ্রীময়ী’ ধারাবাহিকে টোটা-ইন্দ্রাণী জুটি। ছবি: সংগৃহীত
আমাদের একসঙ্গে প্রথম কাজ অতনু ঘোষের ‘অংশুমানের ছবি’। সেখানে কাজ করার সময়েই একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সবচেয়ে লম্বা কাজ অবশ্যই ‘শ্রীময়ী’। আমাদের জুটি ছিল হিট। আমার আর ওর একটা কমন পছন্দ ছিল, সেটা হল শারীরচর্চা। টোটা এখনও নিজেকে যে ভাবে ধরে রেখেছে, সেটা দেখে অনুপ্রাণিত হই সবসময়। আমার এক বার কোমরে ব্যথা হয়েছিল, ও তখন আমায় কিছু ব্যায়াম দেখিয়ে দিয়েছিল। সেটা করে আমি খুব উপকার পেয়েছিলাম।
সেটে দেখতাম ও হাতে চিত্রনাট্য পেলেই মুখস্থ করে নিত। চিত্রনাট্য নিয়ে থাকত সারাদিন। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ধারাবাহিকে পাতার পর পাতা তখন সংলাপ থাকত। আমি তো একবারে বলতে পারতাম না। ও ঠিক মুখস্থ করে নিত। আমি ওকে বলতাম, আমি তো ফাঁকিবাজ ছাত্রী, তুমি বাধ্য ছাত্র, ভাল করে চিত্রনাট্য পড়ো।
ধারাবাহিকে রোম্যান্টিক দৃশ্যে টোটা-ইন্দ্রাণী ছবি: সংগৃহীত
একদিন খুব মজা করেছিলাম ওঁর সঙ্গে। তখন কিছুদিনের মধ্যেই ‘শ্রীময়ী’ শেষ হওয়ার কথা। সেটে খুব মনখারাপের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এমনিতেও টোটা, মানে পর্দার রোহিত সেন খুব অসুস্থ— এ রকমই একটি দৃশ্যের শুটিং চলছিল। আমার মনে হল, সেটের সবাইকে একটু আনন্দ দিই। তখন একটা মজা করলাম। ‘পরম সুন্দরী’ গানটা এক জন টেকনিশিয়ানকে রেডি করে রাখতে বললাম। তাঁকে শিখিয়ে রেখেছিলাম টোটা এলেই যেন চালিয়ে দেয়। ব্যাস, যেই টোটা চিত্রনাট্য পড়তে বসেছে, আমি চোখের ইশারা করতেই ওরা গানটা চালিয়ে দিয়েছে। আমিও টোটাকে ধরে তুমুল নেচেছিলাম। খাটের উপর উঠে নাচতে শুরু করেছি। আর ও ঘাবড়ে গিয়েছিল। তার পর হাসি আর থামাতে পারছিল না টোটা। বলছিল, আমার নাকি পুরো মাথাখারাপ! সেটের সবাই ভিডিয়ো তুলছিল, হাততালি দিচ্ছিল, সিটি বাজাচ্ছিল। সব মিলিয়ে দারুণ হাসাহাসি হয়েছিল। ওই ভিডিয়োটা আমি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতেই ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল।
শুটিংয়ের ফাঁকে নায়িকার নাচ। ছবি: সংগৃহীত
আমার মনে হয়, টলিউড সে ভাবে ব্যবহারই করল না টোটাকে, অনেক পরে ওঁকে সেই সম্মান দেওয়া হয়েছে। বলা ভাল, বলিউডই ওকে আসল সম্মানটা দিয়েছে। ওকে আরও ব্যবহার করতে পারত ইন্ডাস্ট্রি। পরবর্তী কালে যদিও ওর অনেক সুযোগ এসেছে। এখন তো ফেলুদা করেছে, মুম্বইয়ে এত ভাল কাজ করছে, খুব ভাল লাগে।
কিছুদিন আগে ওর বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপনে একটা বড় অনুষ্ঠান হয়েছিল। আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিল। আমি অসুস্থ থাকায় সে দিন যেতে পারিনি। টোটার জন্মদিনে ওকে অনেক শুভেচ্ছা জানাই। ওর আরও অনেক কাজ দেখার অপেক্ষায় রইলাম। এমনই সুপুরুষ থাকুক, ভাল মানুষ থাকুক আর ১৯৯৩ সালে যেই টোটাকে দেখেছি ও যেন তেমনই থাকে, আর ওর বয়সটাও যেন এমন আটকেই থাকে।