Advertisement
E-Paper

কিশোর কুমারের জুতো আঁকড়ে আজও বেঁচে আছি, গুরুদেবের জুতোয় প্রণাম করে কাজে বেরোই

কিশোর কুমার ভারতবর্ষের গৌরব। টলিগঞ্জে ওঁর মূর্তি নিজের উদ্যোগে তৈরি করেছি। আমার একটাই আফসোস, তিনি কোনও সরকারি পুরস্কার পাননি। যদি মরণোত্তর ভারতরত্ন পুরস্কার তাঁকে দেওয়া যায়, সেটা চাইব। এর জন্য শেষ দিন পর্যন্ত লড়ব।

গৌতম ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৪ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০৯
কিশোর কুমারের জন্মবার্ষিকীতে গৌতম ঘোষের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

কিশোর কুমারের জন্মবার্ষিকীতে গৌতম ঘোষের শ্রদ্ধার্ঘ্য। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

আমার বাবা, মায়ের পর যদি কারও স্থান থাকে, তিনি কিশোর কুমার। তিনি আমার ভগবান, তিনিই আমার অন্নদাতা। তিনি গান না গাইলে তো আমার কোনও দিন গান গাওয়া হত না। আমাকেও কেউ চিনতেন না। আমি হয়তো সরকারি কেরানি হতাম। আজও কিশোর কুমার নিয়েই বেঁচে আছি। ৫২ বছর গান গাওয়া হয়ে গেল আমার।

‘কিশোরকণ্ঠী’ হিসাবেই আমি সঙ্গীতজগতে পরিচিত। একেবারে ছোট বয়স থেকেই কিশোর কুমারের গান খুব ভাল লাগত। গান বুঝতে শিখলাম যত, তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। ওঁর বিভিন্ন ধরনের গান শুনতাম। এই করতে করতে, ওঁর গান গাইতে গাইতেই গৌতম ঘোষ হয়ে গেলাম। সেই থেকেই শুরু সঙ্গীতজগতে তাঁর হাত ধরে আমার পথচলা।

আগে পাড়ার যে কোনও অনুষ্ঠানে সুযোগ চাইতাম কিশোর কুমারের গান গাওয়ার জন্য। এরপর ১৯৭৪ সালে পেশাদার হিসেবে গান গাওয়া শুরু করি। ওই কিশোর কুমারই আমার জীবনের সম্বল। ওঁর গান গেয়েই প্রথম রোজগার করেছিলাম ৩ টাকা বা ৪ টাকা। তখন ওই টাকার মূল্য ছিল অনেক। আমার কাঁধে সংসারের দায়িত্ব ছিল— বৃদ্ধ বাবা, মা, আর পাঁচ বোন। পুরো সংসার চালাতে পেরেছি শুধু কিশোর কুমারের জন্যই, ওঁর গান গেয়েই। অবশ্য ধীরে ধীরে পারিশ্রমিক বাড়ল। বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে, জলসায় যোগ দিয়ে রাতের পর রাত জেগে, এক এক দিন দুটো, তিনটে করে অনুষ্ঠানও করেছি। আমাদের সময় তেমন প্রচারও ছিল না। শুধু কিশোর কুমারের জনপ্রিয়তার জেরেই আমি রয়ে গিয়েছি।

কিশোর কুমার বলেছিলেন, “আমার গানটা আমার মতো করে গাওয়ার চেষ্টা কোরো না।”

কিশোর কুমার বলেছিলেন, “আমার গানটা আমার মতো করে গাওয়ার চেষ্টা কোরো না।” ছবি: সংগৃহীত

একটা দুঃখ ছিল, কিশোর কুমারের গান গাইতাম, কিন্তু ওঁকে সামনে থেকে কখনও দেখিনি। যে দিন তাঁকে প্রথম দেখলাম, সেটা আমার জীবনের ঐতিহাসিক দিন। ১৯৮৪ সালে আমি মুম্বই চলে গিয়েছিলাম। কেরিয়ার তৈরি করতে নয়, কিশোর কুমারকে দেখার জন্য। ওখানে ঘুরে ঘুরে যে কোনও জায়গায় কিশোর কুমারের রেকর্ডিং থাকলেও আমি চলে যেতাম। কী ভাবে তিনি গান গাইছেন, রেকর্ডিং করছেন, কী ভাবে হাঁটছেন, কথা বলছেন— সব হাঁ করে দেখতাম। তিনি প্রতিটা গান গাওয়ার সময় যে আলাদা এক্সপ্রেশন দিতেন, সেটা দেখে রপ্ত করার চেষ্টা করতাম।

১৯৮৫ সালে অবশেষে আলাপ হল কিশোর কুমারের সঙ্গে। মেহবুব স্টুডিয়োর রেকর্ডিস্ট ছিলেন অভিনন্দন ঠাকুর, তিনি আলাপ করিয়ে দিলেন। আমায় নিয়ে গিয়ে বললেন, “ওর নাম গৌতম ঘোষ। ও কলকাতায় থাকে, আপনার গান গায়।” চার লাইন গানও শুনিয়েছিলাম আমার গুরুদেবকে। মনে আছে গেয়েছিলাম, ‘মেরে নয়না সাওন ভাদোঁ’। শুনে ভাল-খারাপ কিছুই বলেননি। আমি তো তখন ‘স্যার’ বলে ডাকতাম, পরে অবশ্য দাদা হয়ে গিয়েছিলেন। দাদা বলেই ডাকতাম। স্টুডিয়োতে দেখা হত, কথা হত।

এক বার তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম গৌরী কুঞ্জে, চা খেতে। একা যেতে ভয় পেয়েছিলাম। তখন বাপ্পি লাহিড়ীর ম্যানেজার ছিলেন ভরতজি, তিনি আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন। কুড়ি-পঁচিশ মিনিট ছিলাম, আমার কাছে ওই সময়টা স্বপ্নের মতো। সেখানে ওঁর সঙ্গে গল্প হয়েছিল। আমায় কিছু টিপস দিয়েছিলেন, যা আমার একান্ত সম্পদ।

 আমি শুনেছিলাম, কিশোর কুমার রোজ ১০০ গ্রাম করে টক দই খেতেন।

আমি শুনেছিলাম, কিশোর কুমার রোজ ১০০ গ্রাম করে টক দই খেতেন। ছবি: সংগৃহীত

কিশোর কুমার বলেছিলেন, ‘‘আমার গানটা আমার মতো করে গাওয়ার চেষ্টা কোরো না। প্রত্যেক শিল্পীর গান শুনে, প্রত্যেক শিল্পীর গান গাওয়ার চেষ্টা করো। তা হলে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে।’’ আবার বলেছিলেন, ‘‘যে কোনও গান গাওয়ার আগে গানের কথা মুখস্থ করে বুঝে নেবে, একেবারে অন্তরে ঢুকিয়ে নিয়ো, যাতে খাতা না দেখেও গাইতে পারো, তবেই সঠিক এক্সপ্রেশন দিতে পারবে।’’ সব শিল্পীই মহান। কিন্তু কিশোর কুমারের কণ্ঠস্বর আর একটা হবে না। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো কণ্ঠ হবে না, তেমনই কিশোর কুমার হবে না। ওঁর গানে এত নাটক, ওঁর গায়কি দিয়ে উনি হিট করে দিতেন। অমিত কুমারের মধ্যে পরবর্তী কালে এটা দেখেছি। কুমার শানুর মধ্যেও খানিকটা রয়েছে।

গলা ভাল রাখার জন্য আমায় অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওঁকে দেখেছি চিৎকার করে কথা বলতে, ফিসফিস করে কথা বলেননি কখনও। কিন্তু অযাচিত গলার উপর চাপ দিতেন না। তবে অনুষ্ঠান কম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন আমায়। বলতেন ‘‘যতটুকু দরকার, ততটুকুই অনুষ্ঠান কোরো।’’ কিন্তু কম অনুষ্ঠান করলে রোজগার করতে পারতাম না। ওঁর মতো অত রেকর্ডিং ছিল না আমাদের। আমি শুনেছিলাম, তিনি রোজ ১০০ গ্রাম করে টক দই খেতেন। আর বলতেন ‘‘গলাকে নিয়ে বেশি ভাবলে মুশকিল। গলাকে গলার মতোই থাকতে দাও। কথা বলার মতো করে গান গাও।’’

ওঁর জন্য সেই ভাবে কিছু করতে পারিনি। শুধু একটাই ইচ্ছে পূরণ হয়েছে, আমি নিজের উদ্যোগে টালিগঞ্জ স্টুডিয়োপাড়ায় কিশোরকুমারের একটা মূর্তি স্থাপন করেছি। ২০০০ সালের ১৮ অগস্ট সেই মূর্তি উদ্বোধন করেছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। কারণ, জীবনের শেষ গান মিঠুনের লিপেই গেয়েছিলেন তিনি। নানা মানুষ নানা কথা বলেন, অন্য গানকে ওঁর শেষ গান বলেন। কিন্তু আমি জানি, আমি শেষ দিন রেকর্ডিংয়ে ছিলাম। ১২ অক্টোবর মেহবুব স্টুডিয়োতে কিশোর কুমার আর আশা ভোসলের ডুয়েট গান রেকর্ড হয়েছিল। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘ওয়াক্ত কি আওয়াজ়’ ছবির গান ‘গুরু গুরু’। মিঠুন আর শ্রীদেবীর ছবির জন্য গান রেকর্ড করেছিলেন। ওটাই ওঁর শেষ গান। পরের দিন বিকেলে খবর এল, আমার গুরুদেব আর নেই।

আজও অনুষ্ঠানে বেরোনোর আগে কিশোর কুমারের জুতোয় প্রণাম করে যাই।

আজও অনুষ্ঠানে বেরোনোর আগে কিশোর কুমারের জুতোয় প্রণাম করে যাই। ছবি: সংগৃহীত

একটাই আফসোস, তিনি ভারতবর্ষের গৌরব। তবে কোনও সরকারি পুরস্কার তিনি পাননি। যদি মরণোত্তর ভারতরত্ন পুরস্কার তাঁকে দেওয়া যায়, সেটা চাইব। শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করব। আমার কাছে আজ ওঁর একটাই স্মৃতি আছে, তাকে আঁকড়ে বাঁচি আজও। অমিত কুমারের কাছ থেকে কিশোর কুমারের একজোড়া জুতো নিয়ে এসেছি, সেটা আমার কাছে আছে। আজও অনুষ্ঠানে বেরোনোর আগে ওই জুতোয় প্রণাম করে বার হই। আর এক বার যদি গুরুদেবের দেখা পেতাম, ওঁর পায়ের ওপর মাথা রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতাম। তিনি নিশ্চয়ই বুকে টেনে নিতেন আমায়।

Kishor Kumar Singer Goutam Ghosh birth anniversary Singer

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy