এখন যে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, আমার কাছে সে আজও হাফ প্যান্ট পরা বুম্বা। প্রথম যখন ওকে দেখেছিলাম, তখন ও আর পল্লবী অনেক ছোট। বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় তখন মুম্বইতেই থাকতেন। নাগেরবাজারে বড় বাগানওয়ালা একটি বাংলো ছিল বুম্বার দাদুর। সেখানে ওরা থাকত। আমার তখন বছর কুড়ি বয়স হবে। প্রথম চিত্রনাট্য লিখেছি। নাম ছিল ‘মানুষের নাম ঈশ্বর’। প্রথমেই উত্তমকুমারকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তিনি যে সময়ে করবেন বলেছিলেন, তাতে প্রযোজকেরা রাজি হলেন না। এর পরই বিশুদা মানে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে গল্প শোনানোর কথা বললেন তাঁরা। সেই সময়ে গেলাম ওঁর বাড়িতে।
ওই প্রথম দেখলাম ছোট্ট বুম্বাকে। ফুটফুটে দুলদুলে মিষ্টি ভাই-বোন। ওরা খুব ভক্ত হয়ে গিয়েছিল আমার। মাকু (পল্লবী) আমার কোলে বসে পড়ত। আমি গল্প বলতাম, ওরা শুনত। বুম্বার মা আমাদের খাওয়াতেন অনেককিছু। এই ভাবেই আলাপ। এর পর অনেক পরে স্টুডিয়োতে ওর সঙ্গে দেখা। আমি তখন কিছুটা পরিচিতি পেয়েছি। ‘শত্রু’ সিনেমাটা করছি। বুম্বা তখন স্ট্রাগল করছে। ওর মা-ও স্টুডিয়োতে যেতেন। বুম্বার মায়ের সেই মিষ্টি হাসি আমার মনে ধরে আছে এখনও। ওই হাসিটাই অবিকল বুম্বা পেয়েছে।
অফ-স্ক্রিনে আমাদের বন্ডিং আলাদা: চিরঞ্জিত। ছবি: সংগৃহীত।
‘শত্রু’ ছবিতে বুম্বা একটা ছোট্ট চরিত্র করেছিল, কিছুটা খলচরিত্র ধাঁচের। ক্লাইম্যাক্স শুটিংয়ে গিয়েছিলাম। তখন বোলপুর লজে থাকতাম। আমি তখন চিরঞ্জিত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছি। সেখানে স্কুলের মেয়েরা আমার অটোগ্রাফ নিতে এসেছিল, বুম্বা আমার পাশে বসেছিল। যে পেনটা আমায় দিয়েছিল, তাতে কালি ছিল না বলে বুম্বা লাফ দিয়ে পাঁচিল টপকে কলম আনতে গিয়েছিল। পেন এনে আমার হাতে দিয়ে বলল, “নাও, ওদের জন্য অটোগ্রাফ দাও।” খুব মিষ্টি ছিল বুম্বা। আমি অটোগ্রাফ দেব বলে আমার জন্য ছুটে গিয়ে ও পেন এনে দিচ্ছে, ওই মুহূর্তটার জন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আমি। এখনও তা ভেবে আনন্দ পাই। ওই আমাদের শুরু।
এর পর ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন সময় আমরা পেরিয়েছি। চিরঞ্জিত-তাপস পাল-প্রসেনজিৎ, এই ত্রয়ীকে নিয়ে তখন কথা হত। আমার সঙ্গে কখনও ওর কোনও গোলমাল হয়নি। প্রতিযোগিতা তো থাকবেই। তবে সেটা একেবারেই অন-স্ক্রিন। অফ-স্ক্রিনে আমাদের বন্ডিং আলাদা।
লম্বা সময় ধরে সবকিছুর সাক্ষী থেকেছি, ও আমার ভাইয়ের মতো। ছবি: সংগৃহীত।
লম্বা সময় ধরে অনেক কিছু দেখেছি। ও আমার ভাইয়ের মতো। আমাদের খুব ভাল সম্পর্ক। ওর ইন্ডাস্ট্রিতে আসা থেকে, টিকে থাকা, নিজেকে গড়ে তোলা থেকে ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা, সবকিছুরই সাক্ষী থেকেছি। আজ ও পদ্মশ্রী পেয়েছে। নতুন করে কাজের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে দর্শকের সামনে প্রতিদিন আসছে, তাই ইন্ডাস্ট্রিও ওকে দু’হাত ভরে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
ও অসম্ভব পরিশ্রমী একটা মানুষ, নিজেকে নানা সময়ে বদলেছে। এখন বুম্বা মারাত্মক ডিসিপ্লিনে থাকে। আমি ওর সঙ্গে কিছুদিন আগেও কাজ করেও তা দেখলাম। ‘বিজয়নগরের হীরে’ ছবিতেও খুব ভাল অভিজ্ঞতা হল। আমরা মুম্বই গিয়েছিলাম শুটিংয়ে। ওর ফ্ল্যাটেই ছিলাম। ওর গাড়িতে করে যেতে যেতে একটা আমার লখনউয়ের উপর লেখা প্রেমের গল্প শোনালাম। ও মন দিয়ে শুনল। যদি ও প্রযোজনা করে আর অভিনয় করে, আমি পরিচালনা করার কথা ভেবেছি। একজন সাংবাদিকের চরিত্রে ওকে ভেবেছি। যদি ও করতে রাজি হয়, ফের আমরা একসঙ্গে কাজ করব।
বুম্বা রাজি হলে ওকে পরিচালনা করব: চিরঞ্জিত। ছবি: সংগৃহীত।
আমার একটা জিনিস মনে হয়, বুম্বা ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ভাল মানুষ। কিন্তু ওকে ওর মতো করে বুঝবে, এমন মনের মানুষ হয়তো পেল না। ও সবসময় বলে, “আমি বাবা হিসেবে ভাল, কিন্তু স্বামী হিসেবে নই।” ওঁর জীবনের নানা পর্যায় দেখেছি। বিয়ের সময়েরও সাক্ষী ছিলাম। দেবশ্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ও নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছিল। বেশ কিছুদিন ও কোনও কাজ করেনি, ডিপ্রেশনে ছিল। সেই সময় অনেক দিন পর কাজ করেছিল, আর সেটা আমার সঙ্গে। ছবির নাম ছিল ‘চন্দ্রগ্রহণ’। চুপচাপ থাকত, কথা বলত না। ওকে অনেক বোঝাতাম। জীবনের একটা পর্যায় ছিল ওটা। কিন্তু ওই যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরে এসেছিল, নিজের জাত চিনিয়েছিল। সাহস দিয়েছিলাম ওকে দাদার মতো, লড়ার কথা বলেছিলাম ওকে। ও তো সেই লড়াই করে শীর্ষে পৌঁছেছে। সত্যি বলতে, ব্যক্তি বুম্বার অনেক বদল এসেছে গৌতম ঘোষের পরিচালনায় ‘মনের মানুষ’ ছবিতে কাজ করার পরে।
আজ ওর জন্মদিনে খুব ভালবাসা জানাই ওকে। কেরিয়ারে ও আরও এগিয়ে যাক। আমার আশীর্বাদ থাকবে। অনেক লম্বা সময় ধরে যে সাফল্য ও ধরে রেখেছে, আগামী দিনেও তা বজায় থাকুক। আমি চাই, সকলের কাছে ইন্ডাস্ট্রির ‘সিওও’ হয়ে থাকুক বুম্বা।