নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে তোলপাড় গোটা দেশ। প্রায় এক মাস হতে চলল, দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরা। গত ২০ জুলাই আন্দোলনরত পড়ুয়ারা সংসদ ভবনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানেই ধুন্ধুমার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার মতো অভিযোগ ওঠে। গোটা ঘটনায় পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন একাধিক বলিতারকা।
আন্দোলনের পাশে কি দাঁড়াচ্ছেন বাংলার শিল্পীরা? সমাজমাধ্যমে তাঁদের নানা পোস্ট দেখে অনুরাগীরা বলছেন, নিজেদের শিল্পকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন তাঁরা। নিজেদের পুরনো গানের কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন রূপম ইসলাম, লোপামুদ্রা মিত্র। মতামত জানিয়েছেন কৌশিক সেন, রেশমি সেন, অঞ্জন দত্তের মতো শিল্পীও।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি, মুম্বই-সহ একাধিক জায়গায় ছাত্র আন্দোলনের ঝলক। সেই আবহেই বৃহস্পতিবার নিজের সমাজমাধ্যমের পাতায় ‘সংহতি জানাই’ গানের একটি অংশ ভাগ করে নেন রূপম। ২০১৮ সালের ২৬ মে এই গানটি মুক্তি পায়। সাদাকালো প্রেক্ষাপটে তৈরি এই গান শুরুই হয় বোমাবাজি, প্রতিবাদের শব্দে। সেই গানেরই একাংশে রয়েছে, ‘ছাত্রেরা বাকস্বাধীনতা চায়, ওরা হাঁটে যুক্তির রাস্তায়/ সেই সড়কে অগাধ বিশ্বাস আমার, তাই সংহতি জানাই/ তুমি লেঠেল পাঠালে প্রশাসক, তুমি বশ্যতা চাও বিরোধীর/ জেনে নাও সবাই নয় স্তাবক, ওরা আগুন নতুন পংক্তির।’
নির্দিষ্ট অংশই ফের পোস্ট করেছেন গায়ক, যদিও ক্যাপশনে কিছুই লেখেননি গায়ক। মন্তব্যবাক্স ভরেছে অনুরাগীদের প্রশংসায়। তাঁদের মতে, “শিল্পীর প্রতিবাদ এমনই হওয়া উচিত।”
২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিল লোপামুদ্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘মগজ ধোলাই’। যে গান শুনলে মনে হবে প্রতিবাদকে সমর্থনের ইঙ্গিতই দিচ্ছেন। ‘যন্তর মন্তর ঘরে হবে মগজ ধোলাই/ রাজা বলবে হেসে হেসে, বাহ রে এটাই চাই/ মস্তিষ্ক প্রক্ষালনে সবাই বোকা হবে/ ঠিক কি না, ঠিক কি না বলো, আজকের এই বাস্তবে/ গাইবে যে জন গানা, তার হবে ঠিকানা ওই গরাদের ভিতরে, হায়’— বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরনো সেই গানেরই শুরুর এই অংশটি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেন গায়িকা। সঙ্গে শুধুই লেখেন, “মগজ ধোলাই”।
মন্তব্যবাক্সে গায়িকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ অনুরাগীরা। অনেকেরই মতে, গানের কথার মাধ্যমেই নিজের প্রতিবাদ জানিয়ে এ ভাবে পড়ুয়াদের পাশে থাকার বার্তা দিলেন লোপামুদ্রা।
সমাজমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের এক বিশেষ অংশ উদ্ধৃত করে পোস্ট করেছেন সঙ্গীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। নন্দিনী ও গোঁসাইয়ের কথোপকথন। গোঁসাইয়ের উদ্দেশে নন্দিনীর প্রশ্ন, “এ রাজ্যে বাঁচিয়ে রাখার বুঝি পরিমাণ-বিচার আছে?” তাতে গোঁসাইয়ের উত্তর, “আছে বৈকি। পার্থিব জীবনটা যে সীমাবদ্ধ। তাই হিসাব বুঝে তার ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে হয়। আমাদের শ্রেণীর লোকের পরে ভগবান দুঃসহ দায়িত্ব চাপিয়েছেন, সেটা বহন করতে গেলে আমাদের ভাগে প্রাণের সারাংশ অনেকটা বেশি পরিমাণে পড়া চাই। ওদের খুব কম বাঁচলেও চলে, কেননা ওদের ভার-লাঘবের জন্যে আমরাই বাঁচি। এ কি ওদের পক্ষে কম বাঁচোয়া?”
বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রীকান্ত আচার্যের এই পোস্ট ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মত অনুরাগীদের। তাঁর পোস্টের মন্তব্যবাক্সে কেউ লিখেছেন, “কী অসাধারণ প্রাসঙ্গিক”। কেউ লিখলেন, “তাঁর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ভাষ্য, সত্য কথন আজও প্রাসঙ্গিক। তাই তিনি সমকালীন!”
বাংলা বিনোদনজগৎ থেকে অভিনেতা ঋদ্ধি সেন অনবরত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র হয়ে সরব হয়েছেন। কৌশিক সেন, রেশমি সেনও সরাসরি নিজেদের মত ব্যক্ত ধরেছেন সমাজমাধ্যমে। এক ভিডিয়োবার্তায় রেশমি-কৌশিক তুলে ধরেছেন দেশের স্কুলশিক্ষার চিত্র। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত গোটা দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি স্কুলের সংখ্যা উল্লেখ করে রেশমি-কৌশিক বলেন, “অন্তত ৩২ জন ‘নিট’ পড়ুয়া আত্মঘাতী হয়েছেন ২০২৫ সালে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে... হ্যাঁ, আচ্ছে দিন।” তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে ২০ জুলাইয়ের ঘটনাও। পুলিশের ‘প্রহার’ থেকে রক্ষা পায়নি শিশুরা, দাবি কৌশিকের। তাঁদের নিশানায় কেন্দ্রীয় সরকার। কৌশিক বলেন, “গোটা পরিস্থিতি যে ভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে মোদী-শাহের সরকার, তাকে গণতন্ত্র বলে না।” বার্তাশেষে তারকাদম্পতির একত্রে বার্তা, “প্রত্যেক প্রতিবাদীকে কুর্নিশ। জয় হিন্দ।”
আরও পড়ুন:
অঞ্জন দত্তও স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি পড়ুয়াদের পক্ষে। এক ভিডিয়োবার্তায় তিনি জানান যে, তিনি কোনওদিন রাজনীতি করেননি। সেই সঙ্গে বলেন, “আমি সংবিধান, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। নির্বাচিত সরকারের উপরেও আস্থা রয়েছে। সেই সঙ্গে পড়ুয়াদের অহিংস প্রতিবাদের ভাষাকে কুর্নিশ জানাই।” ভারতবাসী হিসাবে তিনি গর্বিত, জানান শিল্পী।
পড়ুয়াদের পাশে প্রথম থেকেই ছিলেন অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়। ২২ জুলাই তিনি ভারতীয় সংবিধানের একটি ছবি ভাগ করে নিয়ে লেখেন, “ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।” সেই সঙ্গে এক ভিডিয়োবার্তায় তিনি কলকাতায় ছাত্রযুবদের মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের সমর্থনে সরব তিনিও।
আরও পড়ুন:
গোটা পরিস্থিতিতে নিজের মত জানিয়েছেন অভিনেতা জিৎ। তিনি লেখেন, “নিট-কাণ্ড আর শুধু পরীক্ষার গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই— এটি লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের আশা, স্বপ্ন ও বিশ্বাসের বিষয়।” তাঁর কথায়, প্রত্যেক যোগ্য প্রার্থীর অধিকার আছে স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থা দাবি করার। গোটা ঘটনায় জবাব চাওয়ার অধিকার আছে তাঁদের। সেই সঙ্গে তিনিও অনুরোধ করেছেন, গোটা বিষয়ে যেন রাজনীতির রং না দেওয়া হয়।
জীতু কমলও পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি লেখেন, “নিট শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও বিশ্বাসের প্রতীক। তাই প্রতিটি যোগ্য শিক্ষার্থীর জন্য একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনও অনিয়ম হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি এবং কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।” শেষে তাঁর মন্তব্য, রাজনৈতিক দোষারোপ নয়, বরং স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
এ দিকে, বৃহস্পতিবার সকালেই ছাত্রছাত্রীদের ধারাবাহিক বিক্ষোভের মাঝে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স পোস্টে লিখেছিলেন, “প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে। তাঁদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আধিকারিকদের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।” রাতে কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা সচিব বিনীত জোশীকেও অপসারণের ঘোষণা করে কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার রাতেই নিজের অনশন ভঙ্গ করেছেন সোনম ওয়াংচুক। যদিও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখনও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে অনড়।