বলিউডে ফের আতঙ্ক। ১৮ অক্টোবর মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় লরেন্স বিশ্নোইয়ের নাম। অভিনেতার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ধৃতদের সঙ্গে লরেন্সের গ্যাংয়ের যোগ রয়েছে কি না। এর মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছে বিশ্নোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা একটি গোষ্ঠী। সেই বার্তায় সলমন খানের নামও উঠে এসেছে। হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, সলমনের ঘনিষ্ঠদেরও নিশানা করা হতে পারে।
কিন্তু কেন সলমনকে ঘিরে এত আক্রোশ?
১৯৯৮ সালে রাজস্থানে এই অক্টোবর মাসেই ‘হম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবির শুটিং চলাকালীন স্থানীয় এক জঙ্গলে কৃষ্ণসার হত্যার অভিযোগ ওঠে সলমন খানের বিরুদ্ধে। সে সময়ে অভিনেতার সঙ্গে ছবির শুটিংয়ে যুক্ত আরও কয়েক জন তারকার নামও আলোচনায় উঠে আসে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সোনালি বেন্দ্রে, তব্বু, নীলম কোঠারী ও সইফ অলী খান। অভিযোগ, রাজস্থানের কঙ্কণী গ্রামে দু’টি কৃষ্ণসার হত্যা করা হয়েছিল।
সলমনের বাড়ির সামনেও চলে গুলি।
বিশ্নোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। স্থানীয় ইতিহাস বলে, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে এই সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে এই শিকারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সলমনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয় ওই সম্প্রদায়ের মধ্যে। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াইও।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে সলমনকে হুমকি দিতে শুরু করেন লরেন্স বিশ্নোই। ২০১৮ সালে আদালতে হাজিরার সময়ে প্রকাশ্যেই সলমনকে খুনের হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।
কে এই লরেন্স বিশ্নোই?
পঞ্জাবের বাসিন্দা লরেন্সের বিরুদ্ধে খুন, তোলাবাজি-সহ একাধিক গুরুতর অপরাধ অভিযোগ রয়েছে বলে জানা যায়। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় থেকেই তাঁর নাম প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর অপরাধচক্র। তদন্তকারীদের দাবি, জেলবন্দি থেকেও সহযোগীদের মাধ্যমে অপরাধমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করেছেন তিনি।
লরেন্সের গ্যাংয়ের সঙ্গে গোল্ডি ব্রার, অনমোল বিশ্নোই-সহ একাধিক ব্যক্তির নাম বিভিন্ন মামলায় উঠে এসেছে। অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই চক্রের সদস্যেরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করে থাকেন।
২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল: সলমনের বাড়ির সামনে গুলি
সলমনকে ঘিরে বিশ্নোই গ্যাংয়ের হুমকি নতুন মাত্রা পায় ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল। ওই দিন ভোরে মুম্বইয়ের বান্দ্রায় সলমনের বাড়ি গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে মোটরবাইকে চড়ে এসে গুলি চালায় দুই দুষ্কৃতী। ঘটনার সময়ে অভিনেতা বাড়িতেই ছিলেন।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, অভিযুক্তেরা আগে থেকে এলাকা ঘুরে দেখেছিল। পরে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীরা এই হামলার সঙ্গে লরেন্স বিশ্নোই গ্যাংয়ের যোগ খতিয়ে দেখেন। ঘটনার পরে সলমনের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। অভিনেতার বাড়ির সামনে গুলি চালানোর ঘটনা শুধু বলিউড নয়, গোটা মুম্বইয়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
সলমনের বাড়ির সামনে গুলি চালানোর ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অনুজ থাপনের মৃত্যু হয় পুলিশি হেফাজতে ২০২৪ সালের মে মাসে। পুলিশের দাবি, সে আত্মহত্যা করেছিল। তবে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়।
বাবা সিদ্দিকী।
পরবর্তী সময়ে বাবা সিদ্দিকীর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসে, অনুজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই নাকি এই ঘটনা। ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর খুন হন বাবা সিদ্দিকী। সলমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে নিশানায় আসেন মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকী। মুম্বইয়ের বান্দ্রায় তাঁর ছেলে জ়ীশান সিদ্দীকীর দফতরের কাছে গুলি করে খুন করা হয় তাঁকে। উৎসবের মরসুমে এই হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্য ছড়ায়।
হত্যাকাণ্ডের পরে সমাজমাধ্যমে বিশ্নোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা একটি অ্যাকাউন্ট থেকে দায় স্বীকার করা হয়েছিল। সেখানে সলমনের সঙ্গে বাবা সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মুম্বই পুলিশের জমা দেওয়া চার্জশিটে দাবি করা হয়, সলমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই বাবা সিদ্দিকীকে নিশানা করেছিল অভিযুক্তেরা। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সলমনের নিরাপত্তা কঠোর হওয়ায় তাঁর পরিবর্তে ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পাশাপাশি মুম্বইয়ে অপরাধচক্রের প্রভাব বিস্তার এবং আতঙ্ক তৈরি করার বিষয়টিও তদন্তে উঠে আসে। এই মামলায় অনমোল বিশ্নোইয়ের নাম উঠে আসে ষড়যন্ত্রের অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে।
নিশানায় টাইগার শ্রফ।
এ বার কেন নিশানায় টাইগার শ্রফ?
রবিবার সন্ধ্যায় মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। খবর অনুযায়ী, অভিনেতা একটি ফুটবল মাঠ থেকে ফেরার সময়ে এই হামলা হয়। গুলি চললেও টাইগার গুরুতর আহত হননি। তবে তাঁর গাড়ির চালক এবং এক পথচারী গুলিতে আহত হন বলে খবর। ঘটনাস্থলে তদন্তে নামে মুম্বই পুলিশ। সংগ্রহ করা হয় সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ।
এর পরে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করে বিশ্নোই গ্যাংয়ের একটি গোষ্ঠী। ওই বার্তায় সলমনের সঙ্গে টাইগারের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ফের হুমকি দেওয়া হয়। সলমনের ঘনিষ্ঠদেরও আক্রমণ করার কথা বলা হয়।
তবে হামলাকারীদের সঙ্গে সত্যিই এই গ্যাংয়ের যোগাযোগ ছিল কি না, তা তদন্ত করছে পুলিশ। ১৯ অক্টোবর রাজস্থানের কোটা রেলস্টেশনে একটি ট্রেনে যাত্রাকালীন তিন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক খবর অনুযায়ী, ধৃতদের মধ্যে দু’জন হরিয়ানার বাসিন্দা এবং এক জন বিহারের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে এক জন নাবালক বলেও জানা যচ্ছে।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, অভিযুক্তেরা হামলার আগে টাইগারের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিল কি না, অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল এবং ঘটনার পরে তারা কী ভাবে মুম্বই ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করেছিল।