খাতায়কলমে তাঁর ৮৫তম জন্মদিন। কিন্তু তিনি এখনও যে ভাবে কর্মজগতে সক্রিয়, অনায়াসে ২৫ বছর বয়সিকেও হার মানাবেন। তিনি অমিতাভ বচ্চন। বলিউডের শাহেনশা। আপাতত ব্যস্ত ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র শুটিংয়ে। দিনকয়েক আগে হাঁটুর চোট সারিয়ে উঠেছেন। নিয়মিত ব্লগ লেখেন। ব্যক্তিগত কথাও ভাগ করে নেন সেখানে। তাঁর কর্মজীবনও যেন সিনেমার মতো। নিজের জায়গা তৈরি করা নেহাত মসৃণ ছিল না তাঁর জন্য। তাঁর সম্পর্কে রয়েছে নানা মজার ও আকর্ষণীয় তথ্যও। রইল তেমনই কিছু ঘটনার উল্লেখ।
অমিতাভ বচ্চনের একাধিক সফল ছবিতে, তাঁর চরিত্রের অন্তিম পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। যেমন ‘দীওয়ার’ বা ‘শোলে’। এমনকি ‘কুলি’ ছবিতেও তাঁর চরিত্রের মৃত্যু হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু ওই ছবির সেটে অভিনেতা দুর্ঘটনার শিকার হন। রীতিমতো প্রাণহানির আশঙ্কা হয়। তখন পরিচালক মনমোহন দেসাই সিদ্ধান্ত নেন ক্লাইম্যাক্স বদলের। চিত্রনাট্যে বদল করে তাঁর চরিত্র ইকবালকে জীবিত রাখা হয় এই ছবিতে।
অভিনয়ের পাশাপাশি অমিতাভ অগুন্তি ছবির সূত্রধার। তাঁর কণ্ঠে ছবির গল্প শুরু হয়েছে, এমন উদাহরণ নেহাত কম নয়। ১৯৬৯ সালে তিনি সিনেমায় কাজ শুরু করেন কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই। তাঁর প্রথম কাজ মৃণাল সেন পরিচালিত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘ভুবন সোম’।
তবে প্রথমেই যে সিনেমার দুনিয়ায় কাজ করা শুরু করেন তিনি, এমন নয়। তার আগে রেডিয়োতে কাজের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু দিল্লির ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। এর পরে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এখানে ব্রিটিশ সংস্থা ‘বার্ড অ্যান্ড কোং’-তে চাকরি করতেন তিনি। কলকাতার জামাই হওয়ার আগে থেকেই এই শহরের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ। তার পরে অবশ্য অভিনয়জগতে তাঁকে আটকে রাখে, কার সাধ্যি!
অভিনেতাকে একাধিক ছবিতে ক্যামিয়ো হিসাবে বা বিশেষ চরিত্রে দেখা গিয়েছে। একাধিক ছবিতে তিনি ‘অমিতাভ বচ্চন’ হিসাবেই পর্দাভাগ করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে, ‘গুড্ডি’, ‘গোলমাল’, ‘হিরো হিরালাল’-এর মতো ছবি উল্লেখ্যযোগ্য।
গান গাইতেও পিছপা হননি অমিতাভ। তাঁর ভারী গলার অনুরাগী দেশজোড়া। ‘বাগবান’ ছবির ‘ম্যায় ইয়াহাঁ তু ওয়াহাঁ’, বিদ্যা বালন অভিনীত ‘কহানী’ ছবিতে ‘একলা চলো রে’ বা ‘বোল বচ্চন’ ছবির শীর্ষসঙ্গীত— সাম্প্রতিক সময়ে এগুলি মানুষের মনে গেঁথে আছে। অমিতাভের কণ্ঠে গানের কথা বললে ‘লাওয়ারিস’ ছবির ‘মেরে অঙ্গনে মে’ আর ‘সিলসিলা’ ছবির ‘নীলা আসমান সো গয়া’র উল্লেখ করতেই হয়।
শোনা যায়, কেরিয়ারের শুরুর দিকে, অমিতাভের যখন টালমাটাল অবস্থা, তখন তাঁকে নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন মেহমুদ। তাঁকে ‘রেশমা অউর শেরা’ ছবিতে মূক চরিত্রে কাস্ট করেছিলেন সুনীল দত্ত। শোনা যায়, বান্ধবী তেজী বচ্চনের ছেলের অভিনয়-সফরের শুরুটা মসৃণ করতে অমিতাভের হয়ে সুপারিশের চিঠি লিখেছিলেন ত়ৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। সেই চিঠি তিনি পাঠান অভিনেত্রী নার্গিসকে। স্ত্রীর অনুরোধেই অমিতাভকে ছবিতে নেন সুনীল। এ-ও শোনা যায়, অমিতাভের ভারী কণ্ঠ চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাবে না ভেবে মূক রাখা হয় তাঁকে।
১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত, অমিতাভের কেরিয়ারে পর পর ১২টি অসফল ছবি রয়েছে। তার পরেই আসে ‘জ়নজীর’। তাঁর প্রথম সফল, বলা ভাল ব্লকবাস্টার ছবি।
১৯৯৪ সালে ‘ইনসানিয়ত’ মুক্তির পরে অভিনয় থেকে কিছুদিনের বিরতি নেন তিনি। ছবিটি ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, নানা কারণে তিনি মুক্তি পিছিয়ে দিতে থাকেন। নূতন ও বিনোদ মেহরার মতো সহ-শিল্পীদের মৃত্যু তার অন্যতম কারণ।
সিনেমায় তিনি এক অনন্য ধারা এনেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ছোটপর্দাতেও তিনি একাধিক তারকার পথপ্রদর্শক। যে সময়ে বড়পর্দার অভিনেতারা ছোটপর্দায় মুখ দেখাতে খানিক ইতস্তত বোধ করতেন, তখন ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র মতো অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তিনি। সাফল্যের সঙ্গে ১৮তম সিজ়ন চলছে এখন।
১৯৭৩ সালে অভিনেত্রী জয়া ভা়দুড়ির সঙ্গে অমিতাভের বিয়ে হয়। তাঁদের ‘অভিমান’ ছবিটি মুক্তি পায় বিয়ের ঠিক এক মাস পরেই। প্রায় ২০টিরও বেশি ছবিতে অমিতাভের চরিত্রের নাম ‘বিজয়’। প্রায় চার দশক ব্যাপী কর্মজীবনে ১৪টি ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। আপাতত তাঁর নতুন ছবি ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’-র দ্বিতীয় পর্বের অপেক্ষায় দর্শক।