আমাদের বাড়িতে মা দুর্গা আসেন কন্যারূপে। আমরা বলি, আমাদের মেয়ে এসেছে। মেয়ের আগমন ও বিদায়, দুই সময়েই অজান্তে চোখে জল চলে আসে। আর বিদায়বেলার আগে অর্থাৎ নবমীর পুজোটা হওয়ার পর থেকেই আমাদের মন ভার হওয়া শুরু হয়। মনে হতে থাকে, আশপাশের মণ্ডপের ঢাকের শব্দ যেন ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। আমাদের প্রাণশক্তিও যেন কমতে থাকে।
পঞ্চমীর দিন মা দুর্গা আসেন আমাদের বাড়িতে। তখন তাঁকে দেখতে লাগে ঠিক এক কিশোরীর মতো। চোখেমুখে এক অদ্ভুত লাবণ্য তাঁর। এর পরে ষষ্ঠীতে হয় তাঁর বোধন। সপ্তমীতে তিনিই হয়ে ওঠেন অসম্ভব সুন্দরী। আর অষ্টমীতে তাঁর সাজের বহর শুরু হয়। নানা বেনারসি শাড়ি ও গয়নায় মুড়ে দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু নবমীর দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর থেকে খুব কষ্ট হয়। সন্ধিপুজোর পরে তাঁকে আর কন্যারূপে ভাবা যায় না। তখন তাঁর মুখে অসম্ভব তেজ। ঠিক যেন কোনও রানি। তখন আমরা তাঁকে মা বলে ডাকতে থাকি। সন্ধিপুজোর পরে আমরা বলতে থাকি, ‘মাা গো, কোনও দোষত্রুটি হয়ে থাকলে মাফ কোরো।’ কিন্তু দশমী পুজোর পরে সব যেন বদলে যায়। মায়ের মুখ টলটল করতে থাকে। মনে হয় যেন মা-ও কাঁদছেন। বাড়ির সকলে আমরা কাঁদতে থাকি।
ছেলে আদিদেবের সঙ্গে সুদীপা চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
আমাদের সবটা মা দুর্গাকে ঘিরে। আমাদের ক্যালেন্ডারও এই সময়টাকে ঘিরেই চলে। আমাদের ইলিশ মাছ খাওয়াও দুর্গাপুজোর দিনক্ষণ মেপে। দশমীর দুপুরে মায়ের সঙ্গে বসে আমরা বছরের শেষ ইলিশ মাছটা খাই। এর পরে আবার সরস্বতী পুজোর সময়ে খাই। আসলে আমরা বিশ্বাস করি, মা দুর্গা জলে পড়ে গেলে আর ইলিশ খাওয়া যায় না। জলে পড়ে মা যেন মাছেদেরও আশ্রয় দেন। আর যুক্তি দিয়ে দেখতে গেলে, ওই সময় সাধারণত খোকা ইলিশই মেলে। তাই দশমীর পরে আর ইলিশ খাই না আমরা। আবার বসন্তকালে মা যখন সরস্বতী রূপে আসেন, তখন আবার ইলিশ মাছ আমাদের পাতে পড়ে।
আরও পড়ুন:
পুজোর সময়ে মাকে আমরা দু'দিন ইলিশ মাছ ভোগে দিই। নবমীতে আমাদের আমিষ ভোগ হয়। ওই দিন মা-কে আমরা পদ্মার ইলিশ খাওয়াই। আর দশমীতে গঙ্গার ইলিশ দিই। দশমীর দিন ইলিশ মাছ ভাজা, ইলিশের তেল, কচুর শাক, পান্তা ভাত আর শাপলার টক দিই। শিব যদি জিজ্ঞাসা করেন, “তোমার মা তোমাকে কী খাইয়েছেন”, তখন মা কী ভাবে বলবেন, তিনি এত মাছ-মাংস খেয়েছেন। তখন দেবী শিবকে বলেন, “কিছুই খাইনি তেমন। একটু পান্তা ভাত আর মাছ ভাজা।” মাকে যাতে মিথ্যা বলতে না হয়, তাই নিয়ম করে তাঁকে আমরা পান্তা ভাত দিই।
সুদীপা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা। ছবি: সংগৃহীত।
মিষ্টিতেও আমাদের বাড়িতে নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। আমাদের ছানার মিষ্টি হয় না। ক্ষীরের মিষ্টি বা পায়েসই আমাদের হয়। শুনেছি, ছানা যে হেতু পচন ধরলে তবেই তৈরি হয়, তাই ছানা আমরা ব্যবহার করি না ভোগের মিষ্টিতে। একটা সময়ে হিং-ও দেওয়া হত না। বিদেশি দ্রব্য ত্যাগ করার জন্য হিং-এর ব্যবহার হত না। কিন্তু এখন তো মা বিদেশেও পূজিত হন। তাই আবার হিং-এর ব্যবহার হচ্ছে রান্নায়। ঠিক করেছি মায়ের জন্য হিং দিয়ে, পেঁয়াজ রসুন ছাড়া ট্যাংরা মাছের ঝাল করব।
আমাদের ভোগ রান্নায় পরিবারের ছেলেদেরও অবদান রয়েছে। ওরা পায়েস রান্না করে। আগে কাকিমারা নারকেল ছাপ সন্দেশ বানাত। কিন্তু এখন দোকান থেকেই করানো হয়। চন্দ্রপুলি ছাড়া পুজো সম্পূর্ণ হয় না। ভাসান থেকে এসে সকলে আমরা পাঁঠার মাংসের কিমার ঘুগনি ও চন্দ্রপুলি খাই। তবেই হয় মধুরেন সমাপয়েৎ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- লক্ষ্মীপুজো যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই হয় তা নয়, দেশের নানা প্রান্তে হয়, তবে পুজোর আচার ভিন্ন। মহারাষ্ট্রে তা লক্ষ্মী পূজন, গুজরাতে আবার চোপড়া পূজন। ওড়িশায় তা-ই গজলক্ষ্মীর আরাধনা। কোন রাজ্যে কেমন ভাবে লক্ষ্মী পুজো হয়?
- উত্তমকুমার নিষ্ঠাভরে বাড়ির লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই এই পুজোর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘উত্তমকুমারের বাড়ির পুজো’। এখনও এই পুজো এ ভাবেই পরিচিত। পুজোর ঐতিহ্য এবং রীতি নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডা দিলেন উত্তম কুমারের ভাইঝি ও নাতনি।
- সময় করে বসে পুজোর জন্য আলপনা দেওয়া এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই, মফস্সলেও। ইদানীং সমাজমাধ্যমের রিলে হাতপাখা থেকে শুরু করে পুরনো শাড়ি, চায়ের টেবিল থেকে ডায়েরির মলাট কিংবা বসার ঘরের মেঝে, সর্বত্র আলপনা দিচ্ছেন হুজুগে মানুষজন।
-
শতবর্ষপ্রাচীন প্রতিমার পুজোর ভোগে ১০ রকমের খাবার! দেবাদৃতার ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো ঠিক কেমন হল
-
ঘরোয়া ভাবে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এ বার লক্ষ্মীপুজো শ্রীলেখার! দেবীর কাছে কোন বিশেষ প্রার্থনা করবেন তিনি?
-
‘মায়ের পছন্দ না হলে আমার হাত দিয়ে অন্য কিছু করান,’ অপরাজিতার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় এ বার কী কী আয়োজন?
-
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুজোয়? তেল-মশলা ছাড়াই বানানো হয় ভোগপ্রসাদ, রন্ধনের নিয়মও আলাদা
-
লক্ষ্মীলাভে কেন পিছিয়ে বাংলা ছবি, কোন পথে আসবে সমৃদ্ধি? কী বলছেন প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতারা