Advertisement
E-Paper

‘৪০ বছরের সংসার আমার, নিশ্চয়ই কিছু খামতি ছিল, তবে যিনি সংসার ভাঙছেন ঈশ্বর তাঁকে দেখে নেবেন’

আধ্যাত্মিকতা থেকে কাজের ইচ্ছা, ছেলেবেলার প্রেম থেকে গোবিন্দের সঙ্গে মনোমালিন্য— সব নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডায় সুনীতা, তাঁর কলকাতার ফ্ল্যাটে।

অনসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৭
গোবিন্দ আমার ছোটবেলার প্রেম: সুনীতা।

গোবিন্দ আমার ছোটবেলার প্রেম: সুনীতা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে গোবিন্দের নাম, তার নীচেই সুনীতার। বেডরুমে খাটের পাশেই রাখা দু’জনের ছবি। কলকাতায় গোবিন্দ-সুনীতার ঠিকানা। বাইপাস লাগোয়া স্ট্যান্ডঅ্যালোন অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটে দেড় বছর বাদে পা রাখলেন সুনীতা আহুজা। বাড়ির আনাচে কানাচে যুগলের নানা স্মৃতিচিহ্ন। দেওয়ালে টাঙানো দুই ছেলেমেয়ের ছবি। সিংহাসনে রাখা দুর্গামূর্তি। আসবাব থেকে ঘর সাজানোর সরঞ্জাম— সবেতেই বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। আধ্যাত্মিকতা থেকে কাজের ইচ্ছা, ছেলেবেলার প্রেম থেকে গোবিন্দের সঙ্গে মনোমালিন্য— সব নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে আড্ডায় সুনীতা।

কলকাতার বাড়ির নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে গোবিন্দের নাম।

কলকাতার বাড়ির নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে গোবিন্দের নাম। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

ফ্ল্যাটের দরজা খুললেন সুনীতা নিজেই। দেখা হতেই একগাল হাসি। ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞাসা করতেই তাঁর সপাট জবাব, ‘‘খুব ভাল!’’ বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন গোবিন্দ-ঘরণী। কলকাতায় তাঁর এই আস্তানার কথা এ শহরে অনেকেরই অজানা। সে প্রসঙ্গ উঠতেই সুনীতা জানালেন, ‘‘এই বাড়ি আমি আমার মায়ের জন্য কিনেছিলাম। আমার মায়ের যেহেতু বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়, আমার দিদি-দাদারা এখানেই জন্মেছেন। আগে ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে আমাদের বাড়ি ছিল। বাবা ছিলেন চলচ্চিত্রের পরিবেশক। মাসির ক্যানসার ধরা পড়ে। সেই থেকেই মা আর মাসি একসঙ্গে এই বাড়িতে থাকতেন।’’

কলকাতার ফ্ল্যাটে দেড় বছর পর এলেন সুনীতা।

কলকাতার ফ্ল্যাটে দেড় বছর পর এলেন সুনীতা। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

কলকাতা শহরটাকে বরাবর খুবই ভাল লাগে সুনীতার। তিনি বলে চলেন, ‘‘মুম্বইয়ে যখনই ক্লান্ত হয়ে যাই, এখানে এসে আরাম করি। এখানকার মানুষ খুব মিষ্টি। কলকাতা তো মা কালীর শহর, আর আমি নিজে খুব মা কালীর ভক্ত। আজ মাসি নেই, কিন্তু আমি এই ফ্ল্যাট রেখে দিয়েছি। আগে কোনও সংবাদমাধ্যমের কেউ এই বাড়িতে আসেননি, এই প্রথম কেউ এলেন। আমার এই বাড়ি খুব ছোট। কিন্তু খুব শান্তির জায়গা।’’

ফ্ল্যাটে ঢুকেই রয়েছে গৃহদেবতার ছোট্ট সিংহাসন। সুনীতা আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। সাইবাবার মূর্তির পাশাপাশি রাখা একটি দুর্গামূর্তিও। তাঁর মত, ‘‘আমার সব বাড়িতে সাইবাবা থাকেন। আমার মন্দিরেও মা দুর্গা আছেন। আমি খুব আধ্যাত্মিক। দেখুন, সোনা, হিরে, মোতির থেকে ঈশ্বর বেশি আছেন। আসলে দেবেন তো ঈশ্বরই! একটা বয়সের পর আধ্যাত্মিকতা খুব জরুরি।’’ এক বার মাথায় হাত ঠেকিয়ে নেন সুনীতা। এর পর অনর্গল বলে চলেন, ‘‘মানুষ সব মিথ্যা বলে, শেষে তো ভগবানের কাছেই যেতে হবে আমাদের সবাইকে। পঞ্চাশ বছর বয়সে মনে হল, এ বার আধ্যাত্মিকতায় মন দিই। আমি সকাল চারটেয় ঘুম থেকে উঠি, যে সময়টাকে ব্রহ্মমুহূর্ত বলা হয়। ওই সূর্যোদয়ের আগে ওঠা খুব জরুরি, ভগবানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। চারটেয় উঠে আমার মন্দিরে ধ্যান করি। কিন্তু ঈশ্বর সবটাই জানেন, কে ঠিক কে ভুল— সব তিনিই জানেন।’’

 ঈশ্বর সবটাই জানেন, কে ঠিক কে ভুল, তাঁর হাতেই সব ছেড়ে দিয়েছি: সুনীতা।

ঈশ্বর সবটাই জানেন, কে ঠিক কে ভুল, তাঁর হাতেই সব ছেড়ে দিয়েছি: সুনীতা। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

কলকাতায় ঝটিকা সফরে এসেছেন সুনীতা। দেড় বছর পর এই ফ্ল্যাটে এলেন। সন্ধেবেলায় এ দিন তাঁর পছন্দের খাবার ছিল ফুচকা। সেটা খেয়েই বাড়িতে এসে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে বসলেন। বাড়ির খেয়াল রাখেন যিনি তাঁকে একটু পরে চা খাবেন বলে রাখলেন। গাঢ় দুধ চা খাবেন বলেই আড্ডায় বসলেন তিনি। সুনীতা বললেন, ‘‘আমার খুব ভাল লাগল কলকাতায় এসে। আমি কলকাতাতেও কাজ করতে চাই। আমি ‘লক আপ’ করেছি, মুম্বইয়ে অন্য কাজও করেছি, কলকাতাতেও করতে চাই। শুধু কলকাতাতেই নয়, হায়দরাবাদ, তামিল, তেলুগুতেও কাজ করতে চাই। কাজে মন থাকলে অন্য কোনও ভাবনা মাথায় আসে না, আমি ভালবেসে কাজ করতে চাই।’’

এত বছর পর সুনীতার কাজের ইচ্ছে হল কেন? কখনও কি গ্ল্যামার জগতের আকর্ষণ অনুভব করেছেন? সুনীতা জানান, ‘‘গোবিন্দের আগে আমার কাছে ছবির প্রস্তাব ছিল। গোবিন্দের সঙ্গেই অবশ্য। ‘তন বদন’ ছবিটির প্রস্তাব এসেছিল আমার কাছে। আমি করিনি তখন। এখন তো ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। আমার পনেরো বছর বয়সে আংটিবদল হয়েছিল বলে ক্লাস টেনে পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। আঠারোতে বিয়ে হয়েছে। ওই সময় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর কাজ করিনি। কারণ মা বলেছিলেন, গোবিন্দ খুব ভাল ছেলে, মন দিয়ে সংসার করো। আর আমিও ছোট থেকে মাকে দেখেই বড় হয়েছি। ওই ভালবাসা অন্ধ হয় না। তখন সংসার করছিলাম। তাই করিনি। তবে তাতে কী? বয়স তো সংখ্যা মাত্র!’’

আমি এত বছর পর গোবিন্দের স্ত্রী থেকে সুনীতা হতে পেরেছি।

আমি এত বছর পর গোবিন্দের স্ত্রী থেকে সুনীতা হতে পেরেছি। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

সব নারীদের উদ্দেশে সুনীতার বার্তা, ‘‘পজ়িটিভ থাকতে হবে জীবনে। সব নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নিজেকে ভালবাসুন আর ভগবানের উপর বিশ্বাস রাখুন। পুরুষের উপর একেবারে পুরো নির্ভরশীল হবেন না। আমি কাঁদিও ভগবানের কাছে, একা। আমি এত বছর পর গোবিন্দের স্ত্রী থেকে সুনীতা হয়েছি।’’

পছন্দের চা আসতেই তাঁর রাঁধুনীকে প্রশ্ন, ‘‘রান্না হচ্ছে তো’’? তিনি উত্তর দেওয়ার আগে নিজেই বলে উঠলেন, ‘‘ও হ্যাঁ! মাছ হচ্ছে তো।’’ নিজে থেকেই সুনীতা বলেন, ‘‘আমার বাঙালি খাবার খুব পছন্দের। আজ তাই সব বাঙালি রান্না খাব। সর্ষে মাছ, ভাপা ইলিশ, পুঁইশাক ঝিঙের তরকারি রান্না হচ্ছে। এ ছাড়াও সন্দেশ, রসগোল্লা, মিষ্টি দই সব এনেছি। আমি রান্নাও করতাম একসময়, গোবিন্দের জন্যও রান্না করেছি। এখন তো আর হয় না।’’

 আমার কাছে ভাল থাকার মন্ত্র হল নিজেকে ভালবাসা: সুনীতা।

আমার কাছে ভাল থাকার মন্ত্র হল নিজেকে ভালবাসা: সুনীতা। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

তিনি গান শুনতে ভালবাসেন, নিজের আলমারি থেকে বার করে তাঁর সঞ্চয়ের সিডি দেখালেন। বললেন, ‘‘আমি ভজন শুনতে ভালবাসি। লতাজি, আশাজির গান শুনি আর জপ করি। আমার কাছে ভাল থাকার মন্ত্র হল নিজেকে ভালবাসা। নিজের জন্য ভাবো, নিজের জন্য বাঁচো আর আনন্দ করো, ভালবেসে থাকো। আমি মানুষের ভালবাসা পেয়েছি। অনেকেই আমাকে ট্রোল করেন। যাঁরা ট্রোল করেন তাঁরা অবশ্য মিথ্যা কথা বলেন। আমার বয়স এখন ৫৬। আমার মতো বয়সের মানুষ অনেকেই ভাবেন, কাজ করে আর কী হবে। কিন্তু আমি কাজ করতে চাই।’’

গোবিন্দ এবং তাঁর বান্ধবী কোমল রানিকে নিয়ে দিকে দিকে নানা আলোচনা, অস্বস্তিতে সুনীতা? গোবিন্দের বিষয় প্রশ্ন করতেই তাঁর তাৎক্ষণিক জবাব, ‘‘আমার গোবিন্দকে নিয়ে কিছু বলার নেই। ওঁর জীবন নিয়েও কিছু বলার নেই। শুধু সুনীতার বিষয়ে কথা বলব। হ্যাঁ আমিও মানুষ, আমার খারাপ লাগলে ভগবানের কাছে গিয়ে বসি। আর আমি কর্মে বিশ্বাসী। ভাল মানুষকে যে দুঃখ দিচ্ছেন, যিনি আমাকে কাঁদাচ্ছেন, যিনি আমার সংসার ভাঙছেন, ভগবান তাঁকে দেখে নেবেন। তাঁর উপর সব ছেড়ে দিয়েছি।’’

যিনি আমার সংসার ভাঙছেন, ভগবান তাঁকে দেখে নেবেন: সুনীতা

যিনি আমার সংসার ভাঙছেন, ভগবান তাঁকে দেখে নেবেন: সুনীতা ছবি: সংগৃহীত।

যখন গোবিন্দের সঙ্গে আংটিবদল হয়, তখন সুনীতার বয়স ১৫। চল্লিশ বছর তাঁরা সঙ্গে আছেন। স্মৃতিকাতর গলায় তিনি বললেন, ‘‘১৮ বছরে বিয়ে হয়েছে আমার, ১৯-এ মেয়ে হয়। জীবনের সব লড়াই আমরা একসঙ্গে লড়েছি। এটা গোবিন্দেরও ভাবা উচিত। সব কিছু নারীই কেন ভাববে? তাঁরাই কেন মন খারাপ করে থাকবে সবসময়? নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুনীতা বলে চলেন, ‘‘এক হাতে তো তালি বাজে না, এটা তাঁর সমস্যা। যেখানে তাঁর খুশি তিনি থাকুন। আমি চাই তিনি ভাল থাকুন। নিশ্চয় চল্লিশ বছরে আমার কাছে তিনি কিছু পাননি, যা এখন তিনি পাচ্ছেন। ভগবান ওঁদের আশীর্বাদ দিক। গোবিন্দ আমার তো ছোটবেলার প্রেম, আমি তো তাও শক্ত হয়ে আছি, কাজ করে যাচ্ছি। যাঁর সেখানে সুখ, খুশি সেখানেই থাকুন, সকলের মুখের হাসি অটুট থাক।’’

তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের সঙ্গে সদ্য একটি ছবিতে কাজ করেছেন। সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখ ছলছল মা সুনীতার। তিনি বলেন, ‘‘আমি বাচ্চাদের কখনও বলি না, বাবাকে ছেড়ে দাও। কোনও মানেই হয় না। ওদের বাবা গোবিন্দ। আমি শুধু বলি, আমার মতো শক্ত হও। আমার ছেলে সিনেমায় আসছে, ও খুব পরিশ্রম করেছে। আমি চাই ওর ছবি সুপারহিট হয়ে যাক। আমি চাই ওর উন্নতি হোক।’’

কত সুন্দর অভিনয় করছি, জীবনে এত চিন্তা, আমি তাও হাসছি: সুনীতা।

কত সুন্দর অভিনয় করছি, জীবনে এত চিন্তা, আমি তাও হাসছি: সুনীতা। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

সম্প্রতি সুনীতাকে কোর্টের বাইরে দেখা গেলে, খবর রটে যে গোবিন্দকে নাকি বিচ্ছেদের জন্য আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সুনীতা। খবরের সত্যতা জানতে চাইলে তিনি খানিক বিরক্ত হয়েই বলেন, ‘‘কোর্টে যাওয়া মানেই বিচ্ছেদ চাইতে যাওয়া নয়। সম্পত্তি বাচ্চাদের নামে করার জন্যও যেতে পারি। আসলে ম্যানেজারেরা তো মাসে লক্ষ টাকা বেতন পান, তিনি তো অভিনেতার পক্ষেই কথা বলবেন।’’

এত সমস্যার মধ্যেও এত পজ়িটিভ থাকা, কী ভাবে ম্যানেজ করেন সবটা? সোফায় হেলান দিয়ে সুনীতা ফের হাসতে হাসতে বলে ওঠেন, ‘‘কত সুন্দর অভিনয় করছি দেখুন। জীবনে এত চিন্তা, আমি এত হাসছি। একটাই তো জীবন দিয়েছেন ভগবান, সকলকে বলি খুব আনন্দ করুন। নিজের কথা ভাবুন। ভালবাসা, সম্পর্ক সব মিথ্যা হতে পারে। আর জীবনে টাকা সবচেয়ে বড়, আর নিজের নাম। এখন শুধু সুনীতা সুনীতা।’’

কলকাতার বাড়িতে রাখা গোবিন্দ-সুনীতার ছবি।

কলকাতার বাড়িতে রাখা গোবিন্দ-সুনীতার ছবি। ছবি: নিজস্ব চিত্র।

সুনীতার শখ গান শোনা। আর অভিনয়ের আদর্শ মীনাকুমারী। সাক্ষাৎকারের শেষে গোবিন্দকে একটি গান ‘ডেডিকেট’ করতে বললে তিনি বলেন, ‘‘গোবিন্দকে কিছুই ডেডিকেট করার নেই। নিজেকে করতে পারি। তবে সেই গানেও যেন সূক্ষ্ম কটাক্ষও ছিল। তিনি বলেন, ‘‘মীনাকুমারী আমার খুব পছন্দের শিল্পী। তাঁর ‘পাকীজ়া’ র গান নিজেকে ডেডিকেট করব। বলেই গেয়ে ওঠেন ‘চলতে চলতে য়ূঁ হী কোঈ মিল গয়া থা।’’

Sunita Ahuja Govinda Celeb Couple Relationship

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy