Advertisement
E-Paper

কণ্ঠস্বরে অভিমান, ‘হংসরাজ’ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির উদাসীনতা প্রসঙ্গে কথা বললেন অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

পঞ্চাশে পা দিল ‘হংসরাজ’। ১৯৭৬ সালের ২০ অগস্ট মুক্তি পেয়েছিল অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় অভিনীত এই ছবি। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলেন অরিন্দম। ‘হংসরাজ’ এর প্রতিদান ফিরিয়ে দিতে ধরলেন কলম।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০০
পঞ্চাশে পা দিল ‘হংসরাজ’।

পঞ্চাশে পা দিল ‘হংসরাজ’। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

‘হংসরাজ’ ছবির পঞ্চাশ বছর। ১৯৭৬ সালের ২০ অগস্ট মুক্তি পেয়েছিল এই ছবি। তথ্য অনুযায়ী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম মিউজ়িক্যাল হিট ছবি হিসেবে ধরা হয় এই ছবিকে। এক বাউল বালককে নিয়েই ছবির গল্প এগিয়েছে। বাউল হংসরাজ বীরভূম থেকে তার মাকে লুকিয়ে কলকাতায় আসে। সেখানেই একজন অসৎ ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে সে। এর পর সব বাধা পেরিয়ে হংসরাজের গান পৌঁছোয় বৃহৎ শ্রোতামণ্ডলীর কাছে।

বাউল বালককে নিয়েই ‘হংসরাজ’ ছবির গল্প এগিয়েছে।

বাউল বালককে নিয়েই ‘হংসরাজ’ ছবির গল্প এগিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

৫০ বছর পেরিয়ে আজও এই ছবি সিনেপ্রেমী দর্শকের পছন্দের তালিকায় থাকে। পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাছে এই ছবির অর্থ বদলে বদলে যেতে থাকে। ছবিতে হংসরাজের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও তাঁর কাছে উজ্জ্বল সব স্মৃতি। আনন্দবাজার ডট কমকে অভিনেতা বলেন, ‘‘একের পর এক প্রজন্ম এসেছে, কিন্তু এই ছবির প্রতি ভালবাসা কমেনি। কিছুদিন আগেই আমার পরিচিত একজন বললেন, একটি শিশু তাঁর স্কুলের যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতায় হংসরাজ সেজেছিল এবং ‘দিদিমণি গানের রানি’ গানটি গেয়েছিল। বিশ্বাস করুন শুনে মনটা ভরে গিয়েছে। এখনও টিভিতে ছবিটি দেখানো হলে একই উৎসাহ নিয়ে মানুষ দেখেন এবং আমি প্রতিক্রিয়া পাই। অনেক পরিবারেই শিশুকে খাওয়ানোর সময় ‘টিয়া টিয়া টিয়া’ গানটি শোনাতে শোনাতে খাবার খাওয়ান মায়েরা।’’

 পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে উজ্জ্বল সব স্মৃতি।

পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে উজ্জ্বল সব স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

ছবির শুটিং থেকে জনপ্রিয়তার কথা মনে করে অভিনেতা বলেন, ‘‘হংসরাজ ছবি তো স্মৃতিতে ভরপুর। মুক্তির পর বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল আমায়। মজারই ঘটনা যদিও। ‘হংসরাজ’ ছবিতে টিয়াকে নিয়ে নূপুর গান গাইছে, সেই বিখ্যাত গান ‘টিয়া টিয়া টিয়া’। ছবিতে কল্পনায় ভর করে দেখানো হয়েছিল টিয়ার সঙ্গে হংসরাজের বিয়ে হচ্ছে। হংসরাজের বিপুল জনপ্রিয়তার পর একটু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল আমায়। কারণ, এই টিয়া বাস্তবে আমার নিজের বোন স্বর্ণালী গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁকে নিয়ে কোথাও বেরিয়েছি, শুনতে হল, ‘এইটুকু ছেলে যেই সিনেমা হিট করেছে, নাম করল কি না, নায়িকাকে নিয়ে ঘুরছে।’’’

হংসরাজের সেই বান্ধবী টিয়া বাস্তবে আমার বোন: অরিন্দম।

হংসরাজের সেই বান্ধবী টিয়া বাস্তবে আমার বোন: অরিন্দম। ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে শুটিংয়ের ধরন, অভিনয়, সবই প্রায় আলাদা ছিল। যুগ বদলানোর পাশাপাশি অনেক পরিবর্তন এসেছে। অভিনেতা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় এখনও অভিনয় করছেন। তাঁর চোখে কী কী পরিবর্তন ধরা পড়ল? এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘পরিবর্তন তো নিশ্চয়ই হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে। আগে যে ভাবে বিজ্ঞান মেনে কাজ হত, সেই কাজের ধারা এখন আর নেই। সিনেমা এমন একটা মাধ্যম, যাকে যত্ন করে, আদর করে তৈরি করতে হয়। এখন মাত্র ১২-১৫ দিনে একটি ছবির শুটিং শেষ হয়ে যায়। সব বিভাগের জন্য আলাদা সময় দেওয়া হয়, কিন্তু অভিনেতাদের সময় দেওয়া হয় না। তাঁদের চটজলদি সব করে দিতে হবে। ধরে ধরে যে কাজ হত আগে, সেটা এখন নেই। আসলে কিন্তু ক্যামেরার সামনে অভিনেতাদেরই পারফম্যন্স থাকে। এই যে অভিনেতাদের থেকে কাজ বের করে আনার ক্ষমতা, সেটা এখনকার পরিচালকদের মধ্যে পাই না।’’

এখনকার ছবি তৈরি নিয়েও খানিক ক্ষোভই ধরা পড়ল পরিচালকের গলায়। তিনি আরও বলেন, ‘‘এখন সবাই ফুটেজ তুলতেই ব্যস্ত থাকেন। এতে ছবির মান পড়ছে। একটা শট বিভিন্ন দিক দিয়ে তুলে সম্পাদকের টেবিলে দিয়ে দেওয়া হয়। আগে পরিচালকদের মাথার মধ্যেই সম্পাদনার কাজটা হয়ে যেত। এই ছবির পরিচালক অজিত গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল। তাই তারকাবিহীন এই ছবি তিনি তৈরি করেছেন এবং আমাদের মধ্যে থেকে সম্পূর্ণটা বার করে এনেছিলেন। সত্যজিৎ রায় যে ভাবে এঁকে এঁকে শট ভাগ করতেন, সেটাই আসল চলচ্চিত্র তৈরির বিজ্ঞান, এখন এই ধারা কোথায়?’’

‘হংসরাজ’ ছবির একটি দৃশ্যে মাস্টার অরিন্দম।

‘হংসরাজ’ ছবির একটি দৃশ্যে মাস্টার অরিন্দম। ছবি: সংগৃহীত

এই ছবির বেশির ভাগ গান গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। এখনও কোনও অনুষ্ঠানে গেলে ‘হংসরাজ’ ছবির গান না গেয়ে মঞ্চ থেকে নামতে পারেন না গায়ক-অভিনেতা। আর তা সেই সময় এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, এর বিশাল জনপ্রিয়তায় অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের বহু কাজই চাপা পড়ে গিয়েছে। ‘হংসরাজ’ তাঁর ১৬তম ছবি। এর আগের ১৫টি ছবি সেই ভাবে কেউ মনে রাখেননি। অভিমান ভরা গলায় অরিন্দম বলেন, ‘‘আমার কাছে এই ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খানিক অভিমান থেকেই আমি কলম ধরলাম। আজও ‘হংসরাজ’ ছবিটি দর্শকের মনের মণিকোঠায় রয়ে গিয়েছে। তাই ইন্ডাস্ট্রি থেকে যে উদ্‌যাপন হওয়া উচিত ছিল, তা কেউ ভাবেওনি, কোনও তাগিদও অনুভব করেননি। তাই আমি হংসরাজ হিসেবে এগিয়ে এলাম, কলম ধরলাম। ‘হংসরাজ’ আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে যা দিয়েছে, তার প্রতিদান পাওয়া উচিত ছিল বলেই আমার মনে হয়েছিল, তাই এই প্রয়াস। সব স্মৃতি বইয়ে ধরে রাখলাম।’’

বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিশিষ্টেরা।

বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিশিষ্টেরা। ছবি: সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ‘হংসরাজ’ ছবিতে অভিনয় করার স্মৃতি এবং শুটিংয়ের অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে একটি বই লিখেছেন অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। সম্প্রতি এই বই প্রকাশিত হল। বইয়ের নাম ‘হংসরাজ: সাদা কালো স্মৃতি’। বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী অলকা গঙ্গোপাধ্যায়, অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, অভিনেত্রী খেয়ালি দস্তিদার, সঙ্গীতশিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত সহ বহু বিশিষ্টজন। সশরীরে হাজির না থাকতে পারলেও ভার্চুয়ালি মুম্বই থেকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়ও। স্মৃতির সরণী বেয়ে সেই জনপ্রিয় গানও তিনি শোনান এদিন।

‘হংসরাজ’ নিয়ে যে নস্টালজিয়া বাঙালির, তাতে মুগ্ধ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে হংসরাজ চরিত্রের সব গান এখনও জনপ্রিয়। সিনেপ্রেমীরা টেলিভিশনে পর্দায় হোক বা সমাজমাধ্যমে, ফিরে ফিরে এই ছবি দেখেন। অরিন্দম নিজের মনের ইচ্ছার কথা উজাড় করে বলেন, ‘‘আমার ছেলে আদিত্য সেনগুপ্ত একটি দারুণ ভাবনা নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। সে ভেবেছিল ‘হংসরাজ ২’-তে যদি দেখানো যায় যে, হংসরাজ টিয়াকে ছেড়ে বাউল গানের প্রচার করতে বিদেশে পাড়ি দেয়। যখন যায়, তখন টিয়া সন্তানসম্ভবা। ফের যখন দেশে ফেরে হংসরাজ, তখন ছেলে তাকে চিনতে পারে না। এই বছর তো পঞ্চাশ বছর, এই ভাবনা নিয়ে যদি এগোনো যায়, মন্দ হবে না।’’

ছবিটি বড়পর্দায় মুক্তির আর্জি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের।

ছবিটি বড়পর্দায় মুক্তির আর্জি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের। ছবি: সংগৃহীত

‘হংসরাজ’ যদি আজ তৈরি হত, এতটা জনপ্রিয়তা পেত কি? অভিনেতার মতে, ‘‘সেটা সঠিক ভাবে বলা কঠিন। এখন দর্শকের ভাললাগা বোঝার কোনও মাপকাঠি জানা নেই। তবে হ্যাঁ, এই ছবির পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে যদি আবার এই ছবি আজকের দিনে মুক্তি পায়, আমি হলফ করে বলতে পারি, মানুষ দেখবেন। এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেই আমার মনে হয়। এ-ও মনে হয়, এই ছবি এতদিনের পুরোনো, আজ প্রযুক্তি এত উন্নত হয়েছে। বহু ছবির রেস্টোরেশন হচ্ছে। এই ছবিরও যেন রেস্টোরেশন হয়। এই অনুরোধ আমি ইন্ডাস্ট্রির কাছে রাখব। আর চাইব, আর এক বার এই ছবিটি কিছুদিনের জন্য হলেও বড়পর্দায় মুক্তি পাক, যাতে এই প্রজন্মও এই সৃষ্টির সাক্ষী থাকতে পারে।’’

Arindam Ganguly Bengali Movie Musical Arati Mukherjee

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy