ছোটবেলায় পর্দাতেই প্রথম আলাপ কাজলের সঙ্গে। ওঁর শুরুর দিকের ছবি ‘গুপ্ত’ প্রথম দেখেছিলাম। আমার যেটা ভাল লেগেছিল ওঁর মধ্যে সেটা হল, তিনি যখন কাজ করতে এসেছিলেন, তখন নায়িকা বলতে যে ধরনের চেহারা বোঝানো হত, সে সবের তোয়াক্কা করেননি কখনও। নিজের অভিনয় দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। পরবর্তী কালে যখন প্রথম জানতে পারলাম ‘হেলিকপ্টার ইলা’ ছবিটি করার কথা, তখন স্বাভাবিক ভাবেই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। ওই মাপের এক জন অভিনেত্রীর সঙ্গে পর্দা ভাগ করার ইচ্ছা তো যে কোনও অভিনেতারই থাকে! আমাকে প্রথমে ছবির পরিচালক প্রদীপ সরকার এসে জানান যে, মার্ভেল থিমের উপর একটা ছবি করছেন এবং তাতে আমাকে ছেলের চরিত্রটায় ভেবেছেন, আর কাজলকে মায়ের চরিত্রে।
‘হেলিকপ্টার ইলা’ ছবির একটি দৃশ্যে কাজল ও ঋদ্ধি সেন। ছবি: সংগৃহীত
প্রদীপ সরকারের শুটিং করার খুব মজার একটা ধরন ছিল। তিনি পুরো চিত্রনাট্যের একটা ‘অডিয়ো বুক’ তৈরি করে নিতেন, পারফরম্যান্সটা কী রকম হবে সেটা বোঝার জন্য। ওই অডিয়ো রেকর্ড করতে গিয়েই আলাপ হয় কাজলের সঙ্গে। প্রথম দিনই একটা সখ্য তৈরি হয়ে যায় আমাদের মধ্যে। প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি দিন শুটিং করেছিলাম আমরা। যেহেতু মা-ছেলের চরিত্র, সেটা তো স্বাভাবিকই, আমার এবং কাজলের মধ্যেও সেই বন্ডিং তৈরি হয়েছিল। ছবির দ্বিতীয় দিনের শুটিংয়ে আমাদের একটা ঝগড়ার দৃশ্য ছিল। আমি ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, আর মা (কাজল) আমাকে একটা চড় মারেন। ওই দৃশ্যটার মধ্যে দিয়েই আমাদের মধ্যেকার প্রাথমিক জড়তা কেটে গিয়েছিল অনায়াসে, পরবর্তী দৃশ্যগুলোর ক্ষেত্রে যা খুবই সাহায্য করেছে আমাদের। দৃশ্যটায় দু’জনে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, তার পর থেকে আমরা বেশ নিজেদের মতো করে সময় নিয়ে আলোচনা করে অভিনয় করতাম। অভিনয় করতে করতে কখনও কখনও মনেও হয়েছে যে এই মুহূর্তটা তো সত্যি। আমার মন ছুঁয়ে গিয়েছিলেন ব্যক্তি কাজল। খুব স্পষ্টবাদী মানুষ। অন্যদের মন রেখে চলার মানুষ কাজল নন। ওঁর মনে যা, মুখেও তাই। কারও পছন্দ হল কি হল না, তার তোয়াক্কা করেন না।
শুটিং বা প্রচারের ফাঁকে আরও নানা বিষয়ে আড্ডা হত আমাদের। বাংলা ছবি নিয়ে, নাটক নিয়ে জানতে চাইতেন কাজল। বাংলা বলতে না পারলেও বাঙালিয়ানা তো তাঁর মধ্যে রয়েছে। কলকাতা শহরের প্রতি টানও রয়েছে। এ শহর নিয়ে জানতে চাইতেন সবসময়, কতটা পরিবর্তন হয়েছে কলকাতার, জানতে চাইতেন। ছোটবেলার দুর্গাপুজোর স্মৃতি নিয়ে আড্ডা হত আমাদের, ওঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, সব নিয়ে আলোচনা হত। কী ভাবে চরিত্র বাছেন তা নিয়েও জানতে চাইতাম আমি। শহরে প্রচারে যখন এসেছিলেন আমার মা, কাজল আর আমি একটি ছবি তুলেছিলাম। আমি সে দিন আমার মায়ের সঙ্গে আলাপ করাই, সেটা খুবই আনন্দের একটা মুহূর্ত।
ব্যক্তি কাজল খুব স্পষ্টবাদী মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
ছবি শেষ করার পর যখন প্রচার করতে শুরু করলাম, তখন কাজলের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলাম। খুব আড্ডা হয়েছিল আমাদের। আর এখনও সেই বন্ধুত্বটা রয়ে গিয়েছে। তিনি যখন কলকাতায় আসেন, তখন দেখা হয়, বা আমি মুম্বই গেলে দেখা করি। দু’বছর আগেও শুটিংয়ে কলকাতায় এসেছিলেন। তখন দেখা হয়েছিল আমাদের। আমি ওঁর থেকে অনেকটাই ছোট। কিন্তু সেটা কখনও অনুভব করাননি তিনি। বরং বন্ধুর মতোই মিশেছেন। আমাকে নিজের মতো করে কাজ করতে স্বাধীনতা দিয়েছেন সমবয়সির মতোই।
আমি যে দিন জাতীয় পুরস্কার পেলাম, সেই দিনটা আমার মনে আছে। খবরটা পেলাম আমি শুটিংয়ের মধ্যেই। কাজল আলাদা করে আমার জন্য উদ্যাপন করেছিলেন। উনি খেতে যে খুব ভালোবাসেন, সেটা আমি জানি। কারণ, আমরা একসঙ্গে প্রচারে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। কাজলের একটা গুণ হল, খুব সহজাত ভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন তিনি। আমি অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি, কাজ শেষ হয়ে গেলে পেশাদারিত্ব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু সম্পর্কের বা কিছু মানুষের রেশ থেকে যায়। কাজলের ক্ষেত্রে আমার তেমনই থেকে গিয়েছে। তিনি এমনই থাকুন, আরও কাজ দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আর যে যা-ই বলুক না কেন, এমন স্পষ্টবাদীই থাকুন কাজল।