Advertisement
E-Paper

বাংলা ছবির ‘অমৃতকাল’ ফেরাতে বার্তা, দরকারে অর্থ বরাদ্দ করবে সরকার, উত্তম-জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে মিঠুন চক্রবর্তীর আবদার, বাইরে থেকে কলকাতায় যারা ছবি করতে আসবে, তাদের ভরতুকি দিতে হবে রাজ্য সরকার থেকে। মঞ্চে বসেই সেই আবদার মেনে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:০৯
উত্তম-জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

উত্তম-জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

এক দিন বাংলা সিনেমাই এগিয়ে থাকত গোটা দেশের নিরিখে। বলিউডকে টেক্কা দিত। সেই সুদিন ফিরিয়ে আনতে হবে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি আশ্বাস দেন, সরকার এ ব্যাপারে টলিউডের পাশে থাকবে, প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য করবে। বৃহস্পতিবার নন্দন প্রেক্ষাগৃহ চত্বরে একতারা মুক্তমঞ্চে উত্তমকুমারের জন্মশতবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি বলেন, ‘‘আমরাই তো গোটা ভারতকে লিড করতাম। বলিউডকে টেক্কা দেবে কে, না টলিউড। আমাদের আবার সেই জায়গাটায় ফিরে আসতে হবে। এটা হোক আজকের সন্ধের অঙ্গীকার। সরকার আপনাদের পাশে থাকবে, কী সাহায্য লাগবে বলুন, কোথায় পরিকাঠামো দিতে হবে বলুন। বাজেট বরাদ্দ করতে হলে বলুন। কোনও ছাড়পত্র লাগলে, আইন বদলাতে হলে বলুন। সরকার সাহায্য করবে, শুধু উত্তমকুমারের সেই ‘অমৃতকাল’ ফিরিয়ে আনতে হবে।’’

এ দিন সন্ধেয় দর্শকভর্তি নন্দন চত্বরের মঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে একদিকে দেখা গেল মিঠুন চক্রবর্তী ও অন্য দিকে জিৎকে। এ ছাড়াও মঞ্চে ছিলেন সন্দীপ রায়, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রদীপ জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পিছনের বিশাল পর্দায় ফুটে ওঠে উত্তমকুমারের বিভিন্ন ছবিতে তাঁর চরিত্রের মুখ, নেপথ্যে বেজে ওঠে ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতে ব্যবহৃত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সুরেলা ‘হরি ওম’ ধ্বনি। সেই সঙ্গে উত্তম-অভিনীত সেই চরিত্রের সংলাপ-সহ অবিস্মরণীয় এক দৃশ্য। মঞ্চে তখন নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের পাশে নিয়ে কেক কাটছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর পরেই তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করেন।

উত্তমের জন্ম শতবর্ষ উদ্‌যাপন।

উত্তমের জন্ম শতবর্ষ উদ্‌যাপন। ছবি: সংগৃহীত

মুখ্যমন্ত্রী শুরুতেই জানান, কিছুদিন আগে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা করেন উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে। প্রসেনজিৎ এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, ‘‘এই অনুষ্ঠান সার্থক করতে সব শিল্পীই সহযোগিতা করেছেন। আজকের মঞ্চ যেন চাঁদের হাট। সবাই আমরা এক জায়গায় চলে এসেছি। মহানায়ক আমাদের এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন। আমাদের মধ্যে কোনও বিভেদ, সংকীর্ণতা নেই। গতকাল কাকে কী বলেছি, সব ভুলে গিয়েছি! আজ শুধুই উত্তমকুমার, উত্তমকুমার, উত্তমকুমার...’’ এই কথায় দর্শকাসন থেকে প্রবল হাততালি পড়ে। শুভেন্দু আরও বলেন, ‘‘মহানায়ক শুধু তিলোত্তমা বা সিটি অফ জয় এই কলকাতায় আটকে নেই। মহানায়ক আজ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়েছেন।

উত্তমের স্মৃতিচারণায় মিঠুন।

উত্তমের স্মৃতিচারণায় মিঠুন। ছবি: সংগৃহীত

এর পরে মিঠুন বলতে উঠে প্রথমেই মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। এর পর তিনি জানান, বাংলা চলচ্চিত্র জগৎকে আরও উন্নত করতে হলে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটাই আবদার করবেন। তা হল, এখানে যারা বাইরের রাজ্য থেকে শুটিং করতে আসবে, তাদের ৩০ শতাংশ ভরতুকি দিতে হবে রাজ্য সরকারকে এবং সেটা নগদে নয়, করছাড়া বা সেই ধরনের কিছু সুযোগের মাধ্যমে। মঞ্চে এ কথা বলেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকান। শুভেন্দু মুচকি হেলে সম্মতিসূচক ইঙ্গিত করতেই মিঠু বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, এটা হয়ে যাবে!’’

পদযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জিৎ।

পদযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জিৎ। ছবি: সংগৃহীত

নন্দন থেকে এ দিন সন্ধেয় পদযাত্রা শুরু হয়। পুরোভাগে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী-সহ বাংলা চলচ্চিত্রজগতের জিৎ-সহ বিশিষ্ট অভিনেতারা। নন্দন চত্বর ঘুরে সেই পদযাত্রা বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম হয়ে ঘুরে জওহরলাল নেহরু রোড ধরে এগিয়ে যায়। তার পরে রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনের পাশ দিয়ে নন্দন চত্বরে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় পৌঁছোয়। সেখানেই একটি ভিন্টেজ গাড়িতে আসেন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী, চিরঞ্জিত, মমতাশঙ্কর, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ রায়, রঞ্জিত মল্লিক ও হরনাথ চক্রবর্তী। ওই গাড়ির পিছনে ছিলেন প্রসেনজিৎ, যিশু, রাজ চক্রবর্তী, শুভশ্রী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, শ্রাবন্তীরা। উত্তমকুমারের ছবি-সহ প্ল্যাকার্ড হাতে পদযাত্রার শেষ সারিতে দেখা মেলে ইন্ডাস্ট্রির নতুন প্রজন্মের অভিনেতা ও কলাকুশলীদের। রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে এ দিন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশেষ কিছু অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা দিনকয়েক আগেই নেওয়া হয়েছিল। এ দিনই তার সূচনা হল।

এ দিন মঞ্চে কেক কাটার পরে উত্তমকুমারের পরিবারের সদস্যদের পায়েস খাইয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। মিঠুনকেও তিনি পায়েস খাওয়ান।

নন্দনের পাশাপাশি, এ দিন টালিগঞ্জ, বিজলী প্রেক্ষাগৃহ চত্বর ও আহিরীটোলায় সরকারি রাজ্য সরকারের এবং জিপিও-তে ডাকবিভাগের উদ্যোগে উত্তম জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ছিল।

স্মৃতি চারণায় ঋতুপর্ণা, মাধবী, সাবিত্রী।

স্মৃতি চারণায় ঋতুপর্ণা, মাধবী, সাবিত্রী। ছবি: সংগৃহীত

এ দিন সকাল ৮টায় আহিরীটোলায়, উত্তমকুমারের মামাবাড়ির কাছে তাঁর মূর্তিতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করেন মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী। এর পরে, সকাল ১১টা নাগাদ টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের সামনে উত্তমকুমারের মূর্তিতে মালা দিয়ে বিশেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী সেখানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, গোটা ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র তথা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, একটি অত্যন্ত আনন্দের দিন। অত্যন্ত গর্বের দিন। আমি খুশি, উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের সময়ে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব রাজ্যবাসী আমার হাতে তুলে দিয়েছেন।” অভিনেতাকে নিয়ে আগামী কয়েক দিনের একাধিক কর্মসূচির ঘোষণাও করেন তিনি। অনুষ্ঠানে রঞ্জিত মল্লিক, দেব, জিৎ, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, হরনাথ চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, গৌতম ঘোষ-সহ টলিউডের প্রথম সারির একাধিক মুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর পরে দুপুরে ভবানীপুরের বিজলী প্রেক্ষাগৃহের সামনের চত্বরে উত্তমকুমারের ২০ ফুটের একটি পূর্ণাবয়ব ছবির কাটআউটের উদ্বোধন হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ছিলেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী, অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, হরনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ।

এ দিন বিকেলে একটি বেসরকারি গোষ্ঠীর উদ্যোগে জিপিও-তে ভারতীয় ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে উত্তম-স্মরণে একটি বিশেষ কভারের উদ্বোধন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত প্রমুখ। ছিলেন জিপিও কর্তাও।

সেজে উঠেছে শহরের নানা জায়গা।

সেজে উঠেছে শহরের নানা জায়গা। ছবি: সংগৃহীত

আর্টিস্ট ফোরামের তরফে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগে উত্তমকুমারের বাড়িতে গিয়েছিলেন শিল্পীরা। উত্তমের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়ির তরফেই এক বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল। শিল্পীদের লুচি, আলুর তরকারি, পায়েস খাওয়ানো হয়।

উত্তম-স্মরণে সামনের তিন দিন ধরেই নানা অনুষ্ঠান। ৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাজারহাটের নিউটাউনে ‘উত্তমকুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা মুখ্যমন্ত্রীর। পাশাপাশি, বিকেলে নন্দনে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ দিয়ে শুরু হবে উত্তমের ছবির উৎসব।

৫ সেপ্টেম্বর, শনিবার শিশির মঞ্চে ‘নায়িকাদের চোখে উত্তমকুমার’ ও ‘অ্যাক্টিং অফ উত্তমকুমার’ শীর্ষক দু’টি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে।

এর পর ৬ সেপ্টেম্বর, রবিবার রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বিশেষ সাঙ্গীতিক শ্রদ্ধার্ঘ। জানা গিয়েছে, সেখানে চলচ্চিত্রজগতের শিল্পীরা নাচে, গানে, অভিনয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন উত্তমকুমারকে।

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে প্রতি বছরই উত্তমকুমারের মৃত্যুদিবসে, অর্থাৎ ২৪ জুলাই বড় করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত, যার মুখ্য উদ্যোগী ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছরেও ধনধান্য স্টেডিয়ামে আড়ম্বর করেই এই অনুষ্ঠান হয়েছিল। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে, এই ধারায় বদল আনেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গত জুলাইয়েই নন্দনে উত্তমকুমারের জন্মশতবার্ষিকী পরিকল্পনা সংক্রান্ত এক আলোচনার পরে শুভেন্দু জানিয়ে দেন, মৃত্যুদিবসে নয়, উত্তমকুমারের জন্মদিন ঘিরেই যাবতীয় উদ্‌যাপন করবে রাজ্য সরকার।

তবে এ দিন সকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে নিজের পাতায় উত্তমকুমারের ছবি দিয়ে অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

Uttam Kumar Suvendu Adhikari

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy