তিনি হলেন সূর্য। ঠিক যেমন সূর্য অস্ত গেলেও চাঁদ আলো দেয়, ঠিক তেমনই উত্তমকুমার। আর বাকি অভিনেতারা এক-একটি নক্ষত্র। এ কথা বলেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চার দিন ধরে চলা অনুষ্ঠানের তৃতীয় দিনে রবীন্দ্র সদন প্রাঙ্গণ ফের এক বার হয়ে উঠেছে উত্তম-স্মৃতির আসর। তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবন যাঁর, সেই তারকা অভিনেতার শতবর্ষ। উদ্যাপনে সেজে উঠেছে শহর। বলা ভাল, এখন কলকাতা উত্তমময়। প্রেক্ষাগৃহে চলছে তাঁর ছবি। সান্ধ্যকালীন আড্ডায় জমে উঠছে নন্দনচত্বর। উত্তমপ্রেমী মানুষের ঢল নামছে একতারা মুক্ত মঞ্চে। প্রিয় নায়কের জীবনের অজানা কথা শুনতে হাজির হচ্ছেন সিনেমাপ্রেমী দর্শক।
শনিবার সন্ধ্যায় শিল্পীদের স্মৃতিচারণায় বার বার ফিরে এলেন সেই মানুষটি। বিকাল গড়াতেই শুরু হল একের পর আলোচনাসভা। মঞ্চে ফিরে এল তাঁর সহশিল্পীদের স্মৃতি আর পুরনো দিনের গল্প। ফের এক বার জীবন্ত হয়ে উঠল উত্তমকুমারের সময়। শিশির মঞ্চে এক বিশেষ আলোচনাসভায় যোগ দিলেন মমতাশঙ্কর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাওলি দাম, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পৌলমী বসু, গার্গী রায় চৌধুরী ও ইশা সাহা। সঞ্চালনায় কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। আলোচনার বিষয়, ‘আজকের অভিনেত্রীদের চোখে উত্তম’।
উত্তমকুমার না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— এই নিয়ে নানা তর্কবিতর্ক চলতেই থাকে। এ প্রসঙ্গে কথা বললেন সৌমিত্র-কন্যা পৌলমী বসু। তিনি বলেন, ‘‘বাপি ও উত্তমজেঠুর সখ্য ছিল। অনেক সময়েই রাত দশটায় উত্তমজেঠু বাপিকে ফোন করেছেন, ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে ডেকেছেন। বাপি অত রাতেও গিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কী হয়েছে, তা কখনও বলেননি কাউকে। আমি বা মা-ও জানতে পারিনি। আমার বাবা কখনও উত্তমকুমার হতে চাননি। আমরা সকলেই মনে করতাম, উত্তমকুমার মাউন্ট এভারেস্ট। ঠিক যেমন কবিদের আদর্শ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঠিক তেমনই আমার বাবার কাছেও ছিলেন উত্তমজেঠু।’’
উত্তমকুমারের কথা বলতে গিয়ে ছোটবেলার স্মৃতিতে ফিরে গেলেন মমতাশঙ্কর। এক অনুষ্ঠানবাড়িতে অভিনেতার সঙ্গে দেখা হতেই তাঁর গাল টিপে আদর করে দেন— সেই গল্প শোনান অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “এখন মনে হয়, ওই স্নেহের পরশ যদি আজও থাকত!” তিনি বলে চলেন, “ওঁর কথা বলতে গেলে এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। এক অনুষ্ঠানে গিয়েছি, দেখছি ওঁকে ঘিরে সমস্ত ক্যামেরা— স্বাভাবিক ভাবেই। সে দিন হয়তো মায়ের কাছে শুনেছিলেন ওই অনুষ্ঠানে আমি একা গিয়েছি, বাবা যেতে পারেননি। আমি কে? তখন তো বাচ্চা! তবুও অত বড় এক জন মানুষ, একা বাচ্চাকে সঙ্গ দিতে হঠাৎ পাশে এসে বসেন। খোঁজ নিতে শুরু করেন আমার। আমি হতবাক। কেউ শুধু নিজের কাজ দিয়েই ওই উচ্চতায় পৌঁছোতে পারেন না, মনুষ্যত্ব, আন্তরিকতা ভিতরে না থাকলে মনে হয় সম্ভব নয়।”
এখনও সিনেপ্রেমীদের মুখে শোনা যায়, উত্তমকুমারের মৃত্যুর দিনের কাহিনি। কী ভাবে চোখের জল ফেলেছিল গোটা বাঙালি জাতি। সাধারণ মানুষ থেকে তারকা— যেন তাঁদের পরিবারেরই কারও মৃত্যু হয়েছে। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা ঋতুপর্ণার মনে। তিনি বলেন, “উত্তমকুমারের চলে যাওয়ার স্মৃতি আমাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। কারও জন্য ওরকম উন্মাদনা কখনও দেখিনি। ওই দিন আমাদের বাড়িতে রান্না হয়নি। দেখেছিলাম, মা-মাসিরা স্বজন হারানোর শোকে কাতর। আমার মা-ও কেঁদেছিলেন খুব। মনে আছে, ওঁর মৃত্যুর পরে ওঁকে সারা শহর ঘোরানো হয়েছিল এবং সেই সঙ্গে ‘গুরু গুরু’ বলে চিৎকার। ‘গুরু’ শব্দের শুরু ও শেষ যেন তিনিই। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আকুল আর্তি সে দিন দেখেছিলাম, অনুরাগীরা যে ভাবে বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন, ওই দৃশ্য আমি কখনও ভুলব না।”
উত্তম-ম্যাজিকে কাবু এ প্রজন্মের নায়িকা ইশাও। তাঁর কাছেও স্বপ্নের পুরুষ উত্তমকুমার। অভিনেতার শতবর্ষ উদ্যাপনে যোগ দিতে পেরে গর্বিত তিনি। উত্তমকুমারের নায়িকা হওয়ার ইচ্ছা তাঁর মনেও রয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, “‘রাজকুমারী’ বা ‘দেয়া নেয়া’র তনুজা হতে ইচ্ছা করে খুব। রিনা ব্রাউন হতে পারলেও খুব ভাল হত। আসলে কোনও অভিনেতা তো একা একা অভিনয় করেন না, সামনের অভিনেতার কাজও উদ্বুদ্ধ করে। ফলে খানিক আফসোস তো আছেই।”
আফসোস অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের মনেও রয়ে গিয়েছে। আর কিছু বছর আগে জন্মালে হয়তো উত্তমকুমারের সঙ্গে পর্দাভাগ করতে পারতেন। সেই সঙ্গে ওঁর অভিনয় চাক্ষুষ করতে পারতেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, কেন যে ২০ বছর আগে জন্মালাম না!”
আরও পড়ুন:
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এই সময়ের অভিনেত্রী পাওলি দামও। যৌথপরিবারে বড় হওয়া পাওলি ছোট থেকেই দেখেছেন, সন্ধ্যা হলেই বিশেষত সপ্তাহান্তে মা-জেঠিমারা উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা চালাতেন। সেই উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘আলাপ’ শুরু। অভিনেত্রীর কথায়, “তখন ছোট ছিলাম, অত বুঝতাম না। কিন্তু এটুকু অনুভব করতে পারতাম যে, এই মানুষটা সাধারণ নন। কোনও এক অসাধারণ জাদুবলে ওঁর কাজ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওইরকম উচ্চারণ, ভয়েস মডুলেশন, নিখুঁত লিপ-সিঙ্ক, এক-একটা চরিত্র এক-এক ভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা সচরাচর দেখা যায় না। এখন নানা শব্দবন্ধ জানি, তাই বলতে পারছি। ধীরে ধীরে এই মানুষটা, আমার অজান্তেই আমার মনের মানুষ হয়ে গেলেন।” তিনি মনে করেন, এমন কোনও বাঙালি নেই যিনি উত্তমকুমারকে ভালবাসেন না! যে কারণে, এই শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা, এত উদ্যাপন।
উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন চলবে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। রবিবার নাচ-গানের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হবে বর্ষীয়ান শিল্পীকে।