Advertisement
E-Paper

লিখিত নাটকে দু’-একটা খুঁত থাকলেও তা ঢেকে যায় সৃজিতের ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবির শেষ দৃশ্যে

২০০২ সালের রাজনৈতিক সমীকরণ কখনও ভেঙে, কখনও গড়ে অনেকটা রাস্তা পার করে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ, এখানকার মানুষ। ২৪ বছর আগে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ লেখার প্রণোদনা যা-ই হোক না কেন, নাটকের গভীর মর্মকথাটির আবেদন কি আজও প্রাসঙ্গিক? বড়পর্দায় নিজের সৃষ্টি দেখে এসে কলম ধরলেন নাট্যকার ব্রাত্য বসু।

ব্রাত্য বসু

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪২
সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি দেখে কী প্রতিক্রিয়া ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের স্রষ্টা ব্রাত্য বসুর?

সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি দেখে কী প্রতিক্রিয়া ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের স্রষ্টা ব্রাত্য বসুর? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

২০০২ সালের জুলাই মাসে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ থিয়েটার হিসাবে মঞ্চস্থ হয়। সেই বছরে জানুয়ারি মাসে আমি নাটকটি লিখেছিলাম। ‘লেকটাউন সংস্কৃতি’ নামক নাট্যদল নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিল। সেই দলের পরিচালক ছিল দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। আমার চেয়ে বয়সে চার বছরের বড় হলেও, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেবেশ। আমার প্ররোচনাতেই মফস্‌সলের ছেলে দেবেশ কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে থিয়েটার করতে চলে আসে এবং নিজের থিয়েটারি দল স্থাপন করে।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর আগে দেবেশ দু’টি থিয়েটার পরিচালনা করেছিল— একটি ‘অগ্নিবর্ষী’, আর একটি ‘প্রতিনিধি’। দেবেশ তার আগে বহু বার আমাদের বাড়িতে এসেছে, আমি ওর বাড়িতে গিয়েছি। আমাদের থিয়েটারি বন্ধুত্বের আড্ডা চলতেই থাকত। দেবেশ আমাকে একদিন ওর দলের জন্য নতুন নাটক লিখতে বলে। ওর সুপারিশ বা পরামর্শে লিখি ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’। এমনও দিন গিয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত লিখেছি। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, দেবেশ আমার পাশে বসে। ওকে কয়েকটি দৃশ্য পড়ে শোনাই। শুনে ও পর্যাপ্ত পরিমাণে উত্তেজিত হয়, কিন্তু পুরোটা লেখা হয়নি তখনও। অতএব, পরের দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ওকে। এ ভাবেই সেই নাটকটি লেখা হয়। ২০০২ সালের জুলাই মাসে মঞ্চস্থ হওয়ার পরে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। নাটকটি দেখে সেই সময়ে এক নামী পরিচালক আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে প্রশ্ন করেছিলেন, “২৫ বছর পরে এই নাটকের প্রাসঙ্গিকতা কী? এটা তো এই সময়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে!”

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিক চক্রবর্তী ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিক চক্রবর্তী ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

আমি তো গণৎকার ছিলাম না, তাই তখন নীরব থাকা ছাড়া আর কোনও পথ ছিল না। ২৫ বছর পেরোনোর আগেই আমার চেয়ে বয়সে আট বছরের ছোট চিত্রপরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ করতে চাইল। তা-ও আবার বড়পর্দায়। শুনে যৎপরোনাস্তি খুশি হলাম। সৃজিত এই নাটকের স্বত্ব নিল।

সৃজিত এই ছবিতে আমাকে অভিনয় করতেও বলেছিল। স্বভাবতই রাজি হইনি। আসলে, নাটকটিতেও আমি অভিনয় করিনি (অনেকে যদিও বলেছিলেন, রজতাভ দত্তের চরিত্রটি আমি অভিনয় করলেও খারাপ হত না)। সৃজিত দ্রুতই ছবিটা বানিয়ে ফেলে। যদিও আমি শুনেছি, সেনসর বোর্ডে এই ছবি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল সৃজিতকে। অবশেষে সেপ্টেম্বরে প্রায় ২৫ বছর আগে লেখা সেই নাটকটি সারা বাংলা জুড়ে মুক্তি পেল। দেবেশ নাটকটি পরিচালনা করেছিল এবং সৃজিত ছবিটি করল। দু’জনের প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্যে দেবশঙ্কর হালদার ও রজতাভ দত্ত।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্যে দেবশঙ্কর হালদার ও রজতাভ দত্ত। ছবি: সংগৃহীত।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটক ও ছবির মধ্যে আরও একটি মিল আমার নজরে পড়েছে। প্রায় সিনেমার মতো করেই তৈরি হয়েছিল ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটক। ‘রেপের্টরি ফর্ম’-এর কথা মাথায় রেখেছিলাম— নির্দিষ্ট দলের অভিনেতাপুঞ্জদের দিয়ে এই নাটকের অভিনয় করানো যাবে না। প্রতিটি চরিত্রের জন্য শক্তিশালী অভিনেতা দরকার। দেবেশের দলের যোগ্য অভিনেতাদেরই এই নাটকে নেওয়া হবে— এমনই স্থির হয়েছিল। আমি নিজের নাট্যদল থেকে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ মঞ্চস্থ করতে চাইনি। দলীয় গণতন্ত্রের বাধ্যবাধকতার ফাঁদে আটকে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। দেবেশ আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। রেপের্টরি নির্মাণের কথা মাথায় রেখেই বহু অভিনেতাকে বাইরে থেকে নিয়ে আসে।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবির শুটিংয়ের ফাঁকে সকলের সঙ্গে ব্রাত্য বসু।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবির শুটিংয়ের ফাঁকে সকলের সঙ্গে ব্রাত্য বসু। ফাইল ছবি।

প্রথমেই বলা যাক দেবশঙ্কর হালদারের কথা। তখনও তাঁর তেমন পরিচিতি তৈরি হয়নি। ‘নান্দীকার’-এর নাটকের পরে এক সন্ধ্যায় শ্যামবাজারে দেবশঙ্করকে আমি আর দেবেশ পাকড়াও করি। দেবেশের সঙ্গে দেবশঙ্করের আলাপ করিয়ে দিই। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এ অভিনয় করতে রাজি হয় দেবশঙ্কর। এ ভাবেই রজতাভ দত্ত, প্রদীপ ভট্টাচার্য, শ্যামল চক্রবর্তী, অসিত বসু, মায়া ঘোষ, মৈত্রেয়ী দাস প্রমুখ বিভিন্ন দল থেকে এসে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই নাটকে অভিনয় করেন। অর্থাৎ, দেবেশ শুধু এই নাটকের পরিচালকই নয়,একপ্রকার প্রযোজকের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হয়। তখন দেবেশ একটি স্কুলে পড়াত এবং প্রাইভেট টিউশনি করত। তাই জীবনযাপনের ঝুঁকি নিয়েই কাজটি করেছিল দেবেশ। ওর দলের কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় করেছিল নকশাল নেতা রাজেনের দিদি বীথির চরিত্র। সবমিলিয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ওর এই নীলকণ্ঠ ঝুঁকির ফলাফল জীবনে অমৃত হয়েই ফেরত দিয়েছিল ।

পাশাপাশি বড়পর্দাতেও নির্দিষ্ট প্রযোজকের ব্যানারে নিয়ম মেনে অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। যে শিল্পের যা নিয়ম।

এ ছাড়া, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটক ও ছবির মধ্যে আমি আর কোনও মিল খুঁজে পাইনি। তার প্রথম কারণ— দু’টি ভিন্ন মাধ্যম। একটি থিয়েটার, অন্যটি সিনেমা। প্রথমটি ছিল ‘পাওয়ার প্যাকড ও পারফরম্যান্স বেস্‌ড, হাই স্ট্রাং ড্রামা’, যেখানে মুখ্য ছিল পারফরম্যান্স— সংলাপের বিভিন্ন স্তরগুলিকে বোঝা এবং সেগুলি উপস্থাপন করা। এর সঙ্গে দেবেশ সেই নাটকের প্রযোজনার পরতে যে ‘র এনার্জি’ বিন্যস্ত করেছিল, তাতে গোটা বিষয়টি একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর বাস্তবতার সুনামি হয়ে দর্শকের মধ্যে আছড়ে পড়ে। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর গোড়ার দিকের অভিনয়ের সময়টা গোটা অডিটোরিয়াম প্রায় একটা ফুটবল মাঠের মতোই ফুটত। যেন এক ধরনের চড়া সম্মোহক-কোহল দর্শকদের পান করানো হত। পরে ‘রূদ্ধসঙ্গীত’ থিয়েটারেও আমি ওই তীব্র সুনামির গাঢ়তা অনুভব করেছি।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্য।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

বড়পর্দায় সম্পূর্ণ অন্য ভাবে সৃজিত ছবিটি তুলে ধরেছে। সে একটা সম্পর্কের শান্ত অন্তর্বয়ন এবং দু’টি সময়ের গল্প— এই ভাবে তুলে ধরতে চেয়েছে। বড়পর্দায় ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবির গল্প আমি নতুন করে বলছি না। বরং বলব, রুশ কবি আলেকজ়ান্দার ব্লখের সিনেমা এবং থিয়েটারের তুলনামূলক একটি উক্তির কথা। ব্লখ বলেছিলেন, “আমার মতে, সিনেমার সঙ্গে থিয়েটারের কোনও সাদৃশ্য নেই। কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কেউ কাউকে ধ্বংস করে দিতে পারে না। সিনেমা ও থিয়েটারের মধ্যে তুলনা আমার কাছে ফ্যাশনদুরস্ত। ফলত, আমার কাছে অর্থহীন। আমি সিনেমা ও থিয়েটার পছন্দ করি তাদের মাধ্যমের নিজস্বতার কারণে।”

ব্লখ অবশ্য যতটা অক্লেশে এই কথাটি ইউরোপীয় পরিসরে লিখে দিতে পেরেছিলেন, আমাদের দেশে বিষয়টা এত সহজ নয়। বিশেষত সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের তুলনা আমাদের দেশে বিভিন্ন লেখায় বার বার ফিরে ফিরে এসেছে।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্য।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

গোড়ার দিকে বাংলা চলচ্চিত্র সাহিত্যনির্ভর ছিল। ক্রমশ সেই নির্ভরতা থেকে বেরিয়েও এসেছিল। নিজস্ব ভাষা সে তৈরি করেছে। উন্নত দেশগুলিতে এই থিয়েটারের ও চলচ্চিত্রের যে শিল্পসম্মত প্রয়োগ ঘটেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বরাবরই এই দু’টি মাধ্যমই প্রধানত একটি পণ্যচেতনার উপাদান হিসাবে কাজ করেছে। প্রকৃত রাজনৈতিক ছবিও আমাদের দেশে যত না শিল্প, তার থেকেও যেন বেশি বিনোদন। তবে থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্র, যতই বাণিজ্য হিসাবে দেখা হোক না কেন, শেষপর্যন্ত এই দু’টি শিল্পই।

শিল্পের নিরিখে যদি বলতে হয়, সৃজিত ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-কে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছে। দেবেশের মতো সৃজিতের চেতনাতেও রাজনৈতিক বোধ প্রবল। ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে আমাদের এখানে বাস্তবতার ক্ষেত্রে দু’জনেরই নিজস্ব স্বর শোনা গিয়েছে। আবার যেহেতু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করা সবচেয়ে সহজ, সেই আত্মমর্যাদার কারণে তারা অনেক সময়ে চুপ করেও থেকেছে। ফলে বিদেশে গোদার বা ত্রুফোরা যে অর্থে চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে দেখেছেন, আমাদের দেশে সেটা হতে পারেনি। আমি এমএস সথ্যুর ‘গরম হাওয়া’ বা ভীষ্ম সাহনির ‘তমস’-এর কথা মাথায় রেখেও এ কথা বলতে পারি। এখানে চলচ্চিত্র মূলত বিনোদন হিসাবেই দেখা হয়। সৃজিতের মাথাতেও নিশ্চয়ই সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যটি সক্রিয় ছিল।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিকের সঙ্গে সোহিনী।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিকের সঙ্গে সোহিনী। ছবি: সংগৃহীত।

আরও একটি সমস্যা সৃজিতকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। ব্রিটিশ চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্রসমালোচক এরিক বেন্টলি চলচ্চিত্র-থিয়েটারের তুলনামূলক আলোচনায় বলেছিলেন, চলচ্চিত্র হল বাস্তবের একটা অনুকরণ (মাইমেসিস)। কিন্তু থিয়েটার সেখানে বাস্তবের খণ্ড (স্লাইস)। থিয়েটার মাধ্যমের কারণেই অনেক সময়ে আঞ্চলিক থাকে, চলচ্চিত্রে তা হয় না। অধিবাস্তবের একটা সুবিধা হল, থিয়েটার নির্দেশক বা নাট্যকার যা পান, কিন্তু চলচ্চিত্রের পরিচালক তা পান না। থিয়েটারে একটি ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে যদি বলা হয়— এটি বাজার, মন্দির বা রেলস্টেশন, দর্শক তা মেনে নেবে। কিন্তু চলচ্চিত্র মাধ্যমে দর্শক এটা মানবে না। অর্থাৎ, বাস্তবের হুবহু অনুকৃতি ফুটিয়ে তোলাই একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের কাজ। থিয়েটার সেখানে স্বভাববাদের থেকে বাস্তববাদ বেশি। থিয়েটারে কল্পনার আশ্রয় নেওয়ার স্থান রয়েছে— মাইমেসিসের সঙ্গে স্লাইসের যেখানে পার্থক্য।

সমস্যা হচ্ছে, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এ প্রচুর জায়গায় বাস্তব ও অধিবাস্তবের যাতায়াত রয়েছে। স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ঘন ঘন মেলবন্ধন আছে। যেমন নাটকের মধ্যভাগে বড় সব্যসাচী তার বাবাকে দেখতে পায়, আবার নিজের ছোটবেলাকেও দেখতে পায়। স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে একটা বিভ্রম নাটকটি তৈরি করার চেষ্টা করে। সৃজিত এই জায়গাটি চমৎকার ভাবে (যেন অতীত দিনের বায়োস্কোপ কেউ দেখছে) তুলে ধরেছে। সব্যসাচী স্বপ্নে স্তালিনকে দেখে। ২৬ বছর পরে ঘুম থেকে উঠে আসাটাই একটা অধিবাস্তব বিষয়। সৃজিত এই বিষয়টি ‘ন্যাচরালইজ়ম’ বা প্রকৃতিবাদের পাত্রে দারুণ ভাবে রেঁধেছে। এই রান্নায় তার সহায়ক হয়েছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। কিন্তু তা ছাড়াও, এই ছবিতে সৃজিত যে যে মোটিফ ব্যবহার করেছে, তা উল্লেখযোগ্য। যেমন আকাশে উড়ে যাওয়া পাখি, একটি ঘূর্ণায়মান নাগরদোলা, বা অতীত দিনের বায়োস্কোপ, কিংবা উপর থেকে কলকাতার কিছু শট, যেখানে শহরটাকে ব্যান্ডেজ বাঁধা মৃত নগরীর মতো লাগে। এগুলি সৃজিতের নিজস্ব সৃজনশীল কল্পনার ফলাফল। তদুপরি এমন এক শান্ত বাস্তবতা ও ছবিতে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, যার ইঙ্গিত মূল নাটকেও ছিল। বাবা যখন ছেলেকে বলে, ‘এখন জরুরি অবস্থা চলছে’, ছেলে তখন বলে, ‘এখন শীতল অবস্থা চলছে।’ এই জরুরি অবস্থার মধ্যে যে ওম ও উত্তাপ আছে, তা থিয়েটারের কাঠামোয় বিন্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আবার এই শীতলতার যে শৈত্য, তা এই ছবির ফ্রেমে ফ্রেমে ছড়ানো আছে। ছবির দ্বিতীয়ার্ধ অনেকের মন্থর লাগছে, কারণ নির্দেশকের মূল ট্রিটমেন্টের সঙ্গে হয়তো দর্শক সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন না। অথচ এটা নির্দেশকের একান্ত অভিপ্রায়।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকে দেবশঙ্কর-রজতাভ।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকে দেবশঙ্কর-রজতাভ। ছবি: সংগৃহীত।

অভিনয়ের দিক থেকে ঋত্বিক চক্রবর্তী ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, দু’জনকেই আমার দারুণ লেগেছে। এই দু’টি চরিত্রে অভিনয় করেছিল দেবশঙ্কর ও রজতাভ। ওদের অভিনয় বহু আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু ঋত্বিক ও পরমব্রত দু’জনেই আলাদা আঙ্গিকে অভিনয় করেছে। থিয়েটারের অভিনয়ের প্রভাব ওদের মধ্যে নেই। বিশেষত ঋত্বিক তাঁর চোখের ভাষায় বা আঙুল নাড়ানোর মধ্যে দিয়ে যে ভাবে চরিত্রটিকে বুনেছে,তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। পরমব্রতও খুবই ভাল। শুধু এক জায়গায় অভিনেতা যে ‘স’-এর ব্যবহার করেন, তা অনেক সময়ে ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউইটি বজায় রাখতে পারে না। পরমব্রতের নরম চেহারার জন্য ওকে বাংলা ছবিতে রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেই বরাবর উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ওর অভিনেতাসত্তার মধ্যেও যে ক্ষোভ, দ্রোহ রয়েছে, সেটা এত দিন পরে কোনও ছবিতে যথাযথ সদ্ব্যবহার করা হয়েছে। পরমব্রত এই ছবিতে এক অন্য আবিষ্কার। তবে কেন ওর নামের আগে ‘স্পেশ্যাল অ্যাপিয়ারেন্স’ লেখা হয়েছে, তা আমার ক্ষুদ্র মাথায় ঢোকেনি। ছবিতে রাজেন চরিত্রে সত্রাজিৎ সরকারও দারুণ অভিনয় করেছে। বিশেষত ওর চোখের ব্যবহারের জন্যই ওকে বেশ কিছুক্ষণ পর্দায় দেখতে ইচ্ছা করছিল। আর আলাদা করে বলতেই হবে অনসূয়া মজুমদার ও সোহিনী সরকারের কথা। দু’জনে ভিন্ন বয়সের রাজলক্ষ্মী। দু’জনেই অসামান্য অভিনয় করেছেন। বাংলা মঞ্চে ও ছবিতে একজন আইকন অনসূয়াদি। ওঁর অভিনয় সৃজিত এই ছবিতে যে ভাবে ব্যবহার করেছে, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ওঁর অভিনয় এই ছবিতে একটি সম্পদ। সোহিনীও স্বল্প পরিসরে সূক্ষ্ম কাজ দেখিয়েছেন। অঙ্গনাও ইন্দ্রাণী চরিত্রে সুন্দর ও যথাযথ। তাকে পর্দায় দেখতে ভাল লাগছিল। এ ছাড়াও আলাদা করে সিপিএম নেতা সনৎ চরিত্রে দেবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে।এত সংযত অভিনয় বড়পর্দায় আজকাল বিরলপ্রায়। বাকি সকলের অভিনয়ই যথাযথ ও চরিত্র অনুযায়ী মনে হয়েছে।

মূল থিয়েটারে বা লিখিত নাটকে দু’-একটা খুঁত থাকলেও তা ঢেকে যায়, যখন শেষ দৃশ্যে সৃজিত ২০২৫ সালে নবান্নের পাশে সব্যসাচী সেনের ঘুম ভাঙায় (আমি অবশ্য ছবি দেখার পরে সৃজিতকে কানে কানে বলেছিলাম, বিকাশ ভবনের পাশেই সব্যসাচীর ঘুম ভাঙলে ভাল হত!)। যে অপার সম্ভাবনায় ২০২৬-এ সব্যসাচীকে জাগিয়ে রাখা হল, তা বিশ্বাস বা মতাদর্শের জয় কি না জানা নেই। কিন্তু এক ধরনের সত্য বলার, সত্যকে অনুভব করার এবং ভবিষ্যতে সত্যকে সঞ্চারিত করার এক ধরনের সংক্রমণের চেষ্টা তো বটেই। তা রাজনীতি বা মানবসম্পর্ক যা-ই হোক না কেন। পরিচালককে এ জন্য আলাদা করে আমার অভিনন্দন ও কুর্নিশ রইল।

Bratya Basu Srijit Mukherji Winkle Twinkle Ritwick Chakraborty Debesh Chattopadhyay Parambrata Chatterjee Debshankar Halder Bengali Movie Tollywood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy