৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন নানা পটেকর। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ২০-তে বর্ষীয়ান অভিনেতাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। গোয়ায় নিজের বাড়িতে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। সেখানে ৪৫ মিনিট ধরে একনাগাড়ে সিপিআর প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি।
কী এই সিপিআর?
সিপিআর অর্থাৎ কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন এমন এক পদ্ধতি, যেটি হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দন ও স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োগ করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি হতে পারে এটি।। বুকের মাঝখানে বার বার চাপ দেওয়ার মাধ্যমে শরীরে, বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে, কিছুটা রক্ত চলাচল বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
সিপিআর নিজে থেকে সব সময়ে হৃৎপিণ্ডকে আবার স্বাভাবিক ভাবে চালু করে না। বরং উন্নত চিকিৎসা পাওয়া পর্যন্ত শরীরে রক্ত চলাচল যতটা সম্ভব বজায় রেখে সময় পাওয়ার সুযোগটা দেয়। দ্রুত সিপিআর শুরু করলে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আবার কাজ করার সম্ভাবনা থাকে। কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, ডাকাডাকিতে সাড়া দিচ্ছেন না এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিচ্ছেন না অথবা হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন— কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আশঙ্কা করে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে। তা হলেই খানিকটা সময় পাওয়া যেতে পারে।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রথমে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে, তার পর এইডি বা অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর নিয়ে আসতে বলতে হবে (যদি থাকে), এ বার সিপিআর প্রয়োগ শুরু করতে হবে। সিপিআর হাত দিয়েও দেওয়া যায়, মুখে মুখেও দেওয়া যায়।
কী ভাবে কাজ করে?
হৃদ্যন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দিলে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়তে শুরু করে। তার পরেই মৃত্যু হতে পারে রোগীর। দেহের স্বাভাবিক রক্ত চলাচলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে সিপিআর। দু’ভাবে সেটি কাজ করে।
১. চেস্ট কমপ্রেশন্স: একটি হাতের তালুর নীচের অংশ বুকের মাঝখানে রাখতে হবে। অন্য হাতটি সেই হাতের উপরে রেখে আঙুলগুলি একে অপরের সঙ্গে আটকে নিতে হবে। এ বার জোরে জোরে বুকের মাঝখানে চাপ দিতে হবে। উদ্দেশ্য একটাই, কৃত্রিম ভাবে রক্ত চলাচল শুরু করিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে নেওয়া।
২. রেস্কিউ ব্রিদিং: রোগীর মুখে মুখ দিয়ে বাতাস পৌঁছে দেওয়া হয় ফুসফুসে। বুকে চাপ দেওয়ার কারণে শরীরে যে রক্ত চলাচল তৈরি হচ্ছে, সেই রক্ত ফুসফুস থেকে এই অক্সিজেন সংগ্রহ করে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়।
কতক্ষণ দিতে হয় সিপিআর?
কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই সিপিআর-এর। ১০, ২০ বা ৪৫ মিনিট, যা খুশি হতে পারে। সাধারণ ভাবে সাড়া দেওয়া এবং স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস শুরু হওয়া পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হয় বা যতক্ষণ না প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীরা দায়িত্ব নিচ্ছেন অথবা এইডি সাময়িক ভাবে থামতে বলা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হয়। তা ছাড়া যে সিপিআর দিচ্ছেন, তিনি যদি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, সে ক্ষেত্রেও থেমে যেতে হয়।
সিপিআর। ছবি: সংগৃহীত
৪৫ মিনিট সিপিআর-এর পরেও বাঁচানো যায় না কেন?
সিপিআর কোনও জাদুকাঠি নয়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ, কত দ্রুত সিপিআর শুরু হয়েছে, হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ কেমন ছিল, ডিফিব্রিলেশন কত দ্রুত পাওয়া গিয়েছে এবং ব্যক্তির সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা — সবকিছুই ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে সিপিআরের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক শক, ওষুধ, শ্বাসনালির সাহায্য বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু বুকে চাপা দিয়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মূল কারণ সব সময়ে ঠিক করা সম্ভব নয়।
তবে সিপিআর দিতে ভয় পেলে তা রোগীর জন্য আরও বিপজ্জনক। সন্দেহজনক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় খবর দেওয়া, দ্রুত বুকের মাঝখানে চাপ দেওয়া এবং এইডি পাওয়া গেলে তার নির্দেশ মেনে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিপিআর হয়তো একা হৃৎপিণ্ড চালু করতে পারবে না, কিন্তু চিকিৎসা পৌঁছোনোর আগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিনিটে রক্ত চলাচল বজায় রাখতে পারে। আর সেই সময়টাই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।