অবসাদ মানেই ভেবে নেওয়া হয়, তা বড়দের ব্যাপার। মনোবিদেরা কিন্তু তা বলেন না। অবসাদ বা মানসিক চাপ তাড়া করে বেড়ায় ছোটদেরও। শৈশবের কোনও ভয়াল স্মৃতি থেকে যেমন অবসাদ আসতে পারে, তেমনই আশাপূরণ না হলেও তা থেকে অবসাদে ডুবে যেতে পারে ছোটরা। ‘অ্যাডোলেসেন্ট ডিপ্রেশন’ নতুন কিছু নয়, তবে ইদানীং তার প্রকোপ বেড়েছে। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বাসনায় ছোটরা এর শিকার হচ্ছে সহজেই। সন্তান সব বিষয়ে এগিয়ে, তবুও সে কেন উদাস থাকে, তার তল পাচ্ছেন না বাবা-মায়েরা। কেন এমন হচ্ছে, এর থেকে উত্তরণের পথটিই বা কী, বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, যে শিশুটি পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেল, সে-ও ভুগছে মানসিক চাপে। উদাস থাকছে সর্বক্ষণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই খুলে বসে রয়েছে। এর কারণ হল, পিছিয়ে পড়ার আতঙ্ক। প্রতিযোগিতায় সে সব সময়ে এগিয়ে থাকতে চায় অথবা সব কাজ নিখুঁত ভাবে করতে চায়। মনের এমন অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ক্লিনিক্যাল পারফেকশনিজ়ম’ বা ‘অ্যাডপটিভ পারফেকশনিজ়ম’। কিছু লক্ষণে তা বোঝা সম্ভব।
একই কাজ বার বার করা
পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়েও উদাস থাকা। সারাক্ষণ বই খুলে পড়াশোনা করার চেষ্টা করা, মনঃসংযোগের অভাব এর লক্ষণ হতে পারে। সব কাজ নিখুঁত করার তাড়না থেকে শিশুদের মধ্যে যে বিপুল মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়, তাকে ‘অ্যাকাডেমিক বার্নআউট’ বলে।
আরও পড়ুন:
কাজে ভুল হলেই আতঙ্ক
স্কুলে সেরা, খেলাধূলায় সব সময়ে এগিয়ে, এমন অনেক শিশুকেই দেখা যায়, তারা সামান্য ভুল করে ফেললেও ভয় বা আতঙ্কে ভোগে। যেন কোনও অপরাধ করে ফেলেছে। কোনও একটি পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে বা কখনও তার চেয়ে কেউ এগিয়ে গেলেই প্যানিক অ্যাটাক হয়। এমন লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হতে হবে।
ঘন ঘন মাথা ব্যথা বা পেট ব্যথার কথা বলা
শরীর সুস্থ থাকা সত্ত্বেও বার বার মাথা ব্যথার কথা বলা। পরীক্ষার আগে ভয় বা পেটে ব্যথা, এসবই ‘অ্যাংজ়াইটি ডিজ়অর্ডার’-এর লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় শিশুরা তাদের ভিতরের উদ্বেগ বা মানসিক চাপ মুখে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে শরীর খারাপের অজুহাত দেয়। স্কুলের পরীক্ষা বা কোনও বড় ইভেন্টের আগে শিশু যদি প্রায়ই মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা বা এই ধরনের শারীরিক সমস্যার কথা বলে, সকলের সামনে যেতে ভয় পায়, তা হলে সাবধান হতে হবে।
স্কুল থেকে ফিরেই রাগারাগি
গবেষকেরা বলছেন, সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে কিশোর-কিশোরী বা বয়ঃসন্ধি পর্বের ছেলেমেয়েরা বাড়িতে বেশি রাগারাগি, তর্ক করে অথচ স্কুলে তারা যথেষ্টই শান্ত থাকে। এমনও দেখা গিয়েছে, স্কুলে সকলের চেয়ে এগিয়ে থাকা, ধীরস্থির ছাত্র বা ছাত্রীটি বাড়ি ফিরেই কান্নাকাটি, রাগারাগি করছে কোনও কারণ ছাড়াই। বাবা-মায়ের অবাধ্য হচ্ছে, এমনকি জিনিসপত্র ভাঙচুরও করছে। এমন লক্ষণ প্রবল মানসিক চাপ বা অবসাদের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
নিজেকে নিয়ে সর্বক্ষণ ঠাট্টা
শিশু যদি প্রায়শই নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করে, নিজের সমালোচনা করতে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, মানসিক চাপ থেকে তার আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হচ্ছে। যে কোনও কাজ করার আগেই ভয় পাওয়া, পিছিয়ে যাওয়া, নিজেকে খাটো করে দেখা হীনম্মন্যতার লক্ষণ।
একা থাকার ইচ্ছা
সামাজিক ভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা একাকিত্বের অনুভূতি ছোট থেকেই হলে সাবধান হতে হবে। সন্তান হয়তো পড়াশোনায় আগের মতোই ভাল করছে, কিন্তু ধীরে ধীরে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দিচ্ছে। খেলাধূলায় বা নিজের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারাচ্ছে। আত্মীয়-পরিজনের সামনে যেতে চাইছে না। সব সময়েই পড়াশোনায় ডুবে থাকতে চাইছে। এমন লক্ষণ দেখলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বাবা-মাকে।