বয়স ৩০ বা ৪০। অথচ শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই মুখে-গলায় বলিরেখা, ঝুলে পড়া থুতনি, কোমরের কাছে বাড়তে থাকা মেদ জানান দেয় যে ‘জৈবিক বয়স’ যা-ই হোক না কেন, আদতেই শরীরের বিভিন্ন পেশি ও কোষের বয়স বাড়ছে। হাঁটতে গেলে হাঁটুতে ব্যথা, কব্জির জোর কমছে, হাত দিয়ে কিছু ধরতে গেলেই টনটনিয়ে ওঠে আঙুল, সিঁড়ি ভাঙতে গেলে কষ্ট— শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিও যেন ষাটের বৃদ্ধের মতো আচরণ করছে। সত্যিই কি বার্ধক্য হানা দিচ্ছে সময়ের আগেই? চিকিৎসকেরা বলছেন, কিছু লক্ষণ খেয়াল করলেই তা বোঝা যাবে।
বয়সের আগেই কি বুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর?
ত্বকে বলিরেখা, কুঁচকে যাচ্ছে চামড়া
বয়স ৩০ পেরোতে না পেরোতেই চোখের কোণে, কপালে বা মুখের ত্বকে ফুটে উঠছে বলিরেখা। কুঁচকে যাচ্ছে গাল ও গলার কাছের চামড়াও। ঝুলে পড়ছে থুতনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘ডার্মাল ইলাস্টোসিস’। ত্বকের প্রোটিন কোলাজেন ও ইলাস্টিন ত্বককে টানটান ও মসৃণ রাখে। অতিরিক্ত অতিবেগনি রশ্মি, মানসিক চাপ এবং ধূমপানের কারণে টক্সিন তৈরি হয় যা এই প্রোটিনগুলিকে দ্রুত ভেঙে ফেলে। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক টানটান ভাব হারিয়ে ফেলে।
শুষ্ক ও নির্জীব ত্বক
শুষ্ক ত্বকের সমস্যা অনেকেরই থাকে। তবে যদি দেখা যায়, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজ়ার ব্যবহারের পরেও ত্বক সর্বদা খসখসে, শুষ্ক ও ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, কালচে ছোপ পড়ছে, তা হলে বুঝতে হবে ত্বক বুড়িয়ে যাচ্ছে। ফেশিয়াল করানোর পরেও যদি দেখা যায় ত্বকের জেল্লা ফিরছে না, তা হলে সেটি ‘এপিডার্মাল ডিহাইড্রেশন’-এর লক্ষণ। ত্বক আর নিজে থেকে কোষের পুনর্গঠন করতে পারছে না, ফলে মৃত কোষের মাত্রা বাড়ছে।
বয়সের তুলনায় পেশির ক্ষয় ও মেদ বৃদ্ধি
শরীরের বিভিন্ন অংশে পেশির শক্তি কমে যাওয়া এবং তলপেটে বা শরীরের মধ্যভাগে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়াও অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ হতে পারে। শরীর ফুলছে না, অথচ পেট, কোমর ও তলপেটে অতিরিক্ত চর্বি জমে চেহারার গড়ন বদলে যাচ্ছে, তা হলে সেটি ‘প্রিম্যাচিয়োর সার্কোপেনিয়া’-র লক্ষণ। পেশির ক্ষয় হতে হতে এমন অবস্থা তৈরি হয়। খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম, প্রোটিনের অভাব এবং কায়িক শ্রম কম করার কারণে ৩০ বা ৪০ বছর বয়সেই পেশি দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে এবং ইনসুলিন হরমোনের তারতম্য ঘটে মেদ জমতে থাকে।
হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া
সামান্য হাঁটাচলা বা কাজ করলেই হাঁটু, কোমর বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা অনুভব হওয়া এবং শরীরের হাড় দুর্বল হয়ে পড়াও অকাল বার্ধক্যের লক্ষণগুলির মধ্যে একটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘অস্টিয়োপেনিয়া’। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ক্যালশিয়াম, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকে।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস
কিছুই মনে থাকছে না? সদ্য ঘটা ঘটনাও বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন? মনঃসংযোগ হারাচ্ছেন প্রায়ই। এইসব লক্ষণই ‘ব্রেন ফগ’-এর কারণে হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং মস্তিষ্কে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহের কারণে স্নায়ুর ক্ষতি হয়। যার প্রভাব পড়ে স্মৃতিশক্তিতে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শরীরের কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া (যেটিকে কোষের শক্তিঘর বলা হয়) যখন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না এবং শরীরে মেলাটোনিন ও গ্রোথ হরমোনের উৎপাদন কমতে থাকে, তখন এইসব সমস্যা দেখা দিতে থাকে। অকাল বার্ধক্যের কারণে কোষের শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে।