শৈশবের কোনও ভয়াল স্মৃতি বা মানসিক আঘাত শুধু শৈশবেই থমকে থাকে না। মানুষের মনের গঠন এতটাই জটিল যে, শৈশবের অবচেতনে জমা হওয়া ভয় অনেক সময় বয়ঃসন্ধি পর্বে এসে তীব্র রূপ নেয়। সেই আতঙ্কের জেরে বদল আসতে পারে হরমোন ক্ষরণে, এমনকি ভাবনাচিন্তার স্তরেও পরিবর্তন হতে পারে। দেখা দিতে পারে আচরণগত সমস্যা। এই বিষয়টি নিয়েই গবেষণা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সেন্টার অন দ্য ডেভলপিং চাইল্ড বিভাগে। সন্তানের যদি এমন সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে কী ভাবে সামলাবেন, জানিয়েছেন গবেষকেরা।
শিশুদের মানসিক সমস্যা আগে ছিল না তেমনটা নয়, তবে ইদানীং তা আরও জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ, ছোটরা ডিজিটাল মাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়েছে। টিভির পর্দায়, ভিডিয়ো গেমের জগতে, এমনকি পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে তারা নানা ভাবে হিংসার মুখোমুখি হচ্ছে। যৌন নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে। সেই সব স্মৃতি পরবর্তী সময়ে গিয়ে ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজ়অর্ডার’-এর কারণ হয়ে উঠছে।
শৈশবের খারাপ স্মৃতি কী প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কে?
ছোটবেলায় যৌন নির্যাতনের শিকার হলে অথবা অন্যকে হতে দেখলে, সেই স্মৃতি অবচেতনে থেকে যায়। হার্ভার্ডের গবেষকেরা বলছেন, শৈশবের খারাপ কিছু স্মৃতি বা ভয় অথবা আতঙ্কের স্মৃতি মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অংশে বহু বছর অবধি সংরক্ষিত থাকে। মাঝেমধ্যেই তা দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে, যা শিশুর স্নায়বিক গঠনে বদল আনতে পারে। অ্যামিগডালা হল মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা ভয়, আতঙ্কের কারণ বুঝে সেই মতো অনুভূতি প্রকাশ করে। এই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’। কোনও ট্রমা-র পরে প্রায় প্রত্যেক মানুষই নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন, যা কিছু দিন পরে কেটে যায়। কিন্তু শৈশবে এমন ঘটলে, তা সহজে চেতনা থেকে অবলুপ্ত হয় না। পরবর্তীতে তা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা এবং প্যানিক ডিজ়অর্ডারের কারণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
ভয়ের কারণে শরীর থেকে ক্রমাগত কর্টিসল নিঃসৃত হতে থাকে। অতিরিক্ত কর্টিসল হিপ্পোক্যাম্পাসের কোষগুলির ক্ষতি করে। ফলে হিপ্পোক্যাম্পাসের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয়ে যায়। এমন হলে মনোযোগের অভাব, স্মৃতিনাশের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবহারেও বদল আসতে পারে।
শৈশবের ট্রমার কারণে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে বদল আসতে পারে। এই অংশটি বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। শৈশবের ট্রমার কারণে এই অংশের বিকাশ ধীর হয়ে যায় এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা ও আয়তন হ্রাস পায়। ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। কেউ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, আবার কেউ অল্পেই ভেঙে পড়েন, কোনও কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়, আবেগের বশে ভুলভ্রান্তি হতে থাকে। আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়। মেজাজের ঘন ঘন বদল হতে থাকে। এর কারণে আচরণগত সমস্যাও দেখা দেয়। হিংসাত্মক মনোবৃত্তিও আসতে পারে।
এই বিষয়ে মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের মত, ‘‘শৈশবের ভয় বা আতঙ্ক অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমান ভাবে ঘটে না। শৈশবে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বা আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাবোধের উপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালে, যখন শারীরিক, হরমোনজনিত ও সামাজিক পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটে, তখন শৈশবের সেই স্মৃতিগুলি নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এর প্রকাশ হতে পারে অবসাদ, উদ্বেগ, অতিরিক্ত ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব, সম্পর্কের জটিলতা, বা অতীতের ঘটনার অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে।’’ তবে শৈশবের ট্রমা থাকলেই যে অবসাদ বা অন্য কোনও মানসিক রোগ অনিবার্য, এমন নয়। পারিবারিক সমর্থন, ইতিবাচক সম্পর্ক বা পরিবারের লোকজনের সহযোগিতা পেলে এই সমস্যা থেকেও উত্তরণ সম্ভব বলেই মনে করছেন মনোবিদ।
শিশুর মানসিক গঠনের প্রথম ধাপ তৈরি হয় বাড়ি থেকেই। তাই সতর্ক থাকতে হবে অভিভাবককেও। শিশুদের গড় বয়স যখন আট থেকে তেরো বা পনেরো, তাদের মনের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন চলে। নানা কারণে তাদের মধ্যে যদি উদ্বেগ, অবসাদ, ট্রমা, ফোবিয়া দেখা যায়, তা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।