বর্ষা এলেই পেটের নানা রোগ মাথাচাড়া দেয়। পেট গুড়গুড়, তলপেটে ব্যথা, পেট ফেঁপে ওঠা আর পেট খারাপের সমস্যা তো চলতেই থাকে। চিকিৎসকেরা বলেন, বর্ষার সময়ে পেটের গোলমালের মূল কারণ হল বাতাসের আর্দ্রতা ও দূষিত জল বা খাবার থেকে ছড়ানো ব্যাক্টেরিয়া। এখন মনে হতেই পারে, সুস্থ থাকতে রাস্তার খাবার খাচ্ছেন না, শরবত বা নরম পানীয়েও ইতি টেনেছেন, তার পরেও কেন পেটের গোলমাল সারছে না। এর কারণই হল রোজের কিছু ছোট ছোট ভুল যার সূত্রপাত হয় হেঁশেলেই। আর এই ভুলেরই মাশুল গুনতে হয় রোজ। পেটের অসুখ সারতে চায় না, এমনকি বাড়ির খাবার থেকে বিষক্রিয়াও হয়।
হেঁশেলের কোন ভুলগুলির কারণে পেটে সংক্রমণ হতে পারে?
ভিজে স্পঞ্জ বা তোয়ালে
রান্নাঘরের বাসন মাজার স্পঞ্জটি কত লক্ষ-কোটি ব্যাক্টেরিয়ার আঁতুড়ঘর, তা কি জানেন? বাসন মাজার পরে বা রান্নাঘরের তাক পরিষ্কারের পরে স্পঞ্জ বা তোয়ালে ঠিকমতো সাবানজলে ধোয়া হয় না অনেক সময়েই। সেটি ভিজে অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হয়। ফলে ফের ব্যবহারের সময়ে এতে থাকা নানা রকম ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস থালাবাসনে লেগে যায় এবং খাবারের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে পড়ে। এমন অপরিষ্কার স্পঞ্জ থেকে ডায়েরিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া, বমি ও পেটের সংক্রমণ হতে পারে।
কাঁচা ও রান্না করা খাবার একই ছুরিতে কাটা
রান্নাঘরের ছুরিটিও রোগজীবাণুর উৎস। তাড়াহুড়োয় অনেকেই একই ছুরি দিয়ে কাঁচা আনাজ এবং কাঁচা মাছ বা মাংস কাটেন। আবার সেই ছুরি দিয়েই পাউরুটি বা রান্না করার কোনও খাবার কাটা হয়। ফলে জীবাণুর আদানপ্রদাহ সহজেই ঘটে। একে বলা হয় ‘ক্রস-কন্ট্যামিনেশন’। আবার চপিং বোর্ড ঠিকমতো পরিষ্কার না করে বারবার ব্যবহার করলে তার থেকেও ব্যাক্টেরিয়া ছড়াতে পারে।
আরও পড়ুন:
ডাস্টবিন খুলে রাখা
রান্নাঘরের ডাস্টবিন ঢাকনা দিয়ে না রাখা বা কয়েক দিন ধরে পচা আবর্জনা জমিয়ে রাখার অভ্যাসে সংক্রমণ ঘটতে পারে। পচা আবর্জনায় ব্যাক্টেরিয়া ও ছত্রাকের বংশবৃদ্ধি দ্রুত ঘটে। এর থেকে ঘন ঘন ডায়েরিয়া, কলেরা ও সংক্রামক রোগও হানা দিতে পারে।
কাঁচা সব্জি ভাল করে না-ধুয়ে রান্না
বর্ষার সময়ে কাঁচা আনাজে নানা রকম ব্যাক্টেরিয়া জন্মায়। শাকপাতায় পোকামাকড়ের ডিম থাকে। তা ছাড়া এখন কীটনাশক ও কৃত্রিম রঙের যা উৎপাত, তাতে সব্জি ঠিকমতো না-ধুয়ে রান্না করলে পেটের রোগ হবেই। কাঁচা সব্জি ভাল করে নুন-জলে ধুতে হবে বা ভিনিগার মেশানো জলে ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার করতে হবে। তার পর রান্না করতে হবে। না হলে ফিতাকৃমির সংক্রমণ বা আমাশয় হতে পারে।
একই তেল বার বার
ভাজাভুজি বা মাছ ভাজার পরে সেই তেল রেখে দেন অনেকেই। পরে ফের সেই তেলে রান্না করা হয়। বার বার একই তেলের ব্যবহার করলে তা থেকে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, লিভারের রোগ হতে পারে। তেল বার বার উচ্চ তাপমাত্রায় ফোটালে তার উপাদান ভেঙে যায় ও টক্সিন তৈরি হয়। এর সঙ্গে শুরু হয় ‘লিপিড পারক্সিডেশন’ প্রক্রিয়া, যার কারণে তেলের সঙ্গে বাতাসের জলীয় বাষ্প মিশে গিয়ে এই ভাঙনপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তোলে। আরও বেশি পরিমাণে দূষিত পদার্থ তৈরি হতে থাকে।
রান্নার পরেই গরম খাবার ঢেকে রাখা
খুব গরম খাবার কড়া থেকে নামিয়েই বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে বা পুরোপুরি ঢাকনা দিয়ে আটকে দিলে ভিতরের বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ঢাকনার ভিতরের অংশে জলকণা হিসাবে জমা হয়। এই জল ফের খাবারে গিয়ে মেশে। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় এমন জলকণায় জীবাণু জন্মাতে পারে যা অল্প সময়ের মধ্যেই খাবার পচিয়ে দেয়।
অপরিষ্কার কৌটোতেই মশলা ঢালা
হলুদ, লঙ্কা বা জিরেগুঁড়োর কৌটো পুরোপুরি খালি ও পরিষ্কার না করে, নীচে জমে থাকা পুরনো মশলার গুঁড়োর উপরেই নতুন মশলা ঢেলে রাখেন অনেকে। কৌটোর নীচে জমে থাকা পুরনো মশলায় অনেক সময়েই ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটে যা দেখে বোঝা যায় না। এমন ভাবে মশলা সংরক্ষণ করলে তা থেকে পেটে বিষক্রিয়া হতে বাধ্য।