এককালে পুষ্টির অভাব ছিল ভারতীয়দের সমস্যা। এ যুগে তার সঙ্গে জুড়েছে আর এক নতুন বিপদ। মানুষ এখন বেশি খেয়ে অতিমাত্রায় স্থূল হয়ে পড়ছে। তার জেরে শরীরে বাসা বাঁধছে নানা জটিল রোগ। এ দিকে আশপাশে নজর করলে দেখা যাচ্ছে, সবাই ‘ডায়েট মেনটেন’ করছেন। চারপাশের মানুষজন সকলেই প্রায় ‘স্বাস্থ্যসচেতন’। তাঁরা নিয়ম করে প্রোটিন রাখছেন খাবারে। যাতে পেশি, হাড় এবং সার্বিক স্বাস্থ্য ভাল থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনও লাভ হচ্ছে না কেন?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল এক সংস্থা। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন শ্রেণির ২০০০ ভারতীয়ের সঙ্গে কথা বলে চালানো হয়েছিল ওই সমীক্ষা, যার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘ইন্ডিয়া’জ় প্রোটিন প্যারাডক্স’ নামের এক রিপোর্টে। কী বলছে সেই রিপোর্ট?
‘পাল্সএআই রিসার্চ’-এর ওই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ভারতীয়েরা প্রোটিন খাওয়ার ব্যাপারে এক অদ্ভুত অর্ধসত্যের দুনিয়া বা ‘প্যারাডক্স’-এ বাস করছেন। তাঁরা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়ায় গুরুত্ব দিলেও প্রোটিনের কাজ এবং তার খাওয়ার নিয়ম নিয়ে বেশ বিভ্রান্ত।
রিপোর্টের মূল বক্তব্য
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রতি ২ জনের মধ্যে এক জন ভারতীয়, তাঁদের প্রতিদিনের এবং প্রতিবেলার খাবারে নিয়ম করে প্রোটিন রাখার চেষ্টা করছেন। ৪১ শতাংশ মানুষ হিসাব রাখছেন, তাঁরা প্রতিদিন কতখানি প্রোটিন খাচ্ছেন, ৫০ শতাংশ মানুষ খাবার কেনার আগে প্যাকেটের পুষ্টির তালিকা বা লেবেলও যাচাই করছেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও গোড়ায় গলদ থেকে যাচ্ছে। কারণ, সমীক্ষায় লব্ধ তথ্য বলছে, নিয়মিত প্রোটিনের হিসাব যাঁরা রাখছেন, তাঁদের মধ্যে ৯৩ শতাংশেরই প্রোটিন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। এঁরা প্রোটিনের দৈনন্দিন চাহিদা নিয়েও কিছুটা বিভ্রান্ত। ফলে তথাকথিত স্বাস্থ্যসচেতনেরা হয়তো ভাবছেন, তাঁরা সঠিক খাবার খাচ্ছেন, কিন্তু না-জানার কারণে শরীর যথাযথ পুষ্টি পাচ্ছে না।
এ দেশে মানুষ প্রোটিন কী ভাবে খান?
১। ৫০ শতাংশ মানুষ প্রোটিনের জন্য প্রোটিন পাউডার বা সাপ্লিমেন্টের বদলে ডাল, দুগ্ধজাত খাবার ও বাদামের মতো প্রাকৃতিক খাবারে বেশি ভরসা করেন। এমনকি, যাঁরা আমিষভোজী, তাঁদের ৩১.৪ শতাংশ সারাদিনের প্রোটিনের জন্য ভরসা করেন নিরামিষ খাবারেই।
২। ১৯ শতাংশ মানুষ খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সঠিক পরামর্শের জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের কাছে যান। বাকি অধিকাংশ ইন্টারনেটে নিজেরাই গবেষণা করে বা সমাজমাধ্যমে দেখা নানা পরামর্শ মেনে নিজেদের খাদ্যতালিকা ঠিক করেন, যা বিভ্রান্তির মূল কারণ।
৩। ৭১ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, প্রোটিনযুক্ত খাবার কেনা এবং খাওয়া খুব বেশি ব্যায়সাধ্য নয়। অর্থাৎ দেশে প্রোটিন না পাওয়ার মূলে আর্থিক অনটন বা অভাবের সমস্যা নেই।
কী জানা জরুরি?
প্রোটিন শরীরের পেশিগঠন, হরমোন নিঃসরণ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অতি জরুরি এক পুষ্টি-উপাদান। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ-এর পরামর্শ মানলে এক জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ০.৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গড়ে এক জন ভারতীয় দিনে মাত্র ০.৬ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে দেশে অপুষ্টি ও স্থূলতা—এই দুই ধরনের সমস্যাই থেকে যাচ্ছে।
সমাধানের উপায়
সচেতনতা তৈরি: সমাজমাধ্যমের তথ্য বা মনগড়া তথ্যের উপর নির্ভর না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদদের পরামর্শ নিয়ে প্রোটিন গ্রহণের অভ্যাস করতে হবে।
প্যাকেজিং: খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেটে পুষ্টির তথ্য যেন আরও সহজ ভাষায় লেখা থাকে, যাতে সাধারণ মানুষ প্রোটিনের প্রকৃত পরিমাণ সহজে বুঝতে পারেন। তবে এর দায়িত্ব নিতে হবে খাদ্য সুরক্ষা বিভাগকে। প্যাকেজিং থেকে যথাযথ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে গ্রাহককেও।
স্থানীয় খাবারে জোর: খাদ্যতালিকায় প্রতিদিনের ডাল ও দুধের পাশাপাশি ছাতু, সয়াবিন, দই, পনিরের মতো সহজলভ্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সঠিক পরিমাণে রাখা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক উদ্যোগ: সরকারি ও সামাজিক স্তরে প্রোটিন সম্পর্কে প্রচার চালিয়ে জনগণের ভুল ধারণা দূর করাও জরুরি। তবে সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে প্রশাসনকে।