চোখ নিয়ে অধিকাংশ মানুষ যতটা সচেতন ততটা গুরুত্ব পায় না কান। অথচ শুধু শোনা নয়, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে কানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোখ-নাক গলার মতো কানেও সংক্রমণ হতে পারে। অধিকাংশ সময়ে কানের ব্যথা মাথার দিকে ছড়িয়ে পড়ে, কখনও চোয়ালের দিকে। কানে ব্যথায় বেশ কিছু ঘরোয়া উপশম আছে, কিন্তু বারবার সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভাল।
কান ব্যথা কেন হয়?
শীতের শুরুতে, শীতের পরে, গরমের শুরুতে এবং বর্ষায়, অর্থাৎ ঋতু পরিবর্তনের সময়ে কানে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এই সময়ে সর্দি-কাশি বেশি হয়। সর্দি কাশি বা ঠান্ডা লাগলে কানে ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এই ব্যাপারে ইএনটি স্পেশ্যালিস্ট ডা. অর্জুন দাশগুপ্ত বললেন, “বাইরের সঙ্গে দেহের অভ্যন্তরের চাপের সামঞ্জস্য রাখতে সাহায্য করে কানের মধ্যে থাকা বিশেষ একটি টিউব। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ইউস্টেশিয়ান টিউব। নাক এবং কানের সঙ্গে যুক্ত থাকে এই টিউব। নাক দিয়ে হাওয়া প্রবেশ করে এই টিউবের মাধ্যমে মধ্যকর্ণের অংশ ভরাট করে দেয়। এই জন্য যাঁদের বারবার ঠান্ডা লাগে বা সাইনুসাইটিসের সমস্যা আছে, সেটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে কানে সংক্রমণ হয়ে ব্যথা হয়। বারবার সংক্রমণে কানের পিছনে পুঁজ জমে। কোনও এক সময়ে পর্দা ফেটে পুঁজ বেরিয়ে আসে। এতে কানের পর্দায় ছিদ্র তৈরি হয়।” বেশির ভাগ সময়ে ছিদ্র নিজে থেকে জুড়ে যায়। কখনও কখনও আবার জোড়ে না। কানের এই সংক্রমণ আসলে ন্যাজ়াল ইনফেকশন বা নাকের সংক্রমণের ফলাফল। এই সমস্যা বয়স্কদের চেয়ে বেশি হয় বাচ্চাদের। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউস্টেশিয়ান টিউবের মধ্যে অ্যাঙ্গল তৈরি হয়, তাতে নিজে থেকেই সংক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়।
ছোটদের ক্ষেত্রে বেশি অ্যাঙ্গল থাকে না, টিউবটি আকারে ছোট, চওড়া ও প্রায় সোজা হয়। ফলে সংক্রমণ বেশি হয়। বোতলে দুধ খাওয়ানোর সময়ে বাচ্চাদের মাথা সমতলে থাকলে নাকের মাধ্যমে এই টিউব দিয়ে দুধ মধ্যকর্ণে ঢুকে যায়। পরে তা সংক্রমিত হয়ে পুঁজ তৈরি করে। তাই বাচ্চার মাথা একটু উঁচু করে রাখলে জল, দুধ কানে ঢোকার সম্ভাবনা কম থাকে। অনেকেই ঘনঘন কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করেন। সেটা বেশ বিপজ্জনক। প্রত্যেকের কানেই ওয়্যাক্সের স্তর থাকে, যা কানের ভিতরকে বাইরের ধুলোবালি থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ঘন ঘন কান খোঁচালে সেই স্তর নষ্ট হয়ে গিয়ে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়।
ঠান্ডা লাগা বা সর্দি-কাশির বাইরে কানে ব্যথা টেম্পরোম্যান্ডিবুলার ডিসফাংশনের জন্যও হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর প্রাথমিক লক্ষণ কানে ব্যথা। মাথার খুলির সঙ্গে নীচের চোয়ালকে (ম্যান্ডিবল) যুক্ত করে টেম্পরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট। মাথার দু’দিকেই কানের সামনের দিকে এই জয়েন্ট থাকে। “টেম্পরোম্যান্ডিবুলার ডিসফাংশন রোগ নয়, বরং রোগের উপসর্গ বলা যায়। কানে ব্যথার পাশাপাশি এক দিকের কপালে, ঘাড়ে, মুখে ব্যথা এই সমস্যার লক্ষণ,” বললেন ডা. দাশগুপ্ত।
অনেক সময়ে দাঁতের সমস্যা থেকেও কানে ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে মুখ হাঁ করিয়ে যদি দাঁতের চিকিৎসা চলে, তার পরেও এই সমস্যার সম্ভাবনা থাকে। মটর ভাজা, আখ, পেয়ারা, মাংসের হাড় ইত্যাদি শক্ত খাবার চিবোতে গিয়েও ব্যথা লাগে।
উপশম
কানের ব্যথা উপশমে অল্প করে গরম সেঁক দেওয়া যেতে পারে বা গরম জলের ভাপ নেওয়া যেতে পারে। এতে আরাম পাওয়া যায়, ব্যথা কমে। তবে ব্যথা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভাল। ব্যথার কারণ বুঝে চিকিৎসা করুন। তবে ব্যথা কমাতে গরম তেল কানের ভিতরে দেবেন না। কানের ভিতরে ইয়ারবাড বা কোনও কিছু দিয়ে খোঁচাখুচি করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।