Advertisement
E-Paper

বয়স যেন বাধা না হয় মাতৃত্বে! ভ্রূণ না কি ডিম্বাণু, কোনটি সংরক্ষণ করা বেশি সুবিধার? খরচই বা কত?

ধরা থাক মাতৃত্বের সময়। বয়স যতই বাড়ুক না কেন। দেরিতে মা হতে চাইছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই ডিম্বাণু সংরক্ষণের রথে হাঁটছেন। কেউ আরও কয়েক কদম এগিয়ে ভ্রূণ হিমায়িত করার পথটিও বেছে নিচ্ছেন। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কোনটি এগিয়ে?

চৈতালী চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৬ অগস্ট ২০২৬ ০৮:৫৬
Egg Freezing vs Embryo Freezing, How to Choose the Right Option

ডিম্বাণু সংরক্ষণ না ভ্রূণ সংরক্ষণ, কোনটি কাদের জন্য ভাল, পদ্ধতি ও খরচ জেনে নিন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগের কয়েক মুহূর্ত। গ্রিনরুমে মার্কিন কংগ্রেসের জনপ্রিয় নেত্রী আলেকজ়ান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো কোর্তেজ় তখন অন্য কাজে ব্যস্ত। পেট ও ঊরুর চামড়ার নীচে তিনি তখন হরমোন ইঞ্জেকশন নিচ্ছেন আর তার ভিডিয়োও বানাচ্ছেন। সে ভিডিয়ো এখন সমাজমাধ্যমের অলিগলিতে ঘুরছে এবং সেই সঙ্গে আলেকজ়ান্দ্রিয়ার বলা কয়েকটি কথাও নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। ডাকাবুকো ডেমোক্র্যাট নেত্রী জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে এনে স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্যই ওই ইঞ্জেকশন এবং তিনি এখনই তাঁর পেশাগত দায়িত্ব ছেড়ে মা হতে রাজি নন। এটি তাঁর জীবনের উপর তাঁরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই। মা হওয়ার সময়টিকে আগলে রাখছেন উপযুক্ত সময়েরই জন্য।

পেটে হরমোন ইঞ্জেকশন নিচ্ছেন আলেকজ়ান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো কোর্তেজ়।

পেটে হরমোন ইঞ্জেকশন নিচ্ছেন আলেকজ়ান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো কোর্তেজ়।

ডিম্বাণু সংরক্ষণ নিয়ে আলেকজ়ান্দ্রিয়া যে প্রথম কথা বলেছেন, তা নয়। প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, কৃতি সেনন, মৃণাল ঠাকুর, মোনা সিংহ থেকে কিম কার্দশিয়ন, এমা রবার্টস, অলিভিয়া মুনের মতো অনেক তারকাই বেশি বয়সে মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করিয়েছেন বা করানোর কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন। শুধু ডিম্বাণু সংরক্ষণ নয়, আরও কয়েক কদম এগিয়ে ভ্রূণ সংরক্ষণ করানোর সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন অনেক মহিলাই। ডিম্বাণু সংরক্ষণ সঠিক সিদ্ধান্ত, না ভ্রূণ সংরক্ষণ, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ডিম্বাণু সংরক্ষণ নিয়ে যদিও বা আলোচনা বেশি হয়, ভ্রূণ তৈরি করে তা হিমায়িত করার পদ্ধতি কতটা নিরাপদ বা যুক্তিযুক্ত, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের মনেই। অথচ কলকাতা শহরেই তা হচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ফার্টিলিটি ক্লিনিকে। সন্তানধারণ করতে চাওয়া বা না চাওয়া অথবা দেরিতে চাওয়া, এখন আর বয়সের ঘড়ির উপর নির্ভরশীল নয়। মাতৃত্বের সময়কে ধরেবেঁধে রাখারও প্রযুক্তি চলে এসেছে।

ডিম্বাণু সংরক্ষণ বনাম ভ্রূণ সংরক্ষণ— কাদের জন্য কোনটি?

পুরুষের শরীরে প্রায় সারাজীবনই নতুন শুক্রাণু তৈরি হয়, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ আলাদা। একটি মেয়ে জন্মায় তার শরীরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়েই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে একটি একটি করে। চাইলেন আর মা হয়ে গেলেন, ব্যাপারটা কিন্তু অত সহজ নয়। আসলে ৩০-এর পর থেকে মেয়েদের শরীরে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমতে থাকে। ৩৫-এর পর সন্তানধারণের সম্ভাবনা দ্রুত কমে যেতে থাকে। গর্ভধারণ করলেও হরমোনের গোলমালের জন্য গর্ভপাতের আশঙ্কা বাড়ে। আবার ডিম্বাণুর গুণমান ভাল না হলে সন্তান শরীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মাতে পারে। বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে মায়ের স্বাস্থ্যও। সে ক্ষেত্রে প্রেগন্যান্সিও জটিল হয়ে পড়ে। সময়ের আগে জন্মালে শিশুর ওজন কম হতে পারে। তাই চিকিৎসকেরা বলেন, ৩০ বছর বয়সই মা হওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আর ৩৫ হল মাতৃত্বের ডেডলাইন। কিন্তু ডিম্বাণুর সংখ্যা বা গুণমান কমে যাওয়ার আগেই যদি তা সংরক্ষণ করে রাখা যায়, তা হলে বেশি বয়সেও মাতৃত্ব নিরাপদ হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। আর ভ্রূণ সংরক্ষণ হল আরও কয়েক কদম এগিয়ে মায়ের ডিম্বাণু ও বাবার শুক্রাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করে বেশ কয়েক বছরের জন্য তা হিমায়িত করে রাখা। এতে মাতৃত্বের দিকে আরও একটা ধাপ এগিয়ে থাকা যায়।

ডিম্বাণু সংরক্ষণের পদ্ধতি জটিল।

ডিম্বাণু সংরক্ষণের পদ্ধতি জটিল।

এই বিষয়ে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ও বন্ধ্যাত্ব বিষয়ক চিকিৎসক অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মত, ‘‘যাঁরা এখনই বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না, কিন্তু ভবিষ্যতে নিজের ডিম্বাণু ব্যবহার করে মা হতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। আবার ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে অথবা অস্ত্রোপচার করে জরায়ু বাদ দিতে হতে পারে, এমন সম্ভাবনা থাকলেও এগ ফ্রিজ়িং বা ডিম্বাণু সংরক্ষণ কার্যকর হতে পারে। আবার যে দম্পতি দেরিতে সন্তান নিতে চান, তাঁরা সময় থাকতে আইভিএফ পদ্ধতিতে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ হিমায়িত করে রাখতে পারেন ভবিষ্যতের জন্য। এ ক্ষেত্রে সাফল্যের হার আরও বেশি। সংরক্ষিত ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও, ভ্রূণের ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। ’’

কাদের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ উপযুক্ত?

১) যাঁরা বিয়ে করেননি, সঠিক জীবনসঙ্গীর খোঁজে রয়েছেন বা দেরিতে মা হতে চান, তাঁরা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করিয়ে রাখতে পারেন।

২) চিকিৎসকের কথায়, কম বয়সেই প্রজননক্ষমতা কমছে যাঁদের, হরমোনের গোলমালের কারণে ডিম্বাণুর সংখ্যা কম ও গুণগত মান খারাপ, তাঁদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প এগ ফ্রিজ়িং।

ডিম্বাণু সংরক্ষণ বনাম ভ্রূণ সংরক্ষণ— মাতৃত্বের সময়কে বেঁধে ফেলার প্রযুক্তির এখন হাতের মুঠোয়।

ডিম্বাণু সংরক্ষণ বনাম ভ্রূণ সংরক্ষণ— মাতৃত্বের সময়কে বেঁধে ফেলার প্রযুক্তির এখন হাতের মুঠোয়।

৩) ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপি চললে জরায়ুর ধারণক্ষমতা কমে যায়, সুস্থ কোষগুলি নষ্ট হতে থাকে, ফলে সে ক্ষেত্রে আগে থেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করিয়ে রাখলে পরে আইভিএফ পদ্ধতিতে মা হওয়া সম্ভব।

৪) পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিয়োসিসের সমস্যা রয়েছে যাঁদের, অথবা পরিবারে কম বয়সে রজোনিবৃত্তি হয়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ উপযুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা এলেও মা হওয়ায় বাধা তেমন থাকবে না।

ভ্রূণ সংরক্ষণ কাদের জন্য সঠিক?

১) বিবাহিত দম্পতি বা সঙ্গী রয়েছেন, এমন মহিলা যিনি বর্তমানে সন্তান নিতে চান না, অথচ ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তিনি সময় থাকতেই ভ্রূণ সংরক্ষণ করিয়ে রাখতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে মাতৃত্বের পথটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত হবে।

২) ক্যানসার চিকিৎসায় জরায়ুর ক্ষতি হয়েছে বা জরায়ু বাদ দিতে হতে পারে, এমন মহিলাদের জন্য ভ্রূণ সংরক্ষণ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। জমিয়ে রাখা ডিম্বাণু নির্ধারিত সময়ের পরে নষ্ট হলেও হিমায়িত ভ্রূণ দীর্ঘসময় সংরক্ষিত রাখা যায়।

বাবার থেকে নেওয়া শুক্রাণু ও মায়ের ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয় গবেষণাগারে।

বাবার থেকে নেওয়া শুক্রাণু ও মায়ের ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয় গবেষণাগারে।

২) শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা গুণগত মান কমছে, এমন পুরুষেরা সময় থাকতেই তাঁদের শুক্রাণু ও সঙ্গীর ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করে সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন।

৩) পরিবারে জিনগত রোগের ইতিহাস থাকলে, আইভিএফ পদ্ধতিতে ভ্রূণ তৈরি করে তার জিনগত স্ক্রিনিং করানো যেতে পারে। এমন একাধিক ভ্রূণ তৈরি করে সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। যে ভ্রূণটিতে জিনগত ত্রুটি থাকবে না, সেটি থেকেই পরবর্তী কালে সন্তানের জন্ম হতে পারে।

৪) আইভিএফ বার বার ব্যর্থ হচ্ছে যাঁদের অথবা গর্ভপাতের ঝুঁকি বেশি, তাঁরা একাধিক ভ্রূণ তৈরি করে সংরক্ষিত রাখতে পারেন। এতে এক বার গর্ভপাত হলে বা প্রথম বার আইভিএফ ব্যর্থ হলে, আরও কয়েক বার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তখন আর আইভিএফ করানোর ঝক্কি থাকবে না। সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকেই সন্তানের জন্ম দেওয়া যাবে।

৫) একের বেশি সন্তান চান যাঁরা অথচ বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাঁরা সময় থাকতে ভ্রূণ সংরক্ষণ করিয়ে রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর গুণমান কমে গেলে তা সংরক্ষণ করে লাভ হবে না। তাই ভ্রূণ সংরক্ষণ করাই বিকল্প উপায় হতে পারে।

ডিম্বাণু বা ভ্রূণ সংরক্ষণের উন্নত প্রযুক্তি এসে গিয়েছে।

ডিম্বাণু বা ভ্রূণ সংরক্ষণের উন্নত প্রযুক্তি এসে গিয়েছে।

ডিম্বাণু জমানো কঠিন, ভ্রূণ জমানো তুলনামূলক ভাবে সহজ

আসলে উল্টোটাই মনে হয়। বাস্তবে ‘ওসাইট ক্রায়োপ্রিজ়ারভেশন’ বা ডিম্বাণু জমানোর পদ্ধতি বেশি কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক। প্রথমে রক্তের কিছু পরীক্ষা করে দেখা হয় ডিম্বাণুর ‘কোয়ালিটি’ ও ‘কোয়ান্টিটি’ কেমন এবং জরায়ু সন্তানধারণের উপযুক্ত কি না। এর কোনওটিই না হলে তখন ডিম্বাণু সংরক্ষণ করিয়েও লাভ হবে না। সে জন্য আলট্রাসাউন্ড ও অ্যান্টি-মুলেরিয়ান টেস্ট’ বা ‘এএমএইচ টেস্ট’ করে নেওয়া হয় আগে। কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ চিকিৎসক ও রিজেনারেটিভ মেডিসিন নিয়ে গবেষণারত মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ডিম্বাণু সংরক্ষণের দু’টি সাইকেল রয়েছে— প্রথমত, ন্যাচারাল সাইকেল বা মেনস্ট্রুয়াল সাইক্‌ল, যেখানে প্রতি মাসে একটি মেয়ের যে ডিম্বাণু তৈরি হয় সেটিকে সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত প্রতি মাসে প্রত্যেক মেয়ের ১টি বা ২টি ডিম্বাণু তৈরি হয়, সেটি যোনিপথ দিয়ে বার করে ফ্রিজ় করে রাখা হয়। এই পদ্ধতি করে যেতে হয় ও এতে খরচও বেশি। ১টি বা ২টি ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

এগ ফ্রিজ়িংয়ের অনেকগুলি ধাপ রয়েছে, যা জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

এগ ফ্রিজ়িংয়ের অনেকগুলি ধাপ রয়েছে, যা জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল সাইক্‌ল, যেটি করার জন্য ন্যাচারাল সাইক্‌লটি বন্ধ করে ওষুধ ও হরমোন ইঞ্জেকশন (এফএসএইচ ও এলএইচ) দিয়ে ডিম্বাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। সাধারণত প্রায় ১০–১৪ দিন অন্তর হরমোন ইনঞ্জেকশন দিয়ে ডিম্বাশয়ে একাধিক ডিম্বাণু উৎপাদন করে তাকে পরিণত করে রাখার চেষ্টা করা হয়। এর পরে আলট্রাসাউন্ড করে যখন দেখা যায়, একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়েছে, তখন সেগুলি নিষ্কাশন করা হয় বিশেষ পদ্ধতিতে।

ডিম্বাণু নিষ্কাশনের পদ্ধতি জটিল। আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে সূক্ষ্ম সুচ যোনিপথ দিয়ে সোজা ডিম্বাশয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পরিপক্ব ডিম্বাণুগুলিকে বার করে নেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়। প্রতিটি ডিম্বাণুতে তরল ভর্তি থাকে। এই তরলে থাকে প্রোটিন ও ডিএনএ। তাই সেই সমেত ডিম্বাণু জমালে তরলটিও জমে বরফ হয়ে যাবে। ক্ষতি হবে ডিএনএ-র। তাই ডিম্বাণু থেকে তরল বার শুষে নেওয়া হয় এক বিশেষ পদ্ধতিতে, যার নাম ‘ভিট্রিফিকেশন’। এতে ডিম্বাণু থেকে দ্রুত জল বার করে ‘ক্রায়োপ্রোটেক্ট্যান্ট’ রাসায়নিক মিশিয়ে তরল নাইট্রোজেনে হিমাঙ্কের নীচে ১৯৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ডুবিয়ে রাখা হয়। এ ভাবে ১৫, ২০ বা ৩০ বছর অবধি সেগুলি একই ভাবে থাকতে পারে। কেবল বছর বছর তরল নাইট্রোজেন বদলে দিতে হয়।

ভ্রূণ সংরক্ষণ করলে মাতৃত্বের দিকে আরও একধাপ এগিয়েই থাকা যায়।

ভ্রূণ সংরক্ষণ করলে মাতৃত্বের দিকে আরও একধাপ এগিয়েই থাকা যায়।

জমিয়ে রাখা ডিম্বাণু কত দিন ভাল থাকবে, তা সেই মহিলার ডিম্বাণুর মান ও সংখ্যার উপর নির্ভর করবে। তবে ভ্রূণ সংরক্ষণে সে ভয় কম। একবারেই ডিম্বাণু ও শুক্রাণু সংগ্রহ করে আইভিএফ পদ্ধতিতে গবেষণাগারে নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করে তা হিমায়িত করা যাবে। এ ক্ষেত্রেও ‘ভিট্রিফিকেশন’ পদ্ধতিতে ভ্রূণ তরল নাইট্রোজেনে হিমাঙ্কের নীচে ১৯৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে রাখতে হয়।

প্রজননক্ষমতা কম, তা-ও সম্ভব ভ্রূণ সংরক্ষণ

স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের প্রজননক্ষমতা কম হলেও ভ্রূণ তৈরি করে সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব। এমব্রায়ো ফ্রিজ়িং বা ভ্রূণ সংরক্ষণের পদ্ধতি এখন এতটাই উন্নত যে, সন্তানধারণের পথে বন্ধ্যত্বও বাধা হতে পারে না। চিকিৎসক মল্লিনাথ জানালেন, স্বামীর বয়স যদি চল্লিশের বেশি হয় এবং তাঁর শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কম থাকে, তা হলে টেস্টিকুলার স্পার্ম অ্যাসকুলেশন (টেসা) পদ্ধতিতে সরাসরি শুক্রাশয় থেকে স্পার্ম বা শুক্রাণু সংগ্রহ করা হয়। এই শুক্রাণুগুলির চলনক্ষমতা নেই। অর্থাৎ, এরা গতিশীল নয় বা প্রাকৃতিক উপায়ে যোনিপথ দিয়ে ঢুকে ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হতে পারে না। সেই শুক্রাণুগুলি নিয়ে স্ত্রীর শরীর থেকে নেওয়া ডিম্বাণুতে সরাসরি ইনজেক্ট করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ইকসি’ (ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজ়মিক স্পার্ম ইঞ্জেকশন)। এই পদ্ধতিতে একাধিক ডিম্বাণুর নিষেক ঘটানো সম্ভব।

স্বামী ও স্ত্রী দু’জনের বা কোনও একজনের উর্বরতা কম হলে ভ্রূণ সংরক্ষণই আদর্শ বিকল্প হতে পারে।

স্বামী ও স্ত্রী দু’জনের বা কোনও একজনের উর্বরতা কম হলে ভ্রূণ সংরক্ষণই আদর্শ বিকল্প হতে পারে।

স্বামীর শুক্রাণু যদি কম থাকে ও স্ত্রীর ডিম্বাণুর মানও ভাল না হয়, তা হলেও এই পদ্ধতি সম্ভব। আইভিএফ করে স্ত্রীর ডিম্বাণু কৃত্রিম উপায়ে বাড়িয়ে নিয়ে তা সংগ্রহ করা হয় ও টেসা পদ্ধতিতে স্বামীর শুক্রাণু বার করে নেওয়া হয়। তার পরে নিষেক ঘটানো হয়। ৭২ ঘণ্টা পরে যে ক’টা ভ্রূণ তৈরি হবে, সেগুলির জিনগত স্ক্রিনিং করে সুস্থগুলিকে পাইপের সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে যোনিপথ দিয়ে জরায়ুতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। একে বলে ‘এমব্রায়ো ট্রান্সফার’। আর যদি সে সময়ে সন্তান না চান সেই দম্পতি, তা হলে সেই ভ্রূণগুলিকে ‘ব্লাস্টোসিস্ট’ পদ্ধতিতে ৫ থেকে ৬ দিন সংরক্ষণ করে রেখে তার পর ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে তরল বার করে বিশেষ রকম প্রিজ়ারভেটিভ দিয়ে তরল নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রেখে সংরক্ষণ করা হয়। ভবিষ্যতে সেই দম্পতির প্রজননক্ষমতা একেবারে কমে গেলেও, সেই জমিয়ে রাখা ভ্রূণ থেকেই তাঁরা বাবা-মা হতে পারেন স্বাভাবিক ভাবেই।

সোশ্যাল ফ্রিজ়িং! কেন সংরক্ষণের হিড়িক এখনকার প্রজন্মে?

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় ভ্রূণ বা ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আগে ছিল। কিন্তু এখন বেশির ভাগ মেয়েই তা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এগ ফ্রিজ়িং বা এমব্রায়ো ফ্রিজ়িং নয়, এখন যা হচ্ছে তা হল ‘সোশ্যাল ফ্রিজ়িং’। এমনটাই বলছেন স্ত্রীরোগ চিকিৎসক ও ‘ইনফার্টিলিটি স্পেশ্যালিস্ট’ সুদীপ বসু। তাঁর বক্তব্য, ‘‘তারকাদের দেখাদেখি হোক বা পেশাগত ক্ষেত্রটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে— দেরিতে মা হতে চাইছেন অনেক মেয়েই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাক বা না থাক, নিজের জীবন নিজের শর্তে বাঁচার ইচ্ছা থেকেই এই সোশ্যাল ফ্রিজ়িং। তাই সংরক্ষণের জন্য এত হুড়োহুড়ি। প্রযুক্তিও উন্নত হয়েছে অনেকটাই। এখন যে ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছে, তাতে ডিম্বাণু বা ভ্রূণ সংরক্ষণ করলে তা ৯০-৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ঠিক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’’

কেন সংরক্ষণের হিড়িক এখনকার প্রজন্মে?

কেন সংরক্ষণের হিড়িক এখনকার প্রজন্মে?

এশিয়ার দেশগুলিতে পুরুষ বা মহিলাদের প্রজনন ক্ষমতা আগের থেকে অনেকটাই কমছে। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ, ৩১ বছর বয়সি অনেক মহিলাই আসেন, যাঁদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা রয়েছে। ওই বয়সেই ডিম্বাণুর সংখ্যা একেবারেই কম। তার জন্য বর্তমান জীবনযাত্রার পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস, নেশার মাত্রা, দূষণ ও পরিবেশগত নানা কারণই থাকতে পারে। সে কারণেই এখনকার সময়ে মেয়েরা বা সদ্যবিবাহিত দম্পতিরাও আগে থেকেই সংরক্ষণের পথে ঝুঁকছেন। এটা অনেকটা ব্যাঙ্কে টাকা রাখার মতোই হয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে লাভ হবে এই হিসাব করে, আগে থেকেই জমিয়ে রাখার চিন্তা। খরচ যতই হোক না কেন, তাতে পিছিয়ে যাচ্ছেন না কেউই।

খরচ কেমন?

কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ফার্টিলিটি ক্লিনিকে ডিম্বাণু বা ভ্রূণ সংরক্ষণের খরচ শুরু হয় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা থেকে। অনেকগুলি বিষয় রয়েছে। উর্বরতা সংক্রান্ত নানা পরীক্ষা, কৃত্রিম পদ্ধতিতে ডিম্বাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি, হরমোন ইঞ্জেকশন, ডিম্বাণু সংগ্রহ ও ভিট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে হিমায়িত করার এক একটি সাইক্‌লের খরচ পড়বে দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা। কতগুলি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হচ্ছে ও কত দিনের জন্য, তার উপর খরচ নির্ভর করবে। প্রতি বার আইভিএফ পদ্ধতিতে ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে হলে খরচ বাড়বে, বছর বছর তরল নাইট্রোজেনের খরচ অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পড়বে। বছর প্রতি সংরক্ষণের খরচ ক্লিনিক বা হাসপাতালের উপর নির্ভর করবে।

ভ্রূণ তৈরির জন্য ডিম্বাণু সংগ্রহের পর তা শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করার পদ্ধতির খরচ আইভিএফ ও ইকসির ক্ষেত্রে আলাদা। তার পর ব্লাস্টোসিস্ট তৈরি করে তরল নাইট্রোজেনে ডোবাতে প্রাথমিক খরচ ডিম্বাণু সংরক্ষণের চেয়ে কিছুটা বেশিই হবে। কিছু ক্ষেত্রে তা আড়াই থেকে ৩ লাখ অবধি হতে পারে। তবে আইভিএফ আগে হয়ে থাকলে অতিরিক্ত ভ্রূণ শুধু ফ্রিজ় করতে খরচ পড়তে পারে ১৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। প্রথম বছরে হিমায়িত করার পর ভ্রূণ টিকিয়ে রাখার খরচ বছর প্রতি ১৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হতে পারে।

তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, ক্রায়োপ্রিজ়ারভেশন বা তরল নাইট্রোজেনে ডিম্বাণু বা ভ্রূণ কত দিন জমিয়ে রাখা যাবে ও পরে তা কী ভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে দেশের আইন, নিয়ম এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট নীতি আছে। ভ্রূণ দান করা বা গবেষণার কাজে ব্যবহার করা এখনও এ দেশে আইনত সিদ্ধ নয়। এই বিষয়ে ‘অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজি’ সংক্রান্ত আইন ও নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।

Fertility infertility Female Fertility IVF Egg Freezing Embryo

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy