প্লাস্টিকের কাপ, থালা বা বাটির বদলে কাগজের তৈরি কাপ, থালা বা কাগজের ব্যবহার এখন বেশি। কিন্তু সেগুলিও কি নিরাপদ? সাম্প্রতিক গবেষণায় যা জানা গিয়েছে, তা ঘুম উড়িয়ে দেওয়ার মতোই। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, পরিবেশ রক্ষার তাগিদে প্লাস্টিক স্ট্র বাদ দিয়ে কাগজের তৈরি স্ট্র ব্যবহারের চল বেড়েছে। কিন্তু কাগজের স্ট্র প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। জলরোধী ও দীর্ঘস্থায়ী করতে এতে এমন কিছু রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে যা শরীরের জন্য বিপজ্জনক। কাজেই চা, কফি বা নরম পানীয় অথবা শরবত, স্ট্র ডুবিয়ে যা-ই পান করুন না কেন, তার সঙ্গে সেইসব বিষাক্ত রাসায়নিকও শরীরে ঢুকবে।
দক্ষিণ কোরিয়া সরকারি গবেষণা সংস্থা এবং আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ থেকে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, কাগজের স্ট্র তৈরি করতে যে পরিমাণ রাসায়নিক লাগে তা প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের চেয়ে বহুগুণে বেশি। কাগজের স্ট্র একেবারেই পরিবেশবান্ধব নয়। বর্জ্য হিসেবেও সেটি ক্ষতিকর। কাগজের স্ট্রয়ে যে রাসায়নিক থাকে তার নাম ‘ফরএভার কেমিক্যাল’। সেটিকে বলা হয় ‘পার অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্সেস' (পিএফএএস)। বেশির ভাগ রাসায়নিক যৌগেরই ক্ষয় হয়, মাটিতে মিশে গিয়ে বা জলে দ্রবীভূত হয়ে যায় বা উচ্চতাপে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু পিএফএএসের ক্ষয় নেই। জল বা তাপে এর কিছুই হয় না। ফলে রক্তে মিশে গেলে সেটি সহজে বিনষ্ট হয় না। ওষুধেও একে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।
আরও পড়ুন:
পিএফএএসের অধীনে অসংখ্য যৌগ রয়েছে। প্রতিটির আণবিক গঠনে কার্বন ও ফ্লোরিন এত শক্ত বাঁধনে বেঁধে যাকে যে, সেগুলিকে ভেঙে ফেলা কঠিন।কাজেই এই রাসায়নিক যে বস্তুতে থাকে, সেটি কোনও ভাবেই পরিবেশবান্ধব হতে পারে না। ফলে এই রাসায়নিকগুলি পরিবেশে মিশলে তাদের ক্ষয় হয় না। এরা তাপরোধীও। তাই পরিবেশে এগুলি অবিকৃতই থেকে যায়। শরীরে ঢুকলে রক্তের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেহেতু এই উপাদানের ক্ষয় নেই, তাই লিভার ও কিডনি এই রাসায়নিককে ছেঁকে বার করতে পারে না। ফলে লিভার সিরোসিস ও কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
কাগজের স্ট্রয়ে আরও একধরনের রাসায়নিক থাকে যার নাম মেলামাইন। সাধারণত কাগজের স্ট্র রঙিন করতে এই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন নরম পানীয়, হেলথ ড্রিঙ্ক বা প্যাকেটজাত পানীয়ের সঙ্গে এই সব রঙিন কাগজের স্ট্র দেওয়া হয় যেগুলিতে মেলামাইন নামক রাসায়নিকটি থাকে। এই মেলামাইন শরীরে গেলে ক্যানসার তো বটেই, স্নায়বিক রোগ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। শিশুদের শরীরে রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে জমা হতে থাকলে হরমোনের ভারমাস্য বিগড়ে যেতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশেও সেটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাগজের সামগ্রী আনা স্থায়ী সমাধান নয়। বরং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে স্টেনলেস স্টিল বা বাঁশের তৈরি সামগ্রী ব্যবহার করাই নিরাপদ হতে পারে।