জিম করে শরীরের যত্ন নেন তিনি। খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য ভাল রাখেন তিনি। রোজ ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের জন্য ত্বকের যত্ন নিতেই হয়। কিন্তু মনখারাপ হলে? মনের ভিতরে ঝড় বয়ে গেলে, অথবা প্রতিদিনের লড়াইয়ের পর নিজেকে কী ভাবে ভাল রাখেন অভিনেতা রণজয় বিষ্ণু? এমন কোন তিন পন্থায় বিশ্বাস করেন তিনি? জানালেন আনন্দবাজার ডট কম-কে।
রণজয়ের কথায়, ‘‘চারদিকে যে
পরিস্থিতি, রোজ
যে লড়াই আমরা করি, তাতে শারীরিক স্বাস্থ্য ভাল রাখার চেয়ে
মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখা বেশি কঠিন। আমার মনে হয়, মস্তিষ্কের
একপ্রকার অদ্ভুত প্রবণতা রয়েছে, তা হল, খারাপটাকেই আকর্ষণ করা। একজন মানুষ চিরকাল আপনার জন্য ভালই করেছেন,
এক দিন খারাপ কিছু করেছেন। কিন্তু আপনার মনে থেকে যাবে খারাপটা।
কিন্তু কারও প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হলে, সেটা পুষে রাখলে নিজেরই
ক্ষতি। সেখানেই একজনের রুচিবোধ, শিক্ষা, বেড়ে ওঠা ভূমিকা পালন করে। কে কী ভাবে সেই বিদ্বেষকে বার করবেন, সেটাই বিচার্য।’’ আর তাই সেই
নেতিবাচকতা জীবন থেকে দূরে সরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন অভিনেতা। তিন ভাবে নিজের মনের
যত্ন নেন তিনি। আর নিজের এই যাত্রার কথা ভাগ করে অনুরাগীদেরও উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন ‘প্রতিজ্ঞা’ ধারাবাহিকের অভিমন্যু।
মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য কী করেন রণজয়? ছবি: ফেসবুক
১. রণজয়ের কথায়, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার অভ্যাস রপ্ত করছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘যখন কেউ কথা বলেন, অন্য দিকের মানুষ উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। অনেক সময়ে এটা দেখা যায়। কিন্তু তাতে যিনি বলছেন, তাঁর মন হালকা হয় না। কখনও-কখনও শুধু শুনলেও তাঁর ভাল লাগে।’’ আর এই অভ্যাসই তাঁকে নিজের অন্তরের কথা শোনার ধৈর্য দান করেছে। নিজের মনে যে অভিব্যক্তিগুলি বার বার আসছে, সেগুলিকে মন দিয়ে শুনে তার সঙ্গে বোঝাপড়ার করার রাস্তা তৈরি করেছেন রণজয়। ফলে বাকি দুনিয়াকে নয়, বরং নিজেকে বিচারকের জায়গায় বসে দেখতে সুবিধা হয় তাঁর।
২. প্রত্যেক ব্যক্তিকে দূর থেকে দেখার চেষ্টা করেন রণজয়। কারও কর্ম বা বক্তব্যকে মাথায় রেখে তাঁকে নিয়ে মতামত তৈরি করার চেয়ে একজন মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন তিনি। অন্তত সেই যাত্রার পথিক এখন তিনি। রণজয় বলছেন, ‘‘যে মুহূর্তে কাউকে আমি নিজের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে বিচার করব, তখনই তাঁর হাজার দোষগুণ মাথায় চলে আসবে। তাই আমি ভাবি, যিনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন, তাঁর যুক্তি কী কী, তিনি কোনও মানসিক চাপে ছিলেন কি না, তিনি নিজে কোনও কষ্টে ছিলেন কি না, সে সব খতিয়ে দেখা দরকার। আর সেটা দূর থেকে দেখলেই একমাত্র সম্ভব। আলাদা করে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা দরকার।’’ নয়তো একা থাকলে, কেবল সেই খারাপ কথাগুলিই মনে পড়বে আর ভিতরে ভিতরে লড়াই চলবে। তাতে নিজেরই মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হবে।
ভাল থাকার কৌশল শেখালেন রণজয়। ছবি: ফেসবুক
৩. তা ছাড়া রণজয় প্রতিক্রিয়া দেওয়ায় বিশ্বাসী নন। তিনি মনে করেন, যদি আশপাশে খারাপ কিছু ঘটে, বা তাঁর সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটে, তা হলে কিছু মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে যাওয়া ভাল। প্রতিক্রিয়া দিয়ে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করতে চান না তিনি। রণজয়ের কথায়, ‘‘যদি ঝড়ও বয়ে যায়, বইতে দেওয়া উচিত। ‘‘তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার’’। তার পর কয়েক দিন নিজেকে সবকিছুর থেকে দূরে রেখে অন্য কিছু করে ভাল রাখার চেষ্টা করা উচিত।’’ সেই সময়ে অভিনেতা কখনও বই পড়েন, কখনও বা কবিতা বা গদ্য লিখে নিজেকে ভাল রাখেন। লিখলে অনেক সময়ে মনের ভার হালকা হয় তাঁর। এই সময়ে জিম করলেও ভাল লাগে না। কারণ মন ও পেশি এক জায়গায় না থাকলে শারীরচর্চা করেও লাভ হয় না।
রণজয়ের এই তিন পন্থা মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য কতটা কার্যকর? কী বলছেন মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়?
আরও পড়ুন:
মনোবিদের মতে, এই তিনটিই যদি সত্যি মেনে চলা যায়, মানসিক ভার অনেকটা কমে যেতে পারে। অনিন্দিতার কথায়, ‘‘প্রথমত, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার যে অভ্যাস, তাকে বলা হয় অ্যাক্টিভ লিসনিং। অন্যের কথা না কেটে, বিচার না করে মন দিয়ে শুনলে সম্পর্কের মধ্যে বোঝাপড়া ও বিশ্বাস বাড়ে। এ ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক নিজের সঙ্গেও তৈরি করা যায়। দ্বিতীয়ত, সচেতন ভাবে দূরে থেকে বিচার করা বা মাইন্ডফুল ডিট্যাচমেন্ট। এর ফলে চিন্তা ও আবেগকে নিজের থেকে একটু দূর থেকে লক্ষ করতে শেখায়। ফলে আবেগ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে না, আমরা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করি। আর তৃতীয়ত, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না-দেওয়া বা নন-রিয়্যাক্টিভিটি খুব কার্যকর এক পন্থা। রাগ, দুঃখ বা উত্তেজনার মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে একটু থামতে শেখায়। ফলে না ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অপ্রয়োজনীয় বিবাদ থেকে দূরে থাকা যায়।’’ মনোবিদের মতে, এগুলি মনকে শান্ত রাখে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, সম্পর্ক ভাল করে এবং মনের নমনীয়তা বা সহিষ্ণুতা বাড়ায়।