অফিস, মিটিং, ইমেল— সব কাজেই দরকার মোবাইল। কখনও তা কাজের সঙ্গী, কখনও আবার বিনোদনের শরিক। বেড়াতে যান কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে রেস্তরাঁয়— সেখানেও প্রাধান্য পায় মোবাইলই। মোবাইলের পর্দা থেকে আসক্তি কমানোর কার্যকর উপায় খুঁজতে ব্যস্ত এখন মনোরোগ চিকিৎসক থেকে মনোবিদ, সমাজকর্মীরা। আর সেই কাজেই সাহায্য করতে পারে মাছ ধরা।
একসময় গ্রামগঞ্জে বা শহরতলিতেও যখন পুকুর, দিঘির অভাব ছিল না, চলত মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। হুইল দেওয়া ছিপ, চার তৈরি, কে ক’টা মাছ ধরল, কত ওজনের তা নিয়ে হইচইয়ে কাটত দিন। সব মিলিয়ে হত বিরাট কর্মযজ্ঞ। প্রতিযোগিতার বাহার না থাকলে, কেউ শখে, কেউ আবার নেহাত সময় কাটাতেই পুকুরে ছিপ ফেলতেন।
সে রসে নতুন প্রজন্ম কার্যত বঞ্চিত। কারণ, জলাশয়, সময়, দুইয়েরই অভাব। কাজের ধরন বদলেছে গত কয়েক বছরে অনেকটাই। কর্পোরেট জগতে বা বেসরকারি চাকরিতে কাজের চাপ, ডেডলাইন, মিটিং, প্রজেক্ট সামলাতে গিয়ে নাভিঃশ্বাস ওঠে অনেকেরই। তার পর ব্যক্তিজীবনের হাজারো ঝক্কি। এমন পরিস্থিতিতে বাড়তে থাকা মানসিক চাপ সামলাতে কিছুটা পথ্যের মতো হতে পারে মাছ ধরা।
আরও পড়ুন:
কলকাতার নানা প্রান্তে, জেলার বিভিন্ন দিঘিতে এখনও টাকা দিয়ে মাছ ধরা যায়। কখনও কখনও হয় প্রতিযোগিতাও। চাইলে সেই আসরে যোগ দিতে পারেন আপনিও। যদি প্রশ্ন আসে, কেন দেবেন, তা হলে জেনে নিন মাছধরার মানসিক উপযোগিতার দিকটি।
ডিজিটাল জগত থেকে মুক্তি: চেয়েও যেখানে মোবাইল থেকে দূরে থাকা যায় না, মাছ ধরতে গেলে সেই কাজ করতেই হবে। মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখলে ছিপে আর মাছ উঠবে না। কারণ, এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত একাগ্র দৃষ্টি রাখতে হয় ফাতনায়। মাছ ধরা মানেই প্রকৃতির সান্নিধ্য। জলের দিকে চেয়ে থাকাতেও চোখে ও মনের আরাম হয়। তা ছাড়া, কিছুক্ষণ ব্যক্তি বা পেশাজীবনের হাজারো চিন্তা থেকে মুক্তিরও উপায় তা।
প্রকৃতির সান্নিধ্য: প্রকৃতির সান্নিধ্য মনোজগতেও বদল ঘটায়। জলাশয়, তার পাশের সবুজ গাছগাছালি, ফড়িং, প্রজাপতি— যে জীবজগতের সঙ্গেও দেখা হয় না আজকাল, তারাই দৃশ্যগোচর হতে পারে। খোলা আকাশ, বাইরের হাওয়া মনকে ফুরফুরে করে তোলে। সপ্তাহশেষে সিনেমা দেখতে বা রেস্তরাঁয় খেতে গেলেও তা হয় না।
ধৈর্য-একাগ্রতা: ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে গেলে দরকার মনোযোগ, ধৈর্য, তৎপরতা। ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় ধৈর্য ধরে। কারণ, কখন বঁড়শিতে মাছ গিঁথবে, কেউ জানে না। ফাতনার ওঠা-পড়াই তা জানান দেয়। এক সেকেন্ডেই মাছ টোপ ঠুকরে খেয়ে বেরিয়েও যেতে পারে। সচেতন না থাকলে, মাছ ধরা মুশকিল। আবার কখনও বড় আকারের বঁড়শি গেঁথা মাছকে ডাঙায় তুলতেও কম কসরত করতে হয় না। সবই শিক্ষণীয়।
সামাজিক যোগাযোগ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে সামাজিক যোগাযোগের পরিসর ক্রমশই সঙ্কীর্ণ হচ্ছে। মাছ ধরার আয়োজনে আলাপ হয়ে যেতে পারে আরও পাঁচজনের সঙ্গে। একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা, অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানেও জীবন উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
ধীরে চলার শিক্ষা: গতিময় জীবনের ক্লান্তি কাটাতে কখনও কখনও থমকানোর দরকার পড়ে। পুকুরে মাছ ধরা, পাখির ওড়াউড়ি, গাছগাছালি দেখতে দেখতে কিছুটা সময় কাটালে, কিছুক্ষণ নিজের জন্যও সময় পাওয়া যায়। ক্ষণিকের শান্ত জীবনও দৈনন্দিন ওঠাপড়া সামলানোর জন্য জরুরি।
প্রাপ্তির আনন্দ: মাছ ধরতে পারাতেও রয়েছে প্রাপ্তির আনন্দ। অনেকের কাছে বড় মাছ ধরতে পারাটা চ্যালেঞ্জ। তাতেই মেলে আনন্দ। উদ্যম বাড়ে।