একটিমাত্র নিজস্বী। অ্যাপে আপলোড হতেই চলে এল ত্বকের ধরন নিয়ে নানা তথ্য, কোনও সমস্যা থাকলে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ, মিলল ব্যক্তিগত স্কিনকেয়ার রুটিনও। অ্যাপই জানিয়ে দিল, কোন প্রসাধনী ব্যবহার করলে কেমন দেখাবে, কোনটা সবচেয়ে মানানসই হবে দিনের পোশাকের সঙ্গে বা কোনটা ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখবে।
শুনতে অবাক লাগলেও এটা মানতেই হবে যে, বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ বাড়ছে। প্রভাব বিস্তার করছে ত্বকচর্চা কিংবা রূপটান শিল্পেও। সাধারণত কোনও ত্বক বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তিনি ত্বকের ধরন দেখে ঠিক করেন, কেমন সামগ্রী ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সকলের ত্বকের ধরন এক নয়। তাই কোন ত্বকে কোন সেরাম, কোন ক্রিম তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন। মেকআপের ক্ষেত্রেও একই ভাবে কার্যকর এআই। বিশেষজ্ঞরা যেমন এই বিষয়গুলি ভাল ভাবে বোঝাতে পারেন, এআই ব্যবহার করেও তা বোঝা যায়।
ত্বকের যত্নে কতটা ভরসা করা যায় এআইকে?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সন্দীপন ধর এ প্রসঙ্গে বলছেন, “এখন ‘ভিজ়ুয়াল অ্যাসেসমেন্ট’ অর্থাৎ খালি চোখে দেখে নির্ণয়ের উপরে বেশি ভরসা করতে হয়। ত্বকের গুণমান, ধরন (তৈলাক্ত না শুষ্ক) দেখে সমস্যা নির্ণয় করতে হয়। খুব প্রয়োজনে সাহায্য নিতে হয় বায়পসি বা অন্য কোনও বিশেষ ধরনের পরীক্ষার। অনভিজ্ঞ চোখে দেখলে একই ভৌগোলিক এলাকার প্রায় সকল মানুষের ত্বকের ধরন একই রকম মনে হয়। ডার্মাটোলজিস্ট অথবা রূপবিশেষজ্ঞেরা অভিজ্ঞ চোখে দেখে বিভিন্ন ধরনের ত্বকের বৈশিষ্ট্য বলে দিতে পারেন। তা বিশ্লেষণ করে জানাতে পারেন, কেমন সামগ্রী ব্যবহার করা সবচেয়ে ভাল।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ডিপ লার্নিং’ পদ্ধতির সাহায্য নিলে জানা যায় ত্বকের ধরনের খুঁটিনাটি। ঠিক কোন সামগ্রী বা চিকিৎসা পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে, তা-ও বলে দেয় এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম)।
রূপবিশেষজ্ঞ মৌসুমী মিত্র বললেন, “সাধারণত চোখে দেখে, প্যাচ টেস্ট করে ত্বকচর্চা কিংবা রূপটানের সামগ্রী ব্যবহার করি আমরা। অনলাইনে কিনতে গেলে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। না বুঝে কিনে ফেলায় নষ্ট হয় বহু প্রসাধন সামগ্রী। এআই-এর সাহায্যে এক ধরনের ‘হাইপারপার্সোনালাইজ়ড’ রুটিন তৈরি করা যায়। নিজের মতো করে, একান্তই নিজের ত্বকের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সাহায্য মেলে। খালি চোখে যেখানে শুধুই গাত্রবর্ণ বোঝা যায়, এআই ব্যবহার করে তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে সে ত্বকের কোষে কোনও সমস্যা আছে কি না কিংবা ত্বকের আর্দ্রতায় ঠিক কতটা ঘাটতি রয়েছে। কালো ছোপ, ব্রণর সমস্যা থাকলেও তা ত্রুটিহীন ভাবে নির্ণয় করতে পারে এআই।” চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই প্রযুক্তির সাহায্যে আগামী দিনে খুব সহজেই জানা যাবে মুখের কোন অংশে বলিরেখা পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সেই মতো প্রস্তুতিও নেওয়া যাবে আগে থেকেই।
মেকআপে এআই
মেকআপের ক্ষেত্রেও এআই-এর সাহায্যে বেছে নেওয়া যায় নিজের জন্য উপযুক্ত সামগ্রী। লিপস্টিক বা ফাউন্ডেশনের কোন শেড মানানসই, তা দেখতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। বিশেষত নেটমাধ্যমে যাঁরা কেনাকাটি করতে পছন্দ করেন কিংবা ‘ট্রেন্ডিং’ সামগ্রী ব্যবহার করতে চান, তাঁরা অনেক সময়ে ঠিক করতে পারেন না, পণ্যটি তাঁকে আদৌ মানাবে কি না। এআই-এর ‘ভার্চুয়াল ট্রাই অন’ মোড ব্যবহার করে এই সামগ্রী হাতের নাগালে না পেলেও পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া যায় ভাল দেখাচ্ছে কি না। এ ছাড়াও কোন ত্বকের জন্য নিয়াসিনামাইড ভাল আর কোনটার জন্য রেটিনল, তা-ও ‘অ্যানালাইজ়’ করে দিতে পারবে এআই।
সাবধান থাকতে হবে
এআই-এর কোনও সংবেদনশীলতা, নৈতিকতা, সহানুভূতি নেই। নেই কোনও দায়বদ্ধতা। ফলে কোনও রোগী কিংবা ক্রেতার ব্যক্তিগত ভাবে কী অসুবিধা রয়েছে, সে দিক বিবেচনা করার কোনও চেষ্টাই হয়তো করবে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবনায় এখনও পটু নয় এই প্রযুক্তি।তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়েও এআই কতটা ভরসাযোগ্য তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এখনও। কারও রোগের তথ্য যে এই প্রযুক্তির কাছে সুরক্ষিত, এমন আশ্বাস এখনই দিতে পারছেন না বিশেষজ্ঞেরা।
অনেক সময়ে ক্রেতারা অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে যান। তাই চোখ বন্ধ করে এআই-এর উপরে নির্ভর করা উচিত নয়। রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও একাধিক এআই টুল ব্যবহার করে বুঝে নিতে হয়, যে তথ্য অ্যাপ থেকে মিলছে, তা পুরোপুরি ভরসাযোগ্য কি না।
ট্রেন্ড মেনে কেনাকাটি করেন যাঁরা, তাঁরাও সমস্যায় পড়তে পারেন এই প্রযুক্তির উপরে চোখ বন্ধ করে ভরসা করলে। অনেক সময়ে ‘মাইক্রো ট্রেন্ড’ অর্থাৎ স্থানীয় স্তরে প্রচলিত কোনও সামগ্রী হয়তো এআই-এর অ্যালগরিদমে থাকে না। সে ক্ষেত্রে ‘ম্যাক্রো ট্রেন্ড’-এ বিশ্বাস করে জিনিস কিনলে তা মনমতো না-ও হতে পারে।
মডেল: ঐশ্বর্য সেন, মেকআপ: সৈকত নন্দী, ছবি: শুভদীপ সামন্ত