Advertisement
E-Paper

ঘ্রাণে ফিরবে স্মৃতি, ক্ষুরধার হবে বুদ্ধি! মস্তিষ্কের রহস্য ভেদ হবে গন্ধবিচারের অনুশীলনে?

‘স্মেল ট্রেনিং’ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে চলছে গবেষণা। এটি কেবল হারানো ঘ্রাণশক্তি ফেরানোর চিকিৎসা নয়, মানবমস্তিষ্কের জটিল রহস্যের সমাধান হবে বলেও দাবি গবেষকদের।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০০
How Smell Therapy May Boost Memory and Brain Health

মস্তিষ্কের জট খুলছে ‘স্মেল ট্রেনিং’, কোন রহস্যের ‘গন্ধ’ পাওয়া গেল? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গন্ধের শিকড় কোথায়? শুধু রাসায়নিকে? নাকি অনুভবের অলিগলিতে? পুরনো বইয়ের গন্ধের ভাঁজে থমকে থাকে ফেলে আসা স্মৃতি, কফির কড়া সুবাসে লেখা থাকে কোনও এক অলস রবিবারের গল্প। স্রেফ গন্ধ শুঁকে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাওয়া, নিছক কল্পনা নয়, বরং বিজ্ঞান এ শক্তিকে যথাযথ বলেছে। আবার গন্ধ শুঁকে আবেগে ভেসে যাওয়াও কোনও কল্পনা নয়, বরং বাস্তব। ঘ্রাণের সঙ্গে মনস্তত্ত্বের যে মাখোমাখো সম্পর্কটা আছে, তা বেশ বুঝেছিলেন জীবনানন্দ দাস। “কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস— তেম্নি সুঘ্রাণ” পেয়ে তাই বিমোহিত হয়েছিলেন কবি। তাঁর মনে হয়েছিল ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গ্লাসে ভরে পান করতে। রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শের ভিড়ে গন্ধ যেন এক অন্তরালবর্তী পথচারী। অথচ এর গুরুত্ব যে কতটা, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তাই গন্ধবিজ্ঞান নিয়ে এত আলোচনা। গন্ধমাহাত্ম্য বিচার করে গন্ধের অনুশীলন নিয়েই শুরু হয়েছে গবেষণা।

‘‘শব্দস্পর্শরূপরসগন্ধানাং পৃথিবী গন্ধবতী’’— সাংখ্য দর্শনেও গন্ধের গুরুত্বের কথা লেখা হয়েছে। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ—এই পাঁচটি গুণের মধ্যে গন্ধই হল পৃথিবীর নিজস্ব গুণ। গন্ধই রঙিন করতে পারে ধূসর স্মৃতিকে, গন্ধের জোরেও ক্ষুরধার হতে পারে বুদ্ধিও। গন্ধহীন জীবন বর্ণহীনও। তাই গন্ধ শুঁকিয়ে মগজকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা চলছে বিশ্ব জুড়েই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতির নাম ‘স্মেল ট্রেনিং’ বা ঘ্রাণের অনুশীলন।

গন্ধ শোঁকাও যখন চিকিৎসা

গন্ধ কেবল শুঁকলেই হবে না, বিচারবুদ্ধি দিয়ে তার বিশ্লেষণও প্রয়োজন। তবেই তো মগজের জট খুলবে! সুকুমার রায় হয়তো আগেই বুঝেছিলেন বিষয়টি। তাঁর ‘গন্ধবিচার’ কবিতায় বৃদ্ধ নাজির এসে মন্ত্রীমশাইয়ের জামায় নাক ঠেকিয়ে গন্ধ শুঁকে সূক্ষ্ম ভাবে তার বিচারও করেন। বৃদ্ধের ঘ্রাণশক্তির পরখ ও বিচারবুদ্ধির নিরীক্ষণ একই সঙ্গে হয়। ঘ্রাণের অনুশীলন বিষয়টিও তেমনই। প্রতিটি আলাদা গন্ধকে চিনে তার উৎস বোঝা ও সেটিকে কল্পনা করার প্রশিক্ষণই দেওয়া হয় স্মেল ট্রেনিংয়ে। যেমন, গোলাপ ফুলের গন্ধ শুঁকে সেই সুবাস নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা, মনে মনে ফুলটিকে ভেবে নেওয়াও গন্ধের অনুশীলনের একটি অংশ। অর্থাৎ, গন্ধ কেবল শুঁকলেই হবে না, মস্তিষ্কে তার রোমন্থনও প্রয়োজন।

গন্ধের অনুশীলনে ফিরতে পারে স্মৃতি, দাবি এমনটাই।

গন্ধের অনুশীলনে ফিরতে পারে স্মৃতি, দাবি এমনটাই।

কোভিডের সময়ে বেশির ভাগ মানুষই গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন সাময়িক ভাবে। ঘ্রাণশক্তি সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে চলে যাওয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘অ্যানোসমিয়া’। আর গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা কমে গেলে, তাকে বলে ‘হাইপোসমিয়া’। করোনাকাল থেকেই বোধ করি এই শব্দগুলির সঙ্গে পরিচিতি ঘটেছে আমজনতার। কারণ, তার আগে অবধি বহু মানুষের একসঙ্গে ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা তেমন ঘটেনি। এ-ও দেখা গিয়েছে, যিনি ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তিনি স্বাদ ও স্মৃতির অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন। এই সমস্যার সমাধান করতেই গন্ধ শুঁকিয়ে ঘ্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়, যা থেকে বর্তমান সময়ে ‘স্মেল ট্রেনিং’ থেরাপির উৎপত্তি বলা যেতে পারে।

বিজ্ঞান বলছে, দিনে অন্তত দু’বার ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে নির্দিষ্ট কিছু জিনিসের গন্ধ শুঁকলে, মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলি সজীব ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাতে তেমন বুদ্ধি তাজা হয়, তেমনই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিও ফিরে আসতে পারে। দাবি করা হয়, গন্ধচিকিৎসা স্মৃতিশক্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি করতে পারে এবং বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। তাই বর্তমানে পার্কিনসন্স, ডিমেনশিয়া, অ্যালঝাইমার্স অথবা জটিল কোনও মানসিক রোগের চিকিৎসার একটি অঙ্গ হয়ে উঠেছে ঘ্রাণের অনুশীলনও।

ঘ্রাণের অনুশীলন নিয়ে বিশ্ব জুড়ে চলছে গবেষণা।

ঘ্রাণের অনুশীলন নিয়ে বিশ্ব জুড়ে চলছে গবেষণা।

মগজের গন্ধবিচার

স্মেল থেরাপির সঙ্গে মগজকে কেন জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, তা বুঝতে গেলে গন্ধ কী ভাবে মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে, সে বিষয়টি বুঝে নিতে হবে। গন্ধ পাওয়ার যে পদ্ধতি তাকে বলে ‘অলফ্যাকশন’। কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক প্রণবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, গন্ধ হল এক প্রকার অণু (মলিকিউল)। শ্বাসের সঙ্গে সে সটান ঢুকে যায় নাসিকাপথে। এই উপাদানগুলি তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে, যা নাকের ভিতরের ফাইবারের সঙ্গে আটকে যায়। এই ফাইবার রয়েছে নাকের একদম ভিতরের দিকে ও মগজের ঠিক নীচে। সেখানে গিয়ে অলফ্যাক্টরি এপিথেলিয়ামে ধাক্কা দেয়। এই এপিথেলিয়ামে জড়াজড়ি করে থাকে প্রায় ৪০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ‘অলফ্যাক্টরি সেন্সরি নিউরন’ বা অলফ্যাক্টরি স্নায়ু, যাদের কাজই হল ওই গন্ধের অণুগুলিতে থাকা রাসায়নিক তথ্যকে তড়িৎ সঙ্কেতে বদলে দেওয়া। এই সঙ্কেত মস্তিষ্কের একেবারে নীচে থাকা অলফ্যাক্টরি বাল্‌বে গিয়ে পৌঁছোয়। সেখানে সঙ্কেতগুলি পরিশোধিত ও একত্রিত হয়ে মগজে সেঁধিয়ে যায়। মগজের যে জায়গায় এই গন্ধের সঙ্কেত পৌঁছোয়, তার নাম ‘অলফ্যাক্টরি কর্টেক্স’ বা ‘অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স’।

এখানে একটি অন্য ঘটনাও ঘটে। শরীরের বাকি চার ইন্দ্রিয়— দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ ও স্বাদ তাদের সঙ্কেতগুলিতে মস্তিষ্কের মূল প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র বা থ্যালামাসে পাঠায়। কিন্তু ঘ্রাণতন্ত্র বা অলফ্যাক্টরি সিস্টেম এমন এক ইন্দ্রিয়, যা শুধু থ্যালামাসকে ভরসা করে না। তাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সঙ্কেত মস্তিষ্কের প্রাণকেন্দ্র বা লিম্বিক সিস্টেমে পাঠিয়ে দেয়। তাই গন্ধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেটি নিয়ে চিন্তা করি বা পুরনো স্মৃতি অনুভব করি। পশুপাখিরা গন্ধ শুঁকেই কোনও জিনিসকে চিনতে পারে, তাই তাদের ঘ্রাণশক্তি অতি প্রবল হয়।

নাক থেকে ঘ্রাণ মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছোনোর পথটিও বিচিত্র।

নাক থেকে ঘ্রাণ মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছোনোর পথটিও বিচিত্র।

গবেষণা বলছে, মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশটি গন্ধ দ্বারা উদ্দীপিত হয়েই ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করে। ‘ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম’ প্রবাদটিও সে থেকেই এসেছে। খাবারের সুগন্ধ বা ঘ্রাণ গ্রহণ করলেই যেন অর্ধেক ভোজন বা খাওয়া হয়ে যায়। আক্ষরিক অর্থে পেট না ভরলেও, গন্ধ খাওয়ার ইচ্ছে বা খিদেকে নিয়ন্ত্রণ করে অনেকটাই। নির্দিষ্ট সুবাস মস্তিষ্কে সেরোটোনিন এবং ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়।

গন্ধ যে আবেগ ও স্মৃতিও নিয়ন্ত্রণ করে, তার উল্লেখ করেছেন ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্ত তাঁর লেখা ‘রিমেমব্রেন্‌স অফ থিংস পাস্ট’-এ। তাঁর উপন্যাসের মূল চরিত্রের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাকে তিনি বলেছেন ‘প্রুশিয়ান মেমোরি ফেনোমেনন’ বা ‘প্রুস্ত এফেক্ট’। সেটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, যেখানে নির্দিষ্ট গন্ধ বা স্বাদের মতো সংবেদনশীল উদ্দীপক হঠাৎ করে মানুষের অবচেতন মন থেকে অতীতের কোনও স্মৃতি জীবন্ত করে তুলতে পারে। যেমন সেই উপন্যাসের এক চরিত্র চায়ে কেক ডুবিয়ে খেয়ে শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে গিয়েছিল। লেখক দেখিয়েছেন, গন্ধ এমনই এক অনুভূতি যা থেকে বহু বছর আগে দেখা কোনও দৃশ্যও চোখের সামনে আচমকা ভেসে উঠতে পারে। অলফ্যাক্টরি সিস্টেম মস্তিষ্কের অ্যামিগডালার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত যা মানুষের ভয়, ভালবাসা, আনন্দ ও উদ্বেগের মতো আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কটু বা খারাপ গন্ধ পেলে মানুষের রাগ ও বিরক্তি বাড়ে, অন্য দিকে মিষ্টি সুবাস বিষণ্ণতা কমায়।

কী ভাবে হয় গন্ধের অনুশীলন?

মূলত চার প্রকার গন্ধ নিয়ে অনুশীলন করা হয়। ১) গোলাপ (মিষ্টি গন্ধ), ২) লেবু (টকজাতীয় গন্ধ), ৩) ইউক্যালিপটাস (ঝাঁঝালো গন্ধ) এবং ৪) লবঙ্গ (মশলার গন্ধ)।

প্রতিটি এসেনশিয়াল অয়েল এক একটি শিশিতে রাখা হয়। প্রতিটি শিশি নাকের ১-২ ইঞ্চি নীচে রেখে ১৫-২০ সেকেন্ড গন্ধ শুঁকতে হয়। সে সময়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে হয়। এক একটি গন্ধ শোঁকার মাঝে ১০ সেকেন্ডের বিরতি থাকে। দিনে ২-৩ বার এই অনুশীলন করানো হয়। এই অনুশীলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল, গন্ধটি শোঁকার সময়ে মনে মনে সেই জিনিসটির ছবি বা অতীতের কোনও অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করতে হয়। গবেষকেরা জানাচ্ছে, ২ থেকে ৩ মাস এই অনুশীলন করলে উপকার হয় অনেকটাই।

চার প্রকার গন্ধ নিয়ে অনুশীলন করা হয়।

চার প্রকার গন্ধ নিয়ে অনুশীলন করা হয়।

এই গন্ধ শোঁকায় লাভ কী ভাবে হয়? চিকিৎসক প্রণবাশিসবাবুর মতে, প্রতিদিন একই পদ্ধতিতে দিনে ২-৩ বার নির্দিষ্ট সময়ের বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু গন্ধ শোঁকানোর ফলে নাকের ওই ফাইবার ও অলফ্যাক্টরি স্নায়ুগুলি সজীব হয়ে ওঠে। গন্ধের উপাদান পৌঁছোনোর রাস্তাটা পরিষ্কার হয়ে যায়। এই পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ বা ‘নিউরোরিজেনারেশন’। দীর্ঘসময় ধরে এই প্রক্রিয়া চললে, তখন ঘ্রাণের অনুভূতি আবার ফিরে আসে।

ঘ্রাণ অনুশীলনের একাল-সেকাল

গন্ধের চিকিৎসা আজকের ধারণা নয়। ‘স্মেল ট্রেনিং’ নামক মোড়কটি নতুন, তবে বিষয়টি বহু পুরনো। প্রাচীন ভারত এবং প্রাচ্যের ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতিগুলিতে ঘ্রাণ ও নাসারন্ধ্রকেন্দ্রিক চিকিৎসার বিধান রয়েছে। ‘চরকসংহিতা’ ও ‘সুশ্রুতসংহিতা’-য় পঞ্চকর্মের অংশ হিসেবে ‘নস্য’ বা ‘নাস্য’ চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। এতে ভেষজ তেল, ঘি বা ভেষজ রসের গন্ধ শুঁকিয়ে মাথা ও নাকের স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হত। মাথাব্যথা, সাইনাস, মস্তিষ্কের নানা রোগ নিরাময়ে, বুদ্ধিমত্তা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতিতে এমন চিকিৎসা প্রয়োগের উল্লেখ রয়েছে। সুশ্রুতসংহিতাতেও সুরভি ও সুগন্ধির উল্লেখ আছে, যাকে এখনকার অ্যারোমাথেরাপি বলেই মনে করা হয়।

 ‘স্মেল ট্রেনিং’ নামক মোড়কটি নতুন, তবে বিষয়টি বহু পুরনো।

‘স্মেল ট্রেনিং’ নামক মোড়কটি নতুন, তবে বিষয়টি বহু পুরনো।

স্মেল থেরাপি নানা রকমই হতে পারে। তবে নাকে গন্ধ শুঁকিয়ে চিকিৎসার যে ধারা বর্তমান সময়ে রয়েছে, সেটি নিয়ে প্রথম কথা বলেন জার্মানির ড্রেসডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টমাস হামেল। তিনি এই থেরাপির নাম দেন ‘অলফ্যাক্টরি ট্রেনিং’। ২০০৯ সালে তিনি ও তাঁর সতীর্থেরা গবেষণা করে দাবি করেন যে, নিয়মিত চার প্রকার এসেনশিয়াল অয়েল (গোলাপ, লেবু, ইউক্যালিপটাস ও লবঙ্গ) দিনে দু’বার করে শুঁকলে মস্তিষ্কের ঘ্রাণ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী কালে তাঁর গবেষণালব্ধ ফলের উপর ভিত্তি করেই ‘স্মেল ট্রেনিং’ বিষয়টি নিয়ে আরও নানা জায়গায় গবেষণা শুরু হয়েছে।

ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ ইস্ট অ্যাংলিয়ায় পারকিনসন্স ও অ্যালঝাইমার্সের চিকিৎসায় অলফ্যাক্টরি থেরাপি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। সুইডেনের স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা গন্ধ চিকিৎসার মাধ্যমে মস্তিষ্কের আবেগ ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণকারী এলাকা হিপ্পোক্যাম্পাসকে সক্রিয় করে বয়স্কদের স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা স্মেল ট্রেনিংয়ের সঙ্গে এমআরআই ইমেজিং প্রযুক্তিকে জুড়ে দিয়ে দেখছেন, এতে মস্তিষ্কের ‘গ্রে ম্যাটার’ অংশটি কী ভাবে কাজ করছে। আর কী কী ভাবে স্মেল থেরাপি করলে, মস্তিষ্কের ধার বাড়বে, তা নিয়েও গবেষণা করছেন তাঁরা।

চিকিৎসকেরা কি একমত?

গন্ধের চিকিৎসা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। গন্ধ শুঁকেই যে বুদ্ধি বা স্মৃতির ধার বৃদ্ধি করা যাবে, তা এখনই মানতে রাজি নন চিকিৎসকেরা। স্মেল থেরাপি আরও নানা ভাবে হতে পারে বলেই মত চিকিৎসকদের। কলকাতার ইএনটি চিকিৎসক অমিতাভ ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘স্মেল থেরাপি করার আগে দেখতে হবে, ঘ্রাণশক্তি চলে যাওয়ার কারণ কী। কোভিডের সময়ে ভাইরাসের সংক্রমণে ঘ্রাণশক্তি দুর্বল হয়েছিল অনেকের, তা ছাড়াও নাকে পলিপ থাকলে, ফ্যারেঞ্জাইটিস হলে বা অন্য কোনও রোগের কারণেও এমন হতে পারে। আবার কারণ ছাড়াও ঘ্রাণ উধাও হতে পারে। এমনও রোগী দেখেছি, যিনি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তেমন রোগীরা সুগন্ধকেও দুর্গন্ধ বলে মনে করেন। ফুলের গন্ধ পেলেও ভাববেন মৃতদেহের পচা গন্ধ বার হচ্ছে। এমনকি তাঁরা সব সময়েই আশপাশে কটু গন্ধ অনুভব করেন। তাঁদের চিকিৎসা রোগের ধরন ও লক্ষণ বুঝেই হবে। সেখানে গন্ধ শুঁকিয়ে কাজ হবে নাকি ন্যাজ়াল স্প্রে বা অ্যান্টি-অ্যালার্জিক চিকিৎসা হবে, তা দেখা সবচেয়ে জরুরি।’’ চিকিৎসকের মত, অলফ্যাক্টরি স্নায়ুর সঙ্গে সরাসরি মস্তিষ্কের সংযোগ রয়েছে। তাই গন্ধের চিকিৎসা এমন ভাবেই করা হয়, যাতে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলি উদ্দীপিত হয় এবং ঘ্রাণের অনুভূতি ফিরে আসে। খুব বেশি সুগন্ধি, কসমেটিক যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের ঘ্রাণশক্তি একটা সময়ের পরে গিয়ে দুর্বল হতে বাধ্য। তাই সেদিকেও সতর্ক থাকা জরুরি বলেই মনে করেন চিকিৎসক।

গন্ধের অনুশীলনে কি বুদ্ধির বিকাশ হয়, স্মৃতি কি ফিরে আসে?

গন্ধের অনুশীলনে কি বুদ্ধির বিকাশ হয়, স্মৃতি কি ফিরে আসে?

স্মেল থেরাপি এখনও পরীক্ষিত সত্য নয়, আরও অনেক গবেষণার স্তর বাকি বলেই মত কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক প্রণবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর মতে, ‘‘গন্ধ চিকিৎসার অনেক স্তর রয়েছে। কোনটি কার জন্য প্রযোজ্য, সেটি বিবেচনার বিষয়। যেমন, ভাইরাস সংক্রমণের কারণে গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে গিয়েছে বা কমে গিয়েছে, এমন হলে অলফ্যাক্টরি ট্রেনিং বা স্মেল ট্রেনিং কাজে দেবে। কিন্তু মাথায় গুরুতর চোট বা কোনও দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়ে যদি নাকের ফাইবার ও অলফ্যাক্টরি নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ছিঁড়ে যায়, তখন কিন্তু স্মেল ট্রেনিং কাজ করবে না। আবার যদি নাকে পলিপ থাকে এবং সেটি অলফ্যাক্টরি ফাইবারের কাছাকাছি এলাকায় থাকে, তা হলেও গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু স্মেল ট্রেনিং করিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’’ স্মেল থেরাপি এখনও পরীক্ষালব্ধ একটি বিষয়, গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত কোনও নিশ্চিত চিকিৎসাপদ্ধতি নয়। স্মেল থেরাপি সকলের জন্য সমান কার্যকর কি না, তা আগামী দিনে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলেই বোঝা যাবে। সে ট্রায়াল এখনও চলছে। যদিও ভবিষ্যতে চিকিৎসার কাজে এই পদ্ধতির প্রয়োগ হতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।

Smell brain health Memory Loss Dementia Parkinson's disease

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy