বাঙালি গ্যাস-অম্বলে ভোগেই। খাওয়ার পরে গলা-বুকে জ্বালা হলেই অ্যান্টাসিড খেয়ে ফেলা প্রায় সকলেরই অভ্যাস। অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আবার কয়েককাঠি উপরে। এটি হলে অস্বস্তি আরও বেশি। বুকে এমন জ্বালাযন্ত্রণা হবে যে সামলানোই দায়। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, গলা জ্বালা বা বুকে-পিঠে যন্ত্রণা হওয়া মানেই যে গ্যাস বা অম্বলের সমস্যা, তা না-ও হতে পারে। লাগাতার যদি এমন কিছু লক্ষণ দেখা দিতে থাকে, তা হলে সেটি পিত্তথলিতে পাথর জমার উপসর্গ হতেই পারে।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স না পিত্তথলিতে পাথর?
পাকস্থলির অ্যাসিড যদি উল্টোপথে খাদ্যনালি দিয়ে উপরে উঠে আসে তখন গলা-বুকে জ্বালা হয়। একে বলে অ্যাসিড রিফ্লাক্স। পিত্তথলিতে পাথর অন্য কারণে জমে। পিত্তরসের প্রধান তিনটি উপাদান আছে, কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন এবং পিত্ত-লবণ। স্বাভাবিক অবস্থায়, পিত্ত লবণ কোলেস্টেরলকে দ্রবীভূত করে রাখে। কিন্তু যদি এই প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়, তখনই কোলেস্টেরল জমাট বেঁধে পাথর হিসাবে জমতে থাকে পিত্তথলিতে। কোলেস্টেরল জমে ক্রিস্টালের মতো আকার নিতে থাকে। আবার, কারও যদি লিভার সিরোসিস বা লিভারের অন্য কোনও রোগ থাকে, তা হলে পিত্তথলি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলিরুবিন তৈরি করতে থাকে। এই বিলিরুবিন তখন ক্যালশিয়ামের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে শক্ত পাথর হয়ে জমা হতে থাকে। সে ক্ষেত্রেও হজমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং ঘন ঘন বদহজমের কারণে গলা বা বুকে ব্যথা, জ্বালাযন্ত্রণা হতে পারে।
লক্ষণে তফাৎ কোথায়?
অ্যাসিড রিফ্লাক্সে বুকে ও গলায় হালকা থেকে তীব্র জ্বালা ভাব থাকে। পিত্তথলিতে পাথর জমলে ডানপাশের পেটের উপরের অংশ বা পেটের মাঝে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা একনাগাড়ে হতে থাকে।
অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ব্যথা ওষুধ খেলে কমে যেতে পারে, তবে পিত্তথলিতে পাথর হলে সে ব্যথা সহজে কমবে না।
দুই ক্ষেত্রেই খিদে কমে যায়, বমি ভাব থাকে, সর্বক্ষণ পেটে অস্বস্তি হতে থাকে। পিত্তথলিতে পাথর জমলে অতিরিক্ত তেল-চর্বিজাতীয় বা ভারী খাবার খাওয়ার ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর ব্যথা শুরু হয়। সেই ব্যথা বুকে ও কাঁধেও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই গ্যাসের ব্যথা ভেবে ভুল করেন।
অম্বলে চোঁয়া ঢেকুর ওঠে, গলা ও মুখে তীব্র টক স্বাদ অনুভূত হয়, কিন্তু পিত্তথলিতে পাথর জমলে ঘন ঘন জ্বর আসতে থাকে, চোখ ও ত্বকে হলদেটে ভাব ফুটে ওঠে, অনেক সময়ে জন্ডিসের লক্ষণও দেখা দেয়।
অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, হরমোনের গোলমাল, কোলেস্টেরলের বাড়বাড়ন্ত, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা পিত্তথলিতে পাথর জমার কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবণতা, অ্যালকোহলের কারণেও পিত্তথলিতে পাথর জমে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, পিত্তথলিতে পাথর জমেছে কি না তা আলট্রাসনোগ্রাফি করে জানা যায়। গোড়ায় ধরা পড়লে তা ওষুধেই সেরে যায়। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে রোগটি জটিল পর্যায়ে চলে যেতে পারে। যদি পাথরের সংখ্যা বাড়তে থাকে তা হলে ‘ক্যালকুলাস কোলেসিস্টাইটিস’ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীর পেটে মারাত্মক যন্ত্রণা শুরু হয়। এর থেকে পিত্তথলিতে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।