বাঙালি গ্যাস-অম্বল নিয়ে যতটা চিন্তিত, ক্যানসার নিয়ে ততটা নয়। বিশেষ করে পেটেও যে ক্যানসার হয়, সে নিয়ে সচেতনতা কম। অথচ সোে সংক্রান্ত পরিসংখ্যান চমকে দেওয়ার মতোই। আন্তর্জাতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, নিঃশব্দে পাচনতন্ত্রে থাবা বসাচ্ছে ক্যানসার। পাকস্থলী, অন্ত্র বা অগ্ন্যাশয়ে যে ক্যানসার বাসা বাঁধে, তার লক্ষণ স্পষ্ট হয় না অনেক সময়েই। কারও অম্বল মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়, আবার কারও ঘন ঘন জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেয়। সম্প্রতি ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-র গবেষকেরা একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ‘বাওয়েল ক্যানসার’-এ আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ‘বাওয়েল’ অর্থে অন্ত্রকেই বোঝায়। তবে শুধু অন্ত্র নয়, এ ক্যানসার অন্ত্র থেকে খুব দ্রুতই পাড়ি দেয় পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়েও।
২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সি প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষকে নিয়ে সমীক্ষাটি চালানো হয়। তাতে দেখা যায়, ওই বয়সের মধ্যেই এমন ক্যানসার বেশি হচ্ছে। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ব্রিটেন-সহ প্রায় ৫০টি দেশে অন্ত্রে ক্যানসারের রোগী বেশি পাওয়া গিয়েছিল। সেই তালিকায় ভারতও আছে। ইদানীং সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে। অন্ত্রের সঙ্গে পাকস্থলী, পিত্তথলি ও অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসারের রোগীর সংখ্যাও বেশি। এর কারণ হিসেবে খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার ও জাঙ্ক খাবার খাওয়ার প্রবণতাকে দায়ী করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আলস্য, শারীরচর্চার অভাব, দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ, অনিয়মিত ঘুম এবং মানসিক চাপ। এর ফলে পরিপাকতন্ত্রে এতটাই প্রদাহ হচ্ছে, যা অন্ত্রে থাকা ভাল ব্যাক্টেরিয়াকে নষ্ট করে দিচ্ছে। বদলে বাড়ছে খারাপ ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা। ফলে অন্ত্র, পাকস্থলী বা অগ্ন্যাশয়ের কোষের অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিক বিভাজন শুরু হচ্ছে যা পরে গিয়ে ক্যানসারের রূপ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ক্যানসার বৃদ্ধির কিছু কারণ
ওজন বেড়ে যাওয়া যেমন একটি কারণ, ঠিক তেমনই ধূমপান, মদ্যপান বেড়ে যাওয়ার ফলে ক্যানসার রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। তা ছাড়াও কিছু সংক্রমণ, যেমন— হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি, হেপাটাইটিস বি ও সি-এর কারণে লিভার, পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যানসার হচ্ছে।
জাঙ্ক ফুড এখন সহজলভ্য। মানুষজন জাঙ্ক খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে অভ্যস্ত হচ্ছে। ফলে অন্ত্রে টক্সিন জমা হচ্ছে বেশি। বাড়ছে খারাপ ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যাও।
তাড়াতাড়ি ওজন কমবে ভেবে অনেকেই এখন গ্রিলড খাবার বেশি খাচ্ছেন। চিকেন কবাব, তন্দুরি বা গ্রিলড চিকেনের মতো খাবারে নুনের মাত্রা বেশি থাকে। উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে, মাংসের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় তো বটেই, একই সঙ্গে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বেশি আঁচে মাংস রান্না করলে হেটারোসাইলিক অ্যামিনেস (এইচসিএ) তৈরি হয়, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মাংসের ক্রিয়েটিনিন অ্যামিনো অ্যাসিড এবং শর্করার সঙ্গে মিশে এই জিনিসটি তৈরি করে।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, অন্ত্রের ক্যানসারের লক্ষণ সাধারণ গ্যাস-অম্বলের মতোই। তাই রোগী বুঝতেই পারেন না যে, ক্যানসার কখন ডালপালা মেলে স্টেজ-৩ বা স্টেজ-৪ পর্বে পৌঁছে গিয়েছে। শুরু থেকেই যদি বিভিন্ন উপসর্গ, যেমন— পেট ব্যথা, অম্বল, ওজন কমে যাওয়া, ঘুম না পাওয়া, খিদে না হওয়া, মলের সঙ্গে রক্ত পড়া, এইগুলি উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যায়, তা হলে ক্যানসারকে হারিয়ে সুস্থ জীবন যাপন সম্ভব।