ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিয়োথেরাপি বা কেমোথেরাপির বিকল্প হিসেবে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির চিকিৎসা এখন বিশ্ব জুড়েই সমাদৃত। এই চিকিৎসায় কোনও যন্ত্রণা নেই। কেবল অ্যান্টিবডি ইঞ্জেকশন দিয়ে ক্যানসার কোষ নির্মূল করা হয়। একে বলা হয় ‘টার্গেট থেরাপি’। ওষুধ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে গিয়ে কেবল আক্রান্ত কোষগুলিকেই ধ্বংস করে। অ্যান্টিবডির এই থেরাপি দিয়েই এ বার ডেঙ্গির চিকিৎসা হবে। ডেঙ্গির ভাইরাস নির্মূল করতে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি দিয়ে ওষুধ তৈরি করছে দেশের প্রতিষেধক নির্মাতা সংস্থা সিরাম ইনস্টিটিউট। সেই ওষুধের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে বলে জানা গিয়েছে।
ডেঙ্গির ভাইরাস খুব বিপজ্জনক। তারা খুব দ্রুত ভোল বদলে ফেলতে পারে। দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেল্থ থেকে প্রকাশিত একাধিক গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছিল, বিগত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গির ভাইরাস তার স্বভাব-চরিত্র বদলাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গি হানা দিলে এখন আর কেবল জ্বর, সারা গায়ে র্যাশ হয় না, তার চেয়েও বেশি কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। পেটের সংক্রমণ, পেশির খিঁচুনির পাশাপাশি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, রেটিনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিয়েছে অনেকের ক্ষেত্রে। অথচ ডেঙ্গি নাশ করতে পারবে, তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট ওষুধ এখনও অবধি নেই। কেবল রোগীর লক্ষণ দেখে সেইমতো চিকিৎসা করা হয়। ডেঙ্গির টিকাও গবেষণার স্তরে আছে।
সিরাম ইনস্টিটিউট এই প্রথম ডেঙ্গির চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ তৈরির কাজ করছে। তাদের তরফে জানানো হয়েছে, শুধু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নয়, বরং ডেঙ্গি ভাইরাসের যে কোনও প্রজাতিকে (প্রধানত চারটি প্রজাতি আছে ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪) ঠেকাতে সক্ষম হবে, এমন মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিই তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি কী ভাবে কাজ করে?
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময়ে এই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। এই অ্যান্টিবডি শরীরে তৈরি হয় না, গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়। সাধারণত, শরীরে কোনও জীবাণুর সংক্রমণ হলে, শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তা ঠেকাতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডির কাজ হল, সেই বহিরাগত শত্রুকে চিনে রাখা ও তাদের বিরুদ্ধে কী ভাবে লড়তে হবে সেই উপায় খোঁজা। করোনা বা ডেঙ্গির মতো ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি প্রয়োজন হবে, তা শরীরে নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না। সেই জোগান দেওয়ার জন্যই বাইরে থেকে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি শরীরে প্রবেশ করাতে হয়।
এই অ্যান্টিবডি গবেষণাগারে তৈরি এক প্রকার প্রোটিন, যা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। শরীরে ঢুকে এই অ্যান্টিবডি সংখ্যায় আরও বাড়তে থাকে ও চারদিক থেকে শত্রুকে ঘিরে ফেলে। এতে যেমন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তেমনই রোগজীবাণু পালানোর পথ পায় না। সিরাম জানিয়েছে, ডেঙ্গি ভাইরাসের চরিত্র দেখেই তৈরি হয়েছে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি যা কেবল ভাইরাসকেই চিনে তাকে বিনষ্ট করতে পারবে।
সিরামের তৈরি অ্যান্টিবডির ওষুধের ট্রায়াল চলছে এ দেশে। আগামী বছর থেকে ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, তাইল্যান্ডের মতো দেশেও এই ওষুধের ট্রায়াল হবে বলে জানা গিয়েছে।