ঘুম থেকে উঠে হাত ঝিনঝিন করছে, মাথাটা ভার লাগছে, অনেকেই ভেবে বসেন বেকায়দায় শোয়ার কারণেই বুঝি এমনটা হচ্ছে। কিন্তু যদি সকালে উঠে দেখেন কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, এক হাত নাড়াতে পারছেন না বা দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছেন? এই সব উপসর্গ কিন্তু চিন্তার কারণ হতে পারে। এটাই হল ওয়েক-আপ স্ট্রোক বা ঘুমের মধ্যে স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ। চিকিৎসকদের মতে, প্রতি পাঁচ জন ইস্কেমিক স্ট্রোক আক্রান্তদের মধ্যে এক জন এই ধরনের স্ট্রোকের শিকার হন।
ওয়েক-আপ স্ট্রোক আসলে কী?
আপনি রাতে সুস্থ অবস্থায় ঘুমোতে গেলেন, কোনও উপসর্গ নেই। কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার পরেই দেখা দিল স্ট্রোকের লক্ষণ। অন্যান্য স্ট্রোকের মতোই, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালিতে ক্লট জমে ব্লক হয়ে (ইস্কেমিক স্ট্রোক) বা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে (হেমোরেজিক স্ট্রোক) এটি হতে পারে। মুম্বইনিবাসী নিউরোলজিস্ট বিশাল চাফালে বলেন, “ওয়েক-আপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, ঘটনাটা অনেক সময় কেউ টেরই পান না। মানুষটি একেবারে স্বাভাবিক ভাবে ঘুমোতে যান, কিন্তু সকালে উঠে দেখেন এক হাত নড়ছে না, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে বা দাঁড়াতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরাই প্রথম বুঝতে পারেন যে, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।”
যেহেতু উপসর্গগুলো ঘুমের মধ্যেই তৈরি হয়, তাই কখন শুরু হল তা জানার কোনও অবকাশ থাকে না। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ নড়াচড়া, কথা, দৃষ্টি বা ভারসাম্যে কোনও পরিবর্তন দেখলে সেটা অবহেলা করা উচিত নয়।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কোন উপসর্গগুলি কখনও এড়িয়ে যাবেন না?
মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে লক্ষণ বদলায়।
১. শরীরের এক দিকে হঠাৎ দুর্বলতা বা অবশ ভাব। বিশেষ করে মুখ, হাত বা পায়ের এক পাশে।
২. হাসতে গেলে মুখের এক দিক ঝুলে পড়া বা বেঁকে যাওয়া।
৩. কথা বলতে অসুবিধা, জড়িয়ে যাওয়া বা অন্যের কথা বুঝতে না পারা।
৪. হঠাৎ ঝাপসা দেখা, একটি জিনিস দুটো দেখা বা দৃষ্টি চলে যাওয়া।
৫. হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা, হঠাৎ মাথা ঘোরানো, টলতে থাকা।
৬. সমন্বয়ের অভাব, সাধারণ কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া।
৭. হঠাৎ করে তীব্র মাথাব্যথা।
চিকিৎসক সতর্ক করে বলছেন, “বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলিকে সহজেই ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। হাতে-পায়ের দুর্বলতাকে আর্থ্রাইটিস ভাবা হয়, ঝিনঝিনকে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি আর মাথা ঘোরাকে প্রেশারের ওঠানামা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ করে নড়াচড়া, কথা বলা, দেখা বা ভারসাম্যে যে কোনও পরিবর্তনকে কখনওই সকালের সাধারণ সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
আরও পড়ুন:
স্ট্রোক হওয়া মানেই কি মুখ বেঁকে যাওয়া?
চিকিৎসক বিশালের মতে, আমরা স্ট্রোকের যে চেনা ছবি জানি, যেমন মুখ বেঁকে যাওয়া, এক দিক অবশ হয়ে যাওয়া— তা সব স্ট্রোকে না-ও হতে পারে। বিশাল বলেন, ‘‘মস্তিষ্কের পিছনের অংশ, ব্রেনস্টেম বা সেরিবেলামে স্ট্রোক হলে লক্ষণ হতে পারে সম্পূর্ণ অন্যরকম। সে সব ক্ষেত্রে হঠাৎ তীব্র ভার্টিগো, ডবল ভিশন, মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা, ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ লক্ষ করা যায়।
সাধারণ স্ট্রোকে চিকিৎসার সময় গোনা হয় উপসর্গ শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে। কিন্তু ওয়েক-আপ স্ট্রোকে সেই সময়টা জানা যায় না। তাই চিকিৎসকেরা ‘লাস্ট নোন ওয়েল’ টাইমের উপর ভরসা করেন — অর্থাৎ শেষ কখন রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। সাধারণত, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় বা পরিবারের কেউ শেষ বার যখন দেখেছিলেন, সেই সময়কেই ধরা হয়। চিকিৎসক বলেন, “এমনকি ঘুম থেকে ওঠার কয়েক ঘণ্টা পরেও যদি উপসর্গ টের পান, সে ক্ষেত্রেও সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে রোগীকে নিয়ে যান। সময় অপচয় যত করবেন, ততই রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমবে।’’