E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

হারানো দাঁত ফেরানো যায়

দাঁত তুললে বা পড়ে গেলে একটি স্থায়ী ও অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হল ডেন্টাল ইমপ্লান্ট। এ ক্ষেত্রে দাঁত ফিরে পাওয়ার মতোই অনুভব হবে

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ ০৮:০৯

দাঁত খোয়া গিয়েছে বা পড়ে গিয়েছে নাকি? এ এক গুরুতর সমস্যা। হাসতে গেলে অস্বস্তি, সঙ্গে সৌন্দর্যহানির আশঙ্কা। সবচেয়ে কষ্ট খাওয়ার সময়ে। ফলে, দৈনন্দিন জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই যেন হারিয়ে যেতে বসে। তবে, চিন্তা নেই, দাঁত ভেঙে যাওয়া বা পড়ে যাওয়ার চিকিৎসা এখন অনেক সহজ ও আধুনিক। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দাঁত পড়ে গেলে তা আর নতুন করে উঠবে না ঠিকই। কিন্তু এমন এক চিকিৎসা রয়েছে যাকে বলা যেতে পারে, প্রায় দাঁত ফিরে পাওয়ার মতোই। মুখের গড়ন, সৌন্দর্য আগের মতোই থাকবে, যা প্রাণে চায় তাই খেতে পারবেন। এই চিকিৎসাপদ্ধতিটির নাম ডেন্টাল ইমপ্লান্ট। এই বিষয়ে বিশদে জানালেন দন্তচিকিৎসক সমিত শিকদার।

স্বাভাবিক দাঁতের মতো কেন?

মানুষের জন্মগত দাঁত যদি বয়স বা অন্য কারণে পড়ে যায়, দুর্ঘটনায় উপড়ে যায়, ক্ষয়ে যায়, তা হলে সমাধানের চেনা রাস্তা নকল দাঁত লাগানো। এর একটি হল রিমুভেবল ডেনচার বা খোলা-পরা করা যায় এমন দাঁত। এটি সাশ্রয়ী, তবে কিছু অসুবিধা হতে পারে। একে তো মুখের মধ্যে বড় একটা জিনিস রয়ে গেল, কথা বলার সময়ে জিভের ঠেলায় তা খুলেও আসতে পারে। জল খাওয়ার সময়ে ছোট ডেনচার (দু’-একটা দাঁত লাগানো হলে) রোগী গিলে ফেলেছেন এমনও ঘটেছে। সেটি গলায় আটকালে তখনই শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে বার করতে হবে, নয়তো জীবন সঙ্কট উপস্থিত হয়। পুরনো ডেনচারের ক্ষেত্রে রোগীকে সচেতনও থাকতে হয়। নয়তো ব্যবহার করতে করতে এটি থেকে গালে, জিভে ঘষা লাগে। মুখের আলসার, অবহেলা করলে তার থেকে ক্যানসার হতে পারে।

স্থায়ী দাঁত লাগানোর দু’টি উপায়। ডেন্টাল ব্রিজ এবং ডেন্টাল ইমপ্লান্ট। ব্রিজ করার জন্য একটা দাঁত বসানোর প্রয়োজনে পাশের সুস্থ দাঁতকে ছোট করতে হয়। তার ফলে পরে সেই দাঁতে শিরশিরানি হতে পারে, যার জন্য রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন হয়। চিবোনোর দাঁতে ব্রিজ করলে খাওয়ার সময়ে আগের মতো চাপ দেওয়া চলে না। এ দিক দিয়েই ইমপ্লান্ট সুবিধাজনক। পাশের দাঁতকে সমস্যায় ফেলে না, আবার যেহেতু হাড় থেকেই দাঁত বসছে, ফলে আগের মতোই ইচ্ছেমতো কামড় দিয়ে খাওয়া যায়। দাঁত নষ্ট হলে নীচের হাড়েরও ক্ষতি হয়, ইমপ্লান্টের ক্ষেত্রে ওই ক্ষতিটাও আটকে দেওয়া যায়।

ডা. শিকদার বললেন, “ইমপ্লান্টের ক্ষেত্রে ওই জন্মগত দাঁতের জায়গায় একটি বায়োকম্প্যাটিবল (যা জীবদেহের সংস্পর্শে এলে ক্ষতি হয় না) এবং পরিবেশবান্ধব টাইটেনিয়াম অথবা জ়ারকোনিয়ার পোস্ট বা স্ক্রু বসানো হয়। দাঁতের শিকড় (রুট) থাকে চোয়ালের ভিতরে। ডেন্টাল ইমপ্লান্টও সে রকমই চোয়ালের মধ্যে ঢুকে যায় এবং তিন-চার মাসের মধ্যে হাড়ের সঙ্গে জুড়ে যায়। তার উপরে ক্যাপ বা ঢাকনি বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে একে স্বাভাবিক দাঁতের মতোই ব্যবহার করা যায়।”

সকলে করাতে পারবেন?

ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত মেরামত করা সম্ভব হলে ফিলিং, রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট করা হয়। কিন্তু, দাঁত যদি পড়ে যায়, উপড়ে যায়, মানে একেবারেই ফাঁকা, তখন ডেন্টাল ইমপ্লান্টের কথা ভাবা হয়। দুর্ঘটনায় সামনের চার-পাঁচটা দাঁত উপড়ে গেলে অনেকেই এই পদ্ধতির আশ্রয় নেন। চোয়াল ভেঙে দাঁত বিশ্রী ভাবে ভাঙলে সেটা তুলে ফেলতে হয়, তখনও পরিত্রাতা এই পদ্ধতি। পায়োরিয়া জাতীয় মাড়ির অসুখের বাড়াবাড়িতে কম বয়সেই দাঁত পড়ে গেলে চিকিৎসক ইমপ্লান্টের পরামর্শ দেন। অনেকেরই হয়তো মুখে একটাও দাঁত নেই। তাঁদের ক্ষেত্রে, চোয়ালের হাড় ভাল থাকলে দু’-চারটে দাঁত ইমপ্লান্ট করিয়ে তার পর ডেনচার লাগানো হয় (ইমপ্লান্ট সাপোর্টেড ওভার ডেনচার)। এতে খরচ অনেক কম হয়। ইমপ্লান্টের উপরে ডেনচার শক্ত হয়ে আটকেও থাকে।

ইমপ্লান্টের আগে রোগের ইতিহাস জেনে নেওয়া হয়, পরীক্ষা করা হয়। এইচবিএওয়ানসি সাতের মধ্যে থাকলে, অ্যান্টিবায়োটিক ও ওষুধ দিয়ে মধুমেহ রোগীরও ডেন্টাল ইমপ্লান্ট করা যায়। ধূমপান, তামাক সেবনের কারণে মুখের ভিতরের অবস্থা খুব খারাপ হলে ইমপ্লান্ট করা সম্ভব নয়। কিছু দিন আগেই হার্ট অ্যাটাক, বাইপাস সার্জারি হলে, স্টেন্ট বসলে হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তবেই চিকিৎসাটিতে এগোনো উচিত। কর্কটরোগের চিকিৎসা চললে, চোয়ালে ক্যানসারের জন্য রেডিয়োথেরাপি নিলে, ডায়ালিসিস চললে বা অন্য ইমিউনোসাপ্রেশন-এর সমস্যা থাকলে, হাড়ের অসুখের (সিভিয়র অস্টিয়োপোরেসিস) ক্ষেত্রে এটি করানো যাবে না। আঠেরো বছর বয়সের পর চোয়ালের গঠন সম্পূর্ণ হয়, তার পরই ইমপ্লান্ট করা যায়। বয়সের ঊর্ধ্বসীমা নেই, শারীরিক সমস্যা না থাকলে আশি বা তার ঊর্ধ্বের প্রবীণরাও পারবেন।

সহজ ও যন্ত্রণাহীন পদ্ধতি

প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা, মুখের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষা করা হয়, দেখা হয় ক’টি দাঁত নেই। বিশেষ এক্স রে-র মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব বুঝে, ইমপ্লান্টের মাপ নির্ধারণ করা হয় ও দিন স্থির করা হয়। ডা. শিকদার বললেন, “ইমপ্লান্ট নামেই সার্জারি। দাঁত তোলার চেয়েও সহজ। যন্ত্রণাহীন পদ্ধতি। নির্দিষ্ট অংশ অবশ করে এক-একটা ইমপ্লান্ট করতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট লাগে। সাত-দশ দিন বাদে দাঁতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তিন-চার মাস পরে জায়গাটি হাড়ের সঙ্গে জুড়ে যায়। অনেক সময় বোন গ্রাফটিং করতে হয়, সে ক্ষেত্রে চার মাসের জায়গায় ছ’মাস লাগতে পারে। তার পর অ্যাবাটমেন্ট (একটি কাঠামো) লাগিয়ে ক্যাপ বসিয়ে দিলেই প্রায় নিজের দাঁতই ফেরত পাবেন। ইমপ্লান্টের পর প্রতি তিন মাসে এক বার চিকিৎসকের কাছে দাঁত পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।”

রোগীর শারীরিক সমস্যা না থাকলে জটিলতার সম্ভাবনাও কম। কোনও ভাবে হাড়ের সঙ্গে না জুড়লে ইমপ্লান্ট নড়তে থাকবে। তবে সাফল্যের হার ৯০%-৯৫%। ক’টা দাঁত ইমপ্লান্ট হবে, কোন সংস্থার ইমপ্লান্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উপরে নির্ভর করে খরচ। এশীয়সংস্থা যেমন ইজ়রায়েল, কোরিয়ার ইমপ্লান্ট আছে বাজারে, ইউরোপিয়ান সংস্থার ইমপ্লান্টও আছে। তবে টাইটেনিয়ামের গুণমান যত ভাল, হাড়ের সঙ্গে জোড় হবে তত ভাল। খরচ আনুমানিক ২৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা।

ইমপ্লান্টে আত্মবিশ্বাস তো ফেরেই, কথা বলা, খাওয়াদাওয়ার মতো প্রাত্যহিক কাজ সহজ হয়।


মডেল: সুস্মিতা চট্টোপাধ্যায়,ছবি: শুভদীপ সামন্ত

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Smile Teeth

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy