২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। ভারতবাসীর ঘুম ভেঙেছিল ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ খবরে। সংযম, কূটনৈতিক সমাধান, দোষারোপের পথে না গিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘যুদ্ধ’! সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) ঢুকে জঙ্গিদের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় সেনা। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, একাধিক লঞ্চপ্যাডে অভিযান চালানো হয়েছিল এবং জঙ্গি ও তাদের সহযোগীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় হতাহত করা হয়েছিল। সেই ‘নীরব’ অভিযানের ১০ বছর পূর্তি পালন করছে গোটা দেশ।
সেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বীজ বপন হয়েছিল এক মর্মান্তিক ঘটনায়। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে সেনাবাহিনীর ছাউনিতে ঢুকে নির্বিচারে গোলাবর্ষণ করেছিল জঙ্গিরা। চার জঙ্গি অতর্কিতে ঢুকে পড়েছিল উরি ক্যাম্পে। প্রাথমিক ভাবে ওই চার জঙ্গিকে জইশ-ই-মহম্মদের সদস্য বলে জানিয়েছিল সেনা। হামলার কারণে আগুন ধরে যায় বেশ কয়েকটি সেনাতাঁবুতে। সেই হামলায় ডোগরা রেজিমেন্টের ১০ ব্যাটালিয়ন এবং বিহার রেজিমেন্টের ষষ্ঠ ব্যাটালিয়নের মোট ১৯ জন জওয়ান প্রাণ হারান। তবে ওই সেক্টরে সেটাই প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা ছিল, তা নয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরেও উরির মহুরা ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। ১১ জন নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। যদিও দুই হামলার পর প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরতে পারেনি জঙ্গিরা।
২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরে উরি হামলার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। ক্ষোভে ফুঁসতে শুরু করে দেশবাসী। জঙ্গি হামলার জবাব দেওয়ার দাবিও ওঠে। তবে নরেন্দ্র মোদী সরকার প্রকাশ্যে কোনও জবাব দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেনি। যদিও গোপনে গোপনে চলছিল সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়িত হয় সে বছর ২৮ রাত থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর ভোরের মধ্যে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এলিট প্যারা স্পেশ্যাল ফোর্সেস (এসএফ) ইউনিটের জওয়ানেরা জম্মু-কাশ্মীরের বারামুলা, রাজৌরি, কুপওয়ারা থেকে উড়ে গিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে। সীমান্ত অতিক্রম করে নেমেছিলেন পিওকে-র ভূখণ্ডে। সীমান্তের ৫০০ মিটার থেকে দু’-তিন কিলোমিটারের মধ্যে জবাবি হামলা চালায় ভারতীয় সেনা।
কী ভাবে চলেছিল সেই অভিযান? নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পিওকে-তে ঢুকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন সেনারা। প্রায় ১০০ জন কমান্ডোকে নিয়ে অভিযানটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, ভারতের কমান্ডোবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখা পার করলেই খবর যাবে পাক সেনার কাছে। সতর্ক হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে তারা। সেই কারণে পাকসেনার নজর ঘোরাতে অভিযানের সময় ভারী গোলাবর্ষণ করা হয়।
পিওকে-তে ঢুকে তাতপানি, কেল, লিপা সেক্টরে হামলা চালান ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা। জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করাই ছিল সেই অভিযানের লক্ষ্য। অভিযান রাতের মধ্যে চালিয়ে সূর্যোদয়ের আগে জওয়ানেরা ফিরে আসেন। শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরে গুলি চালায় পাক সেনা। তবে তত ক্ষণে অভিযান সফল হয়েছিল। কোনও ভারতীয় জওয়ান প্রাণ হারাননি। গোয়েন্দাসূত্রের অনুমান অনুযায়ী, ৫০ জনের বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছিল সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে।
আরও পড়ুন:
১০ বছর আগের সেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের রূপরেখা বা নীল নকশা তৈরি হয়েছিল গোপনে। প্রধানমন্ত্রী মোদী, সেনাপ্রধান ছাড়া সেই পরিকল্পনার কথা জানতেন তৎকালীন মন্ত্রিসভার গুটিকয়েক সদস্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনবরত ওই অভিযানের উপর নজর রাখা হয়েছিল। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর প্রকাশিত বহু রিপোর্টে সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, ওই অভিযানে ভারতীয় সেনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।
২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক অন্য অভিযানের থেকে ছিল অনেকটাই আলাদা। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ২০১৬ সালের অভিযান ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। পরে তার প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৯ সালে। পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার জবাবে বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিল ভারতীয় বায়ুসেনা। ২০২৫ সালে ভারতের সিঁদুর অভিযানেও একই ছবি দেখা যায়।
গত রবিবার ‘মন কী বাত’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সেই ১০ বছর আগের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন। মোদীর বার্তা ছিল, ‘‘ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জ়িরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। আমরা সেই নীতির সুফল দেখতে পাচ্ছি।’’ ১০ বছর আগের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-কে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।