চিনির দামে নাভিশ্বাস উঠছে ক্রেতাদের। এই পরিস্থিতিতে চিনির কালোবাজারি রুখতে পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। সোমবার দেশের বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রকের তরফে একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়েছে, অন্য দেশ থেকে আমদানি করা চিনি দু’মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করে খোলা বাজারে বিক্রি করতে হবে। চিনির কালোবাজারি রুখতেই কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে কেন্দ্রের তরফে বলা হয়েছিল আমদানি করা চিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত বা পরিশুদ্ধ করতে হবে। তার পর ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। আগের নির্দেশিকায় চিনি পরিশুদ্ধ করার কাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনও সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। আর উৎসবের মরসুমে অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা মাথায় রেখে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাজারে চিনি বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সময় এগিয়ে এনে বলা হল, দু’মাসের মধ্যে তা বিক্রি করতে হবে। চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রাখতেই কেন্দ্র এমন পদক্ষেপ করল বলে মনে করছেন বণিকমহলের একাংশ।
আরও পড়ুন:
গোটা দেশে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে চিনির দাম বেড়়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে বৃষ্টির কারণে আখচাষে ক্ষতি, জোগানের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আখচাষের মরসুমের কথা মাথায় রেখে সাধারণত অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কে চিনি উৎপাদনের অর্থবর্ষ গণনা করা হয়। বর্তমান চিনি অর্থবর্ষের (২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর) গোড়ায় মনে করা হয়েছিল উৎপাদন বাড়বে। চিনি উদ্বৃত্ত থাকবে। বণিকসংস্থা ‘ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো এনার্জি ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ প্রাথমিক ভাবে মনে করেছিল, আগের অর্থবর্ষের তুলনায় চিনির উৎপাদন ১৮.৩ শতাংশ বাড়বে।
এই হিসেবের উপর নির্ভর করে মরসুমের গোড়ায় অন্য দেশে চিনি রফতানিতে ছাড়পত্র দেয় কেন্দ্র। চিনি উৎপাদনের মান্য অর্থবর্ষের গোড়ায়, গত নভেম্বরে ১৫ লক্ষ টন চিনি রফতানিকে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারিতে আরও পাঁচ লক্ষ টন চিনি রফতানির ক্ষেত্রেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে কেবল জানুয়ারিতে (২০২৫ সালের) ১০ লক্ষ টন চিনি রফতানির ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
মে মাসে চিনি উৎপাদন নিয়ে সরকার এবং অন্য বণিকসংস্থাগুলির পূর্বাভাস বদলে যায়। মে মাসে সরকার জানিয়ে দেয়, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্য দেশে চিনি রফতানি করা যাবে না। জুলাই মাসে সরকার চিনিকলগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরও আঁটোসাঁটো করে। অগস্টে কেন্দ্রের তরফে চিনি বিক্রির মাসিক পরিমাণ ২২.৫ লক্ষ টনে বেঁধে দেওয়া হয়। গত বছরেও পরিমাণটা প্রায় অপরিবর্তিতই ছিল। কিন্তু মরসুমের শুরুতে উৎপাদন বৃদ্ধির ইঙ্গিত থাকায় মনে করা হয়েছিল বিক্রির পরিমাণ অনেকটা বাড়বে।
চিনির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে এখন দেশ জুড়ে তোলপাড় তোলা ইথানল-বিতর্ক। ইরান এবং রাশিয়ার যুদ্ধের আবহে পেট্রলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার জেরে গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ। ক্ষতিগ্রস্ত হেঁশেলের অর্থনীতিও। ইথানল তৈরিতে চিনি লাগে। চিনি ব্যবসায়ীদের একাংশের হিসাব, চলতি বছরে ৩২ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি গিয়েছে ইথানল তৈরি করার জন্য। বিরোধীদের অভিযোগ, পেট্রলে ইথানল মেশাতে গিয়ে দেশের খাদ্যসুরক্ষার সঙ্গে আপস করছে কেন্দ্র। যদিও কেন্দ্রের দাবি, চিনির দাম বাড়ার সঙ্গে ই-২০ পেট্রল তৈরির কোনও সম্পর্ক নেই। খাদ্য মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইথানল তৈরির জন্য চিনির ব্যবহার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমানো হচ্ছে। ২০২২-২৩ সালে ১২ শতাংশ চিনি ব্যবহার করা হত ইথানল তৈরির জন্য। ২০২৫-২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৯ শতাংশ। তা ছাড়া, তিন-চতুর্থাংশ ইথানলই তৈরি হয় ভুট্টার মতো দানাশস্য থেকে।
কিন্তু পরিস্থিতি যা, তাতে এক দশকেরও বেশি সময় পরে বিদেশ থেকে চিনি আমদানির অনুমতি দিতে হয়েছে কেন্দ্রকে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানি করা যাবে। এর জন্য কোনও শুল্ক দিতে হবে না।