Advertisement
E-Paper

বিষপ্রয়োগের চেষ্টা, পরে বালিশ চাপা, ৯৯ বার ফোন! কী ভাবে কর্নাটকের একটি ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’র মোড় ঘুরল হত্যাকাণ্ডে

দক্ষিণ কন্নড় জেলার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত চলতি বছরের ২৩ জুলাই তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩০ অগস্ট ২০২৬ ১৫:২৮
How a ‘natural death’ turned into a crime in Karnataka

বৃদ্ধা-খুনের রহস্য উন্মোচন পুলিশের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

২০২১ সালে মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। সেই মৃত্যুর নেপথ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা বা খুনের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, তা ভাবতেও পারেননি কর্নাটকের বাসিন্দা রোনাল্ড কার্লো। নানা সূত্র জুড়ে সেই মৃত্যুরহস্যের কিনারা করে পুলিশ। সাড়ে পাঁচ বছর পর সাজা পেলেন দোষীরা।

২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে বৌদির ফোন পান রোনাল্ড। ফোনে জানানো হয়, রোনাল্ডের বৃদ্ধা মা বেনেডিক্ট কার্লো নিজের বাড়িতে অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন। খবর পেয়ে বাড়ি ফেরেন রোনাল্ড। তবে মাকে বাঁচানো যায়নি। পরিবারের ধারণা ছিল, শারীরিক অসুস্থতার কারণে মৃত্যু হয়েছে বৃদ্ধার।

সাত সন্তানের মা বেনেডিক্ট। তাঁর মধ্যে ছ’জন পুত্র এবং একজন কন্যাসন্তান। কর্মক্ষেত্র অন্যত্র হওয়ায় বা অন্য কারণে কোনও সন্তানই বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে মঙ্গলুরুর বাড়িতে থাকতেন না। বেনেডিক্টের স্বামীও অসুস্থ ছিলেন এবং পক্ষাঘাতজনিত কারণে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। বেনডিক্টের মৃত্যুর কয়েক মাস আগে অসুস্থ দম্পতিকে দেখাশোনার জন্য এলমা প্রেসচিথ ব্যারেটো নামে এক আত্মীয়কে ঠিক করা হয়। তিনিই থাকতেন ওই বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে।

বেনেডিক্ট উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে অনেক দিন ধরেই ভুগছিলেন। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে বাড়ি ফেরেন রোনাল্ড। মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই মৃত্যু হয়েছে ওই বৃদ্ধার। তবে এই মৃত্যু স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি চিকিৎসকদের। তদন্তকারী এক পুলিশকর্তা জানান, চিকিৎসকেরা দেখেন বেনেডিক্টের ঘাড়ে, কাঁধে এবং বাঁ হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আর তা দেখেই ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বন্টওয়াল গ্রামীণ পুলিশকে গোটা বিষয়টা জানান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সাব-ইনস্পেক্টর প্রসন্ন। তদন্তে নেমে তাঁর সন্দেহ হয়, চুরির উদ্দেশ্যে ওই বৃদ্ধার উপর অত্যাচার হয়ে থাকতে পারে। বাড়ি থেকে কোনও কিছু চুরি গিয়েছে কি না, তা রোনাল্ডকে খুঁজে দেখতে বলেন প্রসন্ন। পুলিশের থেকে জেনে বাড়িতে খুঁজতে গিয়ে রোনাল্ড দেখেন বেশ কয়েকটি সোনার অলঙ্কার নেই! আর তার পরেই কার্লো পরিবারের ধারণা হয়, বেনেডিক্টকে চুরির উদ্দেশ্যে খুন করা হয়ে থাকতে পারে।

ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে বেনেডিক্টের মৃত্যুর পর থেকেই প্রায় ‘অন্তরালে’ ছিলেন ব্যারেটো। আর তাতেই সন্দেহ পড়ে তাঁর উপর। তদন্তকারী এক অফিসার জানান, ব্যারেটোকে বার বার ফোন করলেও সাড়া মিলছিল না। বৃদ্ধার শেষকৃত্যেও উপস্থিত ছিলেন না। শেষকৃত্য মেটার পরেও বার বার ওই মহিলাকে ফোন করতে থাকেন রোনাল্ড। মাঝে একবারই ফোন তোলেন ব্যারেটো। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, কেন বেনেডিক্টের শেষকৃত্যে ছিলেন না? কোনও কারণ ছাড়াই ওই মহিলা বলেন, ‘‘আমি তো কিছু করিনি!’’ রোনাল্ডের দাবি, ব্যারোটোর কণ্ঠস্বর ছিল অস্বাভাবিক।

২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যারেটোকে আটক করে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, বেনেডিক্টের মৃত্যুর আগে তিন-চার দিন ধরে এক যুবক ব্যারোটোকে পৌঁছে দিতেন। কে তিনি? ব্যারোটো পুলিশকে জানিয়েছিলেন, ওই যুবক তাঁর প্রেমিক। নাম সতীশ এআর। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বন্টওয়ালের বাসিন্দা সতীশকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, জেরার মুখে খুনের কথা স্বীকার করেন দু’জনে। তবে তার জন্য এক কৌশল নেন তদন্তকারীরা। সতীশকে তাঁরা জানান, ব্যারোটো সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন। একই কথা বলেন ব্যারোটোকেও। তার পরেই দু’জনে নিজেদের ‘অপরাধ’ স্বীকার করেন।

তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, সতীশ এবং ব্যারেটো মিলে চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন। তদন্তকারী কর্তা নাগারাজ বলেন, “অভিযুক্তদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল বেনেডিক্টকে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করা হবে। কফি বা চায়ের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে দিতেন ব্যারেটো। কিন্তু তাতে বেনেডিক্টের উপর খুব একটা প্রভাব পড়েনি। তার পরেই খুনের পরিকল্পনা ছকেন তাঁরা। আর এই খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে বন্ধু চরণ কুমারের সাহায্য নেন সতীশ।’’

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন চরণ বেনেডিক্টের বাড়িতে যান। তাঁকে বাড়িতে ঢুকতে সাহায্য করেন ব্যারেটো। চরণই বৃদ্ধার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করেন। আর সেই সময়ে বেনডিক্টের পা চেপে ধরে রেখেছিলেন ব্যারোটো। সেই খবরের ভিত্তিতে চরণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযুক্তদের কাছ থেকে সোনার অলঙ্কার উদ্ধার করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নানা দিক থেকে প্রামাণ্য নথি জোগাড় করতে থাকে পুলিশ। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৫ জানুয়ারি রাত থেকে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত চরণ এবং সতীশের মধ্যে ৯৯টি ফোন হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, ব্যারেটো এবং সতীশের মধ্যে ৩১ বার ফোনে কথা হয়। তবে চরণ এবং ব্যারেটোর মধ্যে কোনও ফোনালাপ হয়নি।

পুলিশ আরও জানতে পারে যে, অভিযুক্তদের মধ্যে অনেক মেসেজ, হোয়াট্‌সঅ্যাপ চ্যাট এবং অডিয়ো বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল। তেমনই কিছু অডিয়ো সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা। পরে অভিযুক্তদের কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠায় পুলিশ। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, অভিযুক্তদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সবটাই।

পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। তবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জামিনে মুক্তি পান অভিযুক্তেরা। যদিও বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকে। দক্ষিণ কন্নড় জেলার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত চলতি বছরের ২৩ জুলাই তিন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

Karnataka Murder Plot

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy