ওড়িশার বালেশ্বরের জঙ্গল থেকে পাঁচটি ওরাংওটাং শাবক উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পেশ করল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। আর সেখানে উঠে এল বার্ষিক ২০০০ কোটি ডলারের (প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা) আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণ চোরাকারবারের নেটওয়ার্কের তথ্য।
গত ৮ সেপ্টেম্বর বালেশ্বরের বিচিত্রপুর সৈকতের অদূরে ভোগরাই এলাকার বড়াপাই গ্রাম সংলগ্ন জঙ্গল থেকে ওরাংওটাংগুলিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ভারতীয় বনভূমি ওই প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাস নয় । মূলত ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিয়ো এবং মালয়েশিয়ার সাবা ও সারাওয়াক এলাকার চিরহরিৎ অরণ্যে ওরাংওটাংয়ের বাস। পৃথিবীতে ওরাংওটাংয়ের তিনটি প্রজাতি আছে— তাপানুলি, বোর্নিয়ান এবং সুমাত্রান। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিয়োর পাশাপাশি মালয়েশিয়াতেও বোর্নিয়ান ওরাংওটাং দেখা যায়। প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, বালেশ্বরে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি ওরাংওটাং শাবকও বোর্নিয়ান প্রজাতির।
সিএনএন-এর অনুসন্ধানী দল প্রায় এক মাস ধরে ওড়িশায় পাঁচ ওরাংওটাং শাবকের আগমন-রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার সরকার এবং সে দেশের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংস্থা ‘সেন্টস’-এর থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কথা বলেছেন, বন দফতরের আধিকারিক, বন্যপ্রাণ গবেষক, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আন্দোলনের কর্মী এমনকি, প্রাক্তন ও বর্তমান বন্যপ্রাণ চোরাকারবারিদের সঙ্গেও! প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা জানাচ্ছেন, ওই শাবকগুলিকে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের ‘আচেহ তামিরাং’ জেলা থেকে ধরা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া পাঁচটি ওরাংওটাংয়েরই বয়স আনুমানিক ১৮ মাসের কম এবং তারা প্রত্যেকেই তাদের মা থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রাক্তন চোরাশিকারিরা জানিয়েছেন, মা ওরাংওটাং জীবিত থাকতে তার শিশুদের ধরা সম্ভব নয়। তাই প্রথমেই তাকে মেরে ফেলা হয়। বালেশ্বরে উদ্ধার হওয়া পাঁচ শাবকের মা-দেরকেও নিশ্চিত ভাবেই মেরে ফেলা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার’-এর বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শাখার ডিরেক্টর লিওনেল হ্যাচেমিন বলেন, ‘‘একটি ওরাংওটাং শিশুকে জঙ্গল থেকে ছিনিয়ে নিতে গেলে চোরাশিকারিদের প্রথমেই তার মাকে হত্যা করতে হয়। কারণ মা ওরাংওটাং তার সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করে। এ ক্ষেত্রেও মা-দের হত্যার পর এই নবজাতকগুলিকে আন্তর্জাতিক সীমানা ও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দালালদের একটি গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারতে নিয়ে আসা হয়েছিল। শাবকগুলি কয়েক সপ্তাহ ধরে চরম আতঙ্কে ছিল।’’ আপাতত ওড়িশার নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় ঠাঁই পাওয়া ওরাংওটাংগুলির মধ্যে এখনও আতঙ্কে ছাপ স্পষ্ট। আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে রাখা হলেও গাছে উঠতে ভয় পাচ্ছে তারা। যা স্পষ্টতই আতঙ্কের ফল। কারণ, বানর-হনুমানের মতোই ওরাংওটাংরাও মূলত বৃক্ষবাসী।
বন্য পরিবেশে একটি স্ত্রী ওরাংওটাং তার জীবদ্দশায় মাত্র ৪-৫টি সন্তানের জন্ম দেয় এবং প্রতিটি সন্তানের জন্মের মাঝে ৭ থেকে ৮ বছরের ব্যবধান থাকে। ফলে, পাচারের জন্য একটি মা ওরাংওটাংকে হত্যা করা এবং তার শাবককে ছিনিয়ে নেওয়ার অর্থ হল প্রাকৃতিক পরিবেশে ওই প্রজাতির বিলুপ্তির পথ আরও ত্বরান্বিত করা। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চোরাকারবারিরা প্রথমে শাবকগুলিকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া হয়ে তাইল্যান্ডে এনেছিল। এর পরে মায়ানমার বা বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অত্যন্ত গোপনে ভারতে নিয়ে এসেছিল। পরবর্তী ধাপে সড়কপথে পাঠানো হয়েছিল ওড়িশায়। এর আগে ২০২২ সালে অসম ও মিজোরাম সীমান্তের একটি চেকপয়েন্ট থেকে দু’টি ওরাংওটাং শাবক উদ্ধার করা হয়েছিল।
বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ দ্বী নুগ্রোহো আধিয়াস্তো জানিয়েছেন, ওড়িশা এবং মিজোরাম সাধারণত ভারতীয় ক্রেতা বা আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর আগে বন্যপ্রাণীর ‘ট্রানজ়িট পয়েন্ট’ (সাময়িক আস্তানা) হিসেবে ব্যবহার করে পাচারচক্র। এ ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটাই হচ্ছিল। কোনও ধনকুবের বন্যপ্রাণ সংগ্রাহক বা ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার মালিকের শখ মেটাতেই আনা হয়েছিল পাঁচ ওরাংওটাং শাবককে। ওরাংওটাং-কাণ্ডের তদন্তে নেমে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দিঘা থেকে তিন জনকে আটক করেছে ওড়িশা পুলিশ। বিচিত্রপুর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দিঘাতেই প্রাণীগুলির হাতবদল হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সিএনএন। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ইতিমধ্যেই ভারতে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। নয়াদিল্লির তরফে সম্প্রতি তাতে নীতিগত সম্মতিও মিলেছে।